বিশ্ব সংবাদ

রেকর্ড সর্বোচ্চে বিশ্ব পুঁজিবাজার

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তির প্রভাব

শেয়ার বিজ ডেস্ক : দীর্ঘদিনের বাণিজ্যযুদ্ধ নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন প্রথম দফার বাণিজ্যচুক্তিতে পৌঁছেছে। এর প্রভাবে গতকাল শুক্রবার বিশ্ব পুঁজিবাজার সূচকগুলো রেকর্ড সর্বোচ্চে পৌঁছায়। যদিও চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শ্লথগতির প্রতিবেদন প্রকাশে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তবে বাণিজ্যচুক্তির প্রভাবে এটি বাজারকে নি¤œমুখী করতে পারেনি। খবর: রয়টার্স।

গতকাল বিশ্বের ৪৭ দেশের শেয়ার সূচক নির্ধারণকারী সার্বিক সূচক এমএসসিআই দশমিক দুই শতাংশ বেড়ে যায়। সূচকটি এদিন রেকর্ড সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছায়। এর আগের দিন মার্কিন পুঁজিবাজার রেকর্ড সর্বোচ্চ অবস্থানে লেনদেন শেষ করে। বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রধান তিন সূচক নাসডাক, ডাও জোনস ও এসঅ্যান্ডপি সূচক বেড়েছে যথাক্রমে এক দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ, দশমিক ৯২ শতাংশ ও দশমিক ৮৪ শতাংশ।

ইউরোপের বাজারের মধ্যে লন্ডনের এফটিএসই সূচক বেড়েছে দশমিক ৮৭ শতাংশ। জার্মানির ডিএএক্স সূচক বেড়েছে দশমিক ৬০ শতাংশ এবং ফ্রান্সের সিএসি সূচক বেড়েছে দশমিক ৮০ শতাংশ। এ অঞ্চলের অন্য বাজারগুলোও ছিল ঊর্ধ্বমুখী।

জাপান বাদে এশিয়ার সার্বিক সূচক গতকাল বেড়েছে দশমিক চার শতাংশ। জাপানের নিক্কেই সূচক বেড়েছে দশমিক ৪৫ শতাংশ। অন্য বাজারের মধ্যে হংকংয়ের হ্যাংসেং সূচক বেড়েছে দশমিক ৬০ শতাংশ এবং সাংহাই সূচক দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ। এদিন এ অঞ্চলের অন্য বাজারও ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ছিল।

চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর (এনবিএস) প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তিন দশকের মধ্যে সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমে এসেছে। ২০১৯ সালে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ছয় দশমিক এক শতাংশ। ২০১৮ সালে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ছয় দশমিক ছয় শতাংশ। দেশীয় চাহিদা হ্রাস ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে দেশটির প্রবৃদ্ধিতে এমন নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

প্রায় দুই বছর ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যযুদ্ধের মধ্যে কিছুদিন আগেই কিছুটা আশার আলো দেখতে পেয়েছেন ব্যবসায়ীরা। গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন ও বেইজিং প্রথম পর্যায়ের বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করেছে। যদিও এ চুক্তি কতটুক ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বিশ্লেষকদের। তবে প্রবৃদ্ধির নি¤œহারের কারণে বেইজিং শিগগিরই কার্যকর ব্যবস্থা নেবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এ হার নিয়ন্ত্রণে ট্যাক্স মওকুফ, অবকাঠামোগত কার্যক্রমে অভ্যন্তরীণ সরকারকে বড় অঙ্কে বন্ড বিক্রির অনুমতি দেওয়া হতে পারে। এছাড়া চীনের ব্যাংকগুলোকেও অধিক পরিমাণে ঋণ দিতে উৎসাহিত করা হচ্ছে, বিশেষ করে ছোট খামারের জন্য। গত বছর স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ দেওয়া হয়েছে প্রায় দুই দশমিক ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশটির নতুন রেকর্ড।

দু’দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনা অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী লিউ হে ১৫ জানুয়ারি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। দীর্ঘ আলোচনার পর এ চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ায় উভয় পক্ষই সন্তোষ প্রকাশ করেছে। ওয়াশিংটনে দেওয়া বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, এই চুক্তি মার্কিন অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনবে। আর চীনা নেতারা এটিকে উইন-উইন চুক্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন। এটি দু’পক্ষের মধ্যে সম্পর্ক আরও ভালো করবে বলে তারা মনে করছেন।

প্রথম পর্বের এ চুক্তি স্বাক্ষর করার পর এখন দ্বিতীয় পর্যায়ের বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু করবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সরকার। ২০২০ সালে বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতির মধ্যকার এ আলোচনা প্রথম পর্বের তুলনায় আরও জটিল হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চুক্তি হলেও বিশ্ব অর্থনীতিতে বিদ্যমান শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গেও একই ধরনের বাণিজ্যবিরোধ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের, যার সমাধানে আসতে পারেনি উভয় পক্ষ। চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়েসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়ে জটিলতাও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

নতুন বাণিজ্যচুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি বাড়িয়ে ২০ হাজার কোটি ডলারের ওপরে নিয়ে যাবে চীন। এর মধ্যে কৃষিপণ্য আমদানি বাড়াবে তিন হাজার ২০০ কোটি ডলারের। পাশাপাশি শিল্পপণ্য সাত হাজার কোটি ডলার, বৈদ্যুতিক সামগ্রী পাঁচ হাজার ২০০ কোটি ডলার এবং সেবা খাতে তিন হাজার ৮০০ কোটি ডলারের আমদানি বাড়াবে চীন। পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক পণ্য চুরির যে অভিযোগ রয়েছে, সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে সম্মত হয়েছে চীন। এজন্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা হবে।

বিপরীতে ৩৬ হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত চীনা পণ্য আমদানিতে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করবে যুক্তরাষ্ট্র। আর ১০ হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত মার্কিন পণ্য আমদানিতে শুল্ককাঠামো পুনর্বিন্যাস করবে চীন। এই বাণিজ্যযুদ্ধ চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নতির পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন পরিস্থিতি তৈরি করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। অবশ্য এতে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমলেও এখনও ঘাটতির পরিমাণ ৩৬ হাজার কোটি ডলার।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..