দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

রুখতে হবে নারী নির্যাতন

জোহরা শিউলী: বৈশ্বিক মহামারি করোনায় আমাদের জীবন এখন নিউ নরমাল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নতুনভাবে যাপন করা শুরু হয়েছে আমাদের বর্তমান জীবন। আমরা অফিস-আদালতে যাচ্ছি। ঘর থেকে বের হচ্ছি। শুধু সন্তানদের স্কুল খোলা ছাড়া প্রায় স্বাভাবিকতার পথে হাঁটছে সবাই। কিন্তু এরই মাঝে ঘটে গেছে নানা পারিবারিক সমস্যা। করোনাকালে বেড়েছে পারিবারিক নির্যাতন, যার রেশ রয়ে গেছে অনেকটা। অনেকে বিয়েবিচ্ছেদের পথেও যাচ্ছেন।

করোনার এ সময়ে পুরুষরা ঘরে বসে কাজ করছেন। পরিবারের সদস্যরা ঘরে থাকছেন। ফলে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে। বিশ্বে এই করোনার সময় লকডাউনে নারী নির্যাতন ২০ শতাংশ বেড়েছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় স্বাভাবিক অবস্থায়ও নারীর প্রতি সহিংসতা বেশি, তথাপি করোনাকালে এ চিত্র আরও প্রকট বিশ্বব্যাপী। পৃথিবীর এমন দুঃসময়ে সমন্বয়হীনতা চরম অবক্ষয় ডেকে আনতে পারে সবার জন্য। এ সংকটকালে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে নারীরা ও কিশোরীরা। বেড়েছে নারী নির্যাতন, বেড়েছে বাল্যবিয়ে। 

চাকরি হারাচ্ছেন অনেকে। কারওবা রয়েছে কোনোমতে বিনা বেতনে চাকরি। অর্থনৈতিক টানাপড়েন ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে হতাশা ও অস্থিরতাবোধ করায় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সহিংস আচরণের ঘটনা ঘটছে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব বেশি পড়ছে নারী ও কন্যাশিশুর ওপর। তারা নানাভাবে শারীরিক ও মানসিক বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। করোনার মতো মহামারির মধ্যেই ঘটে যাচ্ছে ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ, বাল্যবিয়ে, বিয়েবিচ্ছেদ ও নারী পাচারের মতো ঘটনা।

করোনার এ সময়ে নারী নির্যাতনের ওপর গবেষণা চালাচ্ছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিনিয়ত নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলোর কিছু ঘটনা প্রকাশ পায়, আবার কিছু প্রকাশ পায় না। গবেষণার আওতায় ৬৭২ নারীকে পাওয়া গেছে, যারা আগে কখনও নির্যাতনের শিকার হননি। লকডাউনের মধ্যে নারীদের ওপর এ নির্যাতনও বেড়েছে। আর এই নির্যাতনে স্বামীরাই প্রধানত জড়িত। করোনাকালে তাদের কাজ কমে গেছে। কমে গেছে আয়ের উৎস। তারা বাইরে যেতে পারছেন না। আড্ডা বিঘিœত হচ্ছে। আর এসব কারণে তারা নারীকেই দোষী সাব্যস্ত করছেন। নারীকে দায়ী করার এই মানসিকতার পেছনে নির্যাতনের প্রচলিত মানসিকতাই কাজ করছে। এর বাইরে পরিবারে শ্বশুর-শাশুড়িসহ অন্য সদস্যদেরও ভূমিকা আছে।

করোনার কারণে সমাজে বাল্যবিয়ের সংখ্যাও বেড়েছে। করোনার কারণে মানুষের দারিদ্র্য বেড়েছে। তাই অভিভাবকেরা বিয়ে দিয়ে দারিদ্র্য থেকে বাঁচার জন্য পথ খুঁজছেন। করোনা নিয়ে ব্যস্ততার কারণে এ সময় বাল্যবিয়ে-বিরোধী প্রচার ও তৎপরতা কমে গেছে। এ সুযোগে কন্যাসন্তানকে শিশু বয়সেই বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন অনেক অভিভাবক।

