দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

রেয়াতি সুবিধার কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি

বিকাশ কাটিং

রহমত রহমান: উৎপাদন করে করোগেশন শিট, কিন্তু রেয়াতি সুবিধা নেয় প্রি-ফেব্রিকেটেড বিল্ডিং উৎপাদক হিসেবে। মূলত রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বছরের পর বছর এমন জালিয়াতি করে আসছে আয়রন অ্যান্ড স্টিল ও প্রি-ফেব্রিকেটেড বিল্ডিং প্রস্তুতকারক ‘বিকাশ কাটিং অ্যান্ড করোগেটেড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। রাজধানীর অদূরে কেরানীগঞ্জের খাজা নিহাল গ্রুপের প্রতিষ্ঠানটি এক বছরে মিথ্যা তথ্য দিয়ে রেয়াতি সুবিধা নিয়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকার বেশি।

প্রতিষ্ঠানটির রেয়াতি সুবিধার জালিয়াতি উদ্ঘাটন করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। আর জালিয়াতি ধরা পড়ায় প্রতিষ্ঠানটি রেয়াতি সুবিধার অপব্যবহারের বিষয়টি স্বীকার করেছে। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আগানগর ইউনিয়নের আয়রন অ্যান্ড স্টিল ও প্রি-ফেব্রিকেটেড বিল্ডিং প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কাস্টমস প্রসিকিউর কোড (সিপিসি) ৪০১-এর দীর্ঘদিন ধরে অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি দেখতে পায়, প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ও পানগাঁও কাস্টম হাউস দিয়ে প্রি-ফেব্রিকেটেড বিল্ডিং তৈরির কাঁচামাল (এইচএস কোড ৭২১০.৪৯.১০) সিপিসি ৪০১ বা রেয়াতি সুবিধায় আমদানি করে। এসব কাঁচামালের মোট করভার (টিটিআই) ৫৮ দশমিক ৬০ শতাংশ থাকলেও রেয়াতি সুবিধায় করভার ৩৭ শতাংশ। কমিটি তথ্য যাচাই-বাছাই এবং প্রতিষ্ঠান ও এর গোডাউন সরেজমিন পরিদর্শন করে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ও পানগাঁও কাস্টম হাউসের পৃথক দুটি প্রতিবেদন দেয়।

অপরদিকে কাস্টমস গোয়েন্দা ২১ জুলাই পানগাঁও কাস্টম হাউসে প্রতিষ্ঠানটির রেয়াতি সুবিধার একটি চালান আটক করে। পরে প্রতিষ্ঠানটি রেয়াতি সুবিধা ছাড়াই চালানটি খালাসে রাজি হয়। তবে খালাস না করেই রেয়াতি সুবিধা বহাল রাখার জন্য উচ্চ আদালতে একটি রিট করে। প্রতিষ্ঠানটