প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

পরবর্তী প্রজন্মের ফার্মাসিস্টদের পছন্দের কর্মক্ষেত্র

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর…….

ট্রেজারি চালান তৈরিতে পৌর এলাকার জন্য দেড় হাজার টাকা এবং পৌর এলাকার বাইরে ৭৫০ টাকার চালান করতে হয়। এ ট্রেজারি চালান শুধু বাংলাদেশ ব্যাংক বা বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত কোনো ব্যাংকে জমা দিতে হয়। এ টাকা জমা দেওয়ার কোড নম্বর হলো: ১২৭১৫০০০০০৮৬৩।

২০১০ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে ড্রাগ লাইসেন্স পাওয়া বৈধ ফার্মেসির সংখ্যা আনুমানিক ৮৭ হাজার। ২০১০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের ওষুধের বাজার ছিল প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার। এ ওষুধের ৮০-৮৫ শতাংশ (আনুমানিক) খুচরা বা ব্যক্তিমালিকানাধীন ফার্মেসি ও বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিষ্ঠিত ফার্মেসির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি বা বিতরণ করা হয়। বাকি ওষুধ বিদেশে রফতানি করা হয়।

একটি নতুন রিটেইল ফার্মেসি প্রতিষ্ঠা করার আগে সেই এলাকায় ফার্মেসি চালু থাকার মতো সামাজিক চাহিদার মৌলিক বিশ্লেষণ করতে হয়। এ বিশ্লেষণের দুটি দিক রয়েছে। একটি পরিমাণভিত্তিক, অন্যটি হলো গুণগত মানভিত্তিক। মৌলিক বিশ্লেষণে যদি প্রতীয়মান হয় যে ওই এলাকায় একটি নতুন রিটেইল ফার্মেসির চাহিদা রয়েছে, তবেই তা প্রতিষ্ঠার জন্য অগ্রসর হওয়া উচিত, নতুবা নয়। এরপর তিনটি বিষয় নির্ধারণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হয় এক. রিটেইল ফার্মেসির মালিকানার ধরন নির্ধারণ করা; দুই. রিটেইল ফার্মেসির জন্য স্থান নির্ধারণ করা এবং তিন. রিটেইল ফার্মেসি গড়ার জন্য অর্থের পরিমাণ

ও উৎস নির্ধারণ করা মালিকানা বা সংগঠনের ধরন

রিটেইল ফার্মেসি তিন ধরনের মালিকানা বা সংগঠনের যে কোনো একটি হিসেবে গড়া যায়। যেমন এক. একক মালিকানা; দুই. যৌথ মালিকানা; তিন. করপোরেশন।

আমাদের দেশের বেশিরভাগ ফার্মেসিই একক মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত। কিছু যৌথ মালিকানার ফার্মেসিও রয়েছে। তবে সরকারি সহায়তা নিয়ে করপোরেশনভিত্তিক কোনো ফার্মেসি বাংলাদেশে এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

স্থান নির্বাচন: নতুন রিটেইল ফার্মেসি প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে সিদ্ধান্ত নিতে হয় তা হলো স্থান নির্ধারণ। স্থান নির্ধারণের জন্য প্রধানত চারটি বিষয় মূল্যায়ন করতে হয়। এগুলো হলো এক. এলাকার জনসংখ্যা; দুই. জনসাধারণের আয়ের পরিমাণ; তিন. শ্রমশিল্পের ধরন ও চার. প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসা

তাছাড়া কোনো ফার্মাসিস্ট কোনো নির্দিষ্ট স্থানে ফার্মেসি স্থাপন করতে চাইলে তার কিছু ব্যক্তিগত কারণ জড়িত থাকতে পারে। যেমন এক. পারিবারিক বন্ধন; দুই. ব্যবসায়িক পরিবেশ; ও তিন. সামাজিক আনুগত্য।

রিটেইল ফার্মেসি প্রতিষ্ঠার জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করার আগে কিছু বিষয়ে অতিসতর্ক বিবেচনা প্রয়োজন। কারণ ব্যবসায়িক সফলতা প্রতিষ্ঠানটির অবস্থানের ওপর বেশ কিছুটা নির্ভরশীল। এগুলোর মধ্যে প্রথমত, রিটেইল ফার্মেসি প্রতিষ্ঠার স্থানটি জনবসতির মধ্যস্থানে হওয়া বাঞ্ছনীয়, যাতে ওষুধের চাহিদা সবার জন্য সহজগম্য ও নিরাপদ হয়। তৃতীয়ত, পরিবহনের মাধ্যমে যাতে সেই স্থানে সহজে ওঠানামা করা যায়। চতুর্থত, ওষুধ ও ফার্মেসিসেবা যেন প্রয়োজনীয় গুণগত মানের হয় ও সুলভ মূল্যে সর্বদা পাওয়া যায়।

মূলধন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা

রিটেইল ফার্মেসির মূলধন তিন ধরনের হয়। এগুলো হলো : এক. নগদ অর্থ; দুই. তালিকাভিত্তিক ওষুধ ও স্বাস্থ্যসামগ্রীর পরিমাণ; তিন. আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি।

আমাদের দেশে বর্তমানে একটি মাঝারি মাপের নতুন রিটেইল ফার্মেসি স্থাপনের জন্য নিচে উল্লিখিত পরিমাণের মূলধন প্রয়োজন:

এক. নগদ অর্থ-এক লাখ টাকা

দুই. ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী -পাঁচ লাখ টাকা

তিন. আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি- দুই লাখ টাকা

সর্বমোট মূলধন   = আট লাখ টাকা

নগদ টাকা থেকে রিটেইল ফার্মেসি প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক খরচ (যেমন, দোকান ভাড়া, লাইসেন্স ফি ও আনুষঙ্গিক খরচ, প্রচার বাবদ খরচের অর্থ, প্রথম তিন মাসের জন্য বিদ্যুৎ বিল ও কর্মীদের বেতন-ভাতা প্রভৃতি) মেটানোর জন্য রাখতে হয়।

ওষুধ ও মূলধনের অর্থের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সাত থেকে আট লাখ টাকার মূলধন দিয়ে বার্ষিক আনুমানিক পনেরো থেকে বিশ লাখ টাকার ওষুধ কেনাবেচা করা সম্ভব।

রিটেইল ফার্মেসি ব্যবস্থাপনা

সাধারণভাবে ব্যবস্থাপনা বিষয়টি যথেষ্ট জটিল। কারণ সমস্যাগুলো নিরসনের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট সূত্র নেই। একই সমস্যা বিভিন্ন ব্যক্তি তার নিজস্ব পদ্ধতিতে সমাধান করে থাকেন। এর জন্য প্রয়োজন হয় বুদ্ধিমত্তা, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও দূরদৃষ্টি। ব্যবস্থাপনার গুরুদায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিকে ব্যবস্থাপক বলা হয়।

ব্যবস্থাপকের গৃহীত সিদ্ধান্ত দ্বারা প্রতিষ্ঠান সরাসরি প্রভাবিত হয়। তাই ব্যবস্থাপক নির্বাচনে সর্বোচ্চ সতর্কতা গ্রহণ করা উচিত। রিটেইল ফার্মেসিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একজন ফার্মাসিস্ট ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সামাজিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার পাশাপাশি ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব একজন ফার্মাসিস্টকে করে তোলে অনন্য। তাই একজন ফার্মাসিস্টকে তার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রগুলো ভালোভাবে জানতে হবে। এ ক্ষেত্রগুলো একটি অন্যটির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। যে কোনো সিদ্ধান্ত একাধিক ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করতে পারে। একটি ভুল সিদ্ধান্ত স্বাস্থ্যসেবায় বিপর্যয়ের পাশাপাশি সমগ্র ব্যবসাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। অন্যদিকে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রিটেইল ফার্মেসির সুনাম ও সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব।

একজন ফার্মেসি ব্যবস্থাপককে মনে রাখতে হবে, ব্যবস্থাপনা সব সময় গতানুগতিক কাজ নয়। তাই নিয়মিত সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি একটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ঠিক করে সেই লক্ষ্য অনুযায়ী এগিয়ে যেতে হবে। তার মূল লক্ষ্য দুটি সামাজিক স্বাস্থ্যসেবা ও ফার্মেসিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। দায়িত্বশীলতা, সততা, নতুন ওষুধের ধারণা, ওষুধ প্রস্তুতকারক সম্পর্কে ধারণা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কিত অগ্রগতির ধারণা, স্বকীয়তা প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণ একজন রিটেইল ফার্মেসি ব্যবস্থাপকের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

একজন সফল ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব ও কর্তব্য

পরিকল্পনা প্রণয়ন: ভবিষ্যৎ লক্ষ্য স্থির করে ব্যবস্থাপকের প্রধান কাজ হলো পরিকল্পনা প্রণয়ন। প্রতিষ্ঠানকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান, তা ব্যবস্থাপককেই স্থির করতে হবে। ফলে প্রয়োজনীয় তথ্য, লোকবল, পর্যাপ্ত স্থানের প্রয়োজনীয়তা, আয়-ব্যয় প্রভৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে, তাও বোঝা যাবে।

অর্থ ব্যবস্থাপনা: পরিকল্পনা প্রণয়নের পরই ব্যবস্থাপককে খাত নির্ধারণ করে সেই অনুযায়ী বাজেট ঠিক করতে হবে। এক্ষেত্রে মনগড়া কোনো কিছু করা যাবে না। সাধারণভাবে দোকান ভাড়া, ওষুধ, আসবাবপত্র, কর্মচারীর বেতন, রেফ্রিজারেটর প্রভৃতি বিষয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

বাজেট নির্ধারণের পর অর্থের উৎস নিশ্চিত করতে হবে। অর্থের উৎসের ধরন অনুযায়ী বাজেট পুনর্বিন্যাস করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোনো ব্যক্তি ব্যাংকঋণ নিয়ে ওষুধের দোকান দিতে চান। এর জন্য তিনি ২০ লাখ টাকা ঋণ নিচ্ছেন। ব্যাংক তাকে পুরো টাকা একবারে না দিয়ে ত্রৈমাসিক কিস্তিতে টাকা দিতে রাজি হলো। এক্ষেত্রে ওই ব্যক্তিকে একটি ত্রৈমাসিক বাজেট প্রণয়ন করতে হবে এবং লক্ষ রাখতে হবে, প্রতি তিন মাসে খরচ কোনোভাবেই যেন পাঁচ লাখ টাকা ছাড়িয়ে না যায়।

একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যবস্থাপক সম্ভাব্য ব্যয় ও সম্ভাব্য অর্থের উৎস সম্পর্কে ধারণা করে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবেন। অন্যথায় প্রতিষ্ঠান কখনোই লাভজনক হবে না।

পণ্যদ্রব্য ব্যবস্থাপনা: ফার্মেসির পণ্যদ্রব্যের প্রধান হলো ওষুধ। মূলধনের বড় অংশ ব্যয় হয় পণ্যদ্রব্যের জন্য। তাই এ বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন হতে হবে। এ ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য হলো রোগী বা ক্রেতা ওষুধ না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছে, এমনটি যেন না হয়।

কী ধরনের ওষুধ দোকানে মজুত করতে হবে, তা মূলত নির্ভর করে ওই এলাকায় কী কী রোগ সচরাচর হয় এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের ওপর। এক্ষেত্রে ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যেসব ওষুধ কম চলে, তা বেশি পরিমাণে মজুদ করা যাবে না। এছাড়া প্রস্তুতকারকের নির্দেশিত ব্যবস্থাপনায় ওষুধ সংরক্ষণ করতে হবে।

বিক্রয় প্রতিনিধি দ্বারা প্ররোচিত হয়ে নি¤œমানের ওষুধ মজুত করা যাবে না। ওষুধ কখন অর্ডার দিতে হবে, একই ওষুধ একাধিকবার অর্ডার দেওয়া হলো কি না, ওষুধ দোকানে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় সময়, যেসব ওষুধের মেয়াদ অচিরেই শেষ হয়ে যাবে তার তালিকা তৈরি, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সরিয়ে ফেলা প্রভৃতি বিষয়েও ব্যবস্থাপককে সচেতন হতে হবে।

কর্মচারী ব্যবস্থাপনা: সৎ, দক্ষ ও সচেতন কর্মচারী ছাড়া একটি রিটেইল ফার্মেসি সফল হতে পারে না। দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা জন্য কর্মচারীরা ব্যবস্থাপকের হাতিয়ার। তাই কর্মচারী নির্বাচনে ব্যবস্থাপককে সচেতন হতে হবে। এ সময় শিক্ষার পাশাপাশি কর্মচারীর আচার, আচরণ ও তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষা  নেওয়া যেতে পারে। নিয়োগের পর প্রত্যেককে তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ ভাগ করে দিতে হবে। এছাড়া কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতা অনুযায়ী তাদের বেতন-ভাতা নির্ধারণ করতে হবে। অন্যথায় তাদের কর্মস্পৃহা কমে যাবে এবং অন্যত্র চলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেবে। কম বেতনের অদক্ষ কর্মচারীর চেয়ে বেশি বেতনের দক্ষ কর্মচারী অনেক বেশি কার্যকর।

অন্যান্য উপকরণ ব্যবস্থাপনা: আসবাবপত্র, শেলফ, আলমারি, কম্পিউটার, রেফ্রিজারেটর, ক্যাশমেমো, প্যাকেট প্রভৃতি ব্যবস্থাপনার দিকেও নজর দিতে হবে ব্যবস্থাপককে। উপকরণ কেনার সময় সেটির স্থায়িত্ব বিবেচনায় রাখতে হবে। যেসব উপরকণ অব্যবহারযোগ্য তা দ্রুত পরিবর্তন করতে হবে। বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। এছাড়া ফার্মেসিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখতে হবে।

দৈনন্দিন কাজ নিয়ন্ত্রণ: রিটেইল ফার্মেসির দৈনন্দিন কার্যকক্রমের একটি বড় অংশ হলো ওষুধ বিতরণ এবং বিক্রি। একটি সফল ফার্মেসিতে সারা দিন ভিড় থাকে। অনেক সময় তৎক্ষণাৎ প্রয়োজনীয় ওষুধের তাড়া থাকে। কখনও কখনও দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকেও ফার্মেসিতে নিয়ে আসা হয়। ব্যবস্থাপককে দক্ষ হাতে এসব কাজ সামলাতে হবে। কর্মচারীরা যেন রোগী বা ক্রেতাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষায় না রাখেন, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। প্রতিদিন বিক্রীত ওষুধের তালিকা করে তা মজুদের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা উচিত। এক্ষেত্রে আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করা যেতে পারে।

ড. মো. শাহ এমরান

অধ্যাপক, ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগ,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়