প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

রিকশাচিত্র দেশের ঐতিহ্যের অংশ

সভ্যতার উৎকর্ষে কম দূরত্বের গন্তব্যকে সহজ করতে ধীরগতির যান্ত্রিক যানের প্রবর্তন। স্বল্পপথ অতিক্রম করতে ত্রিযন্ত্র যানগুলোর আগমনী ধারার প্রথম সারিতে ছিল রিকশা। যাত্রার বাহন হিসেবে ব্যবহার করার আরও একটি কারণ এর সুসজ্জিত ও আকর্ষণীয় বেশভূষা। কেননা সেই সময় রিকশার চৌকোনো বোর্ড ও পেছনের বডির গায়ে পাতলা টিনের শিটের ওপর বাহারি রঙের ডিজাইনের আদলে চিত্রিত হতো বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন ঘটনার সংক্ষিপ্ত স্বচিত্র আদ্যোপান্ত। এ ধরনের চিত্র অঙ্কনকে বলা হয়ে থাকে রিকশাচিত্র বা রিকশা পেইন্টিং।

শিল্পীরা নিঁখুত কারুকার্যের মাধ্যমে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের বিষয়ে রিকশা পেইন্টিং করতেন। মূলত পঞ্চাশ ও ষাটের দশক থেকে রিকশা পেইন্টিং বাংলাদেশে তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জনপ্রিয় হতে থাকে। এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে ষাটের দশকে মূলত শীর্ষস্থানীয় চলচ্চিত্র তারকাদের প্রতিকৃতি অবলম্বনে শিল্পীদের সৃষ্ট রিকশা পেইন্টিং। কিন্তু সত্তরের দশকের মাঝামাঝি রিকশায় মানুষের ছবি আঁকার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হওয়ার ফলে রিকশাচিত্রে স্থান পায় পশুপাখির ছবি, গ্রামবাংলার জনজীবন, প্রাকৃতিক দৃশ্য, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঘটনাবলিসহ বিভিন্ন রূপকথা, উপাখ্যান বা ধর্মীয় ঘটনা, ভিনদেশি দৃশ্যগুলো প্রভৃতি। পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন আলোচিত উন্নয়নকাজগুলোও শিল্পীদের চিত্রকল্পে স্থান পাচ্ছে।

অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীদের হাত ধরে, রিকশা পেইন্টিংয়ের কদর দেশ ছাড়িয়ে বিশ্ব কারুশিল্পগুলোর কাতারে স্থান পেলেও, বর্তমানে রিকশার ব্যবহার থাকলেও স্থবির হয়ে গেছে এর স্বকীয় বিষয়বস্তু, নিখুঁত উপস্থাপন ও নান্দনিক শিল্পশৈলী। এসব নজরকাড়া রিকশা চিত্রগুলোর স্থান এখন শোভা পাচ্ছে দেশ-বিদেশের মিউজিয়ামগুলোতে; কারণ সাম্প্রতিক সময়ের হাতেগোনা সক্রিয় রিকশাচিত্রীরা বিদেশি ক্রেতাদের ওপর নির্ভরশীল। পূর্বের হাতে আঁকা প্লেটের বিকল্প হিসেবে ডিজিটাল সস্তা প্রিন্ট ব্যবহারের চাহিদা বাড়ায় রিকাশাচিত্রীদের বেশি দামি হাতে আঁকা রিকশা চিত্রগুলো দেশীয় বাজারে সচরাচর কেউ কিনতে চায় না। আবার

তাদের কাজেও দেখা যায় না আগের মতো শিল্পবৈচিত্র্য ও পাড়া-মহল্লার রিকশার সাজসজ্জার দোকানগুলোয় নেই ক্রেতাদের ভিড়। ফলে পেশাগত দিক দিয়ে ক্ষতির সম্মুখীন রিকশাচিত্রীদের অনেকেই এই পেশা ত্যাগ করে জীবিকার তাগিদে বিকল্প পেশায় নিয়োজিত হচ্ছে; যার ফলে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে এই কারুশিল্পের চমৎকার শিল্পধারা।

রিকশাচিত্রের কদর কমে যাওয়ায় শিল্পটি এখন শেষ সময় অতিবাহিত করছে। বর্তমানে ‘জরপশংযধি ধৎঃ রহ ইধহমষধফবংয ওয়েবসাইটে শিল্পীদের আঁকা ছবি দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তে বিক্রি হয়ে থাকে। ফলে দেশের সমৃদ্ধিতেও রিকশাচিত্র গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কিন্তু এই সমৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ও সহায়ক রিকশাচিত্রকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন প্রান্তিক পর্যায়ের গুণী শিল্পীদের পুনরায় তাদের পেশায় ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চালানো এবং সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। নইলে অকালেই লুপ্ত হবে ঐতিহ্যবাহী রিকশাচিত্র।

সুরাইয়া

শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়