পরিবর্তিত সময়ে বেকারত্ব ও হতাশা বাড়ায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, অর্থনৈতিক নির্যাতন এবং ধর্ষণের পর হত্যার মতো নৃশংস ঘটনাগুলোও বাড়ছে। দীর্ঘদিনের সমাজ ব্যবস্থায় নারীর ওপর নিপীড়ন চেপে যাওয়ার স্বভাব এবং আইনের ফাঁক গলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার কারণে অপরাধী সহজেই অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে।

ইংল্যান্ডের বিখ্যাত সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ান বিশ্বব্যাপী নারী নির্যাতন এমন হারে বাড়ায় আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। যে সময়টায় বিশ্বব্যাপী লকডাউন চলছিল, ইংল্যান্ডে নারী নির্যাতন, শিশু নিপীড়ন ও পারিবারিক সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। পারিবারিক নির্যাতন বৃদ্ধি পেয়েছিল ফ্রান্সেও। দেখা গেছে লকডাউনের পর ফ্রান্সের বেশ কয়েকটি পুলিশ স্টেশনে পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগের হার ৩০ শতাংশ বেড়েছিল। জাতিসংঘ বলেছে, তুলনামূলকভাবে দরিদ্র ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোয় ঘরে যারা নিপীড়নের শিকার হন, তাদের ক্ষেত্রেও পারিবারিক সহিংসতা বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে।

উন্নত বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থাও এক্ষেত্রে খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। তুলনামূলকভাবে করোনাকালে ধর্ষণের হার সবচেয়ে বেশি এবং তা শিশুদের ক্ষেত্রেই বেশি। এ ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ ভিকটিমই শিশু। পরিসংখ্যান মতে, শিশুদের পাশাপাশি বহু নারীও স্বামীর কাছ থেকে আলাদা থাকার সিদ্ধান্তে আইনজীবীর দ্বারস্থ হয়েছেন।

করোনাকালে নারীরা স্বামীর হাতেই শুধু নয়, সংবাদপত্রের খবর পর্যালোচনা করে দেখা যায়, স্বামী, প্রতিবেশী এমনকি সহপাঠীদের দ্বারাও সহিংসতার শিকার হয়েছে। নারী নির্যাতনের ঘটনা কোথায় বেশি ঘটেছেÑশহরে নাকি গ্রামে? পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গ্রামকেন্দ্রিক ঘটনা বেশি হলেও মফস্বল শহরে পৌরসভার ভেতরেও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো যারা এতদিন কোনোরকম নির্যাতনের শিকার হননি, এবার প্রথমবারের মতো তারাও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কেউ কেউ প্রতিবাদ করেছেন। অনেকে বরাবরের মতো নীরবে সয়েই গেছেন। শিশুসহ প্রান্তিক নারী, গার্মেন্ট কর্মী ও গৃহপরিচারিকাদের মতো নি¤œমধ্যবিত্ত কিংবা দরিদ্র শ্রেণির নারীরা বেশি সহিংসতার শিকার হয়েছেন এ করোনাকালে।

করোনাকালে গৃহবন্দি থাকার এই সময়টাতে নারী নির্যাতন বেড়েছে। যারা কখনও নির্যাতনের মুখোমুখিও হননি, তারাও এ কারোনাকালে শিকার হয়েছেন নির্যাতনের। নারী নির্যাতনের এই চিত্র বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইডের এক রিপোর্টে দেখা যায়, ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয় চার হাজার ৬২২ নারী। এ সময় শিশুবিয়ের ঘটনাও ঘটেছে ৯৭টি এবং বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে ১৬৯ শিশুমেয়েকে।

ঘটনা বিেেশ্লষণ করলে দেখা যায়, করোনাসহ বিভিন্ন মহামারিতে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার পেছনে অর্থনৈতিক মন্দা ও দারিদ্র্যের কারণে সৃষ্ট চাপ, পুরুষতান্ত্রিক মনমানসিকতা, কোয়ারেন্টাইনে থাকার ফলে সৃষ্ট কর্মহীনতা, হতাশা, মানসিক চাপ, সামাজিক দূরত্ব প্রভৃতি দায়ী।

করোনাকালে পুরুষ ঘরে থাকতে বাধ্য হওয়ার ফলে নারীর ওপর সহিংসতা আরও বেড়েছে। উন্নয়নশীল দেশের সামাজিক রীতি অনুসারে সংসারের অর্থনৈতিক চালিকা পুরুষের কাঁধেই বর্তায়। এরই মধ্যে বহু মানুষ তাদের চাকরি হারিয়েছে। ফলে তাদের বেশিরভাগই প্রচণ্ড অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। অনেককেই ধার-দেনাসহ বিভিন্নভাবে সংসার চালোনোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে হয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট থেকে সৃষ্ট হতাশা ও মানসিক অবসাদ পুরুষদের আরও সহিংস করে তুলেছে, যার রেশ ধরেই বৃদ্ধি পেয়েছে নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলো। প্রকট অর্থনৈতিক সংকটে থাকার ফলে নি¤œবিত্ত পরিবারগুলোয় এই সহিংসতার হার আরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

‘চাকরিহীন পুরুষ দ্বারা তার সঙ্গিনীকে নির্যাতনের হার কর্মসংস্থানে থাকা পুরুষের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি’Ñস্টাইডার ও তার সহলেখকরা ২০১৬ সালে এই গবেষণাটি করেন। আমেরিকায় বিশ্বমন্দার সময় তারা এই গবেষণাটি করেন। পাশাপাশি ২০১৯ সালে বিশ্বের ৩১টি দেশের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বমন্দায় পুরুষের বেকারত্বের কারণে নারী নির্যাতনের হার দুই দশমিক পাঁচ শতাংশ বেড়েছিল।

জনসংখ্যার দিক থেকে শিশু ও যুববয়সের সংখ্যা এ দেশে সবচেয়ে বেশি। আমাদের সন্তান ও যুবসমাজকে নারীর প্রতি সহিংসতা পরিহার করতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। নারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে ও শ্রদ্ধাশীল হতে শিখতে হবে। সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবর্তন আনতে হবে। ইতিবাচক পরিবর্তন ও ইতিবাচক মনোভাব আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।

বিপর্যস্ত নারীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকারি বেশ কয়েকটি উদ্যোগ থাকলেও তাদের আরও সহায়তা প্রয়োজন। মহিলা-বিষয়ক অধিদপ্তরের আওতায় নির্যাতিত নারীদের আইনগত পরামর্শ ও সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। ১৯৮৬ সালেই নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কার্যক্রম জেলা মহিলা-বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় ও উপজেলা মহিলা-বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে সম্প্রসারিত হয়। ইউনিয়ন পর্যায়েও নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়। এ কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী ও বেগবান করার জন্য মহিলা সহায়তা কর্মসূচি প্রকল্প নামে একটি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। কিন্তু জাতীয় মহিলা সংস্থার আওতায় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেল নামে একটি লিগ্যাল এইড সেল রয়েছে। সপ্তাহে দুই দিন চার সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটির মাধ্যমে নির্যাতিত, দুঃস্থ ও অসহায় নারীদের বিনা খরচে আইনগত সহায়তা প্রদান করা হয়ে থাকে। এর আওতায় এই সহায়তা দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও রয়েছে। দুঃস্থ নারীদের সহায়তা দেওয়া হলেও অনেকেই জানেন না সরকারি সেবাপ্রাপ্তির সঠিক তথ্য। তাই এ বিষয়ে তথ্য প্রচারেও প্রয়োজন যথাযথ উদ্যোগ।

নারী ও শিশু নির্যাতন শুধু যে আমাদের দেশেই হয়, এমন নয়। এরকম নির্যাতনের ঘটনা বিশ্বের অনেক দেশেই হয়। তবে তা প্রতিরোধে সব দেশেই কম-বেশি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় এবং তা অনেক ক্ষেত্রেই আরও কঠোরভাবে করা বাঞ্ছনীয়।

নারী নির্যাতনের এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে বলে এখনও ঘটবে, এ ধরনের মনোভাব থেকে বের হয়ে আসতে হবে। অন্যান্য দেশে হচ্ছে বলে আমাদের দেশেও হতে হবে এমন তো কথা নেই। প্রতিবাদ-প্রতিরোধ হবে না এবং সমাজ মেনে নেবে নিশ্চয়ই এমনটা হতে পারে না। নারী নির্যাতন বন্ধে সবার সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পিআইডি নিবন্ধন

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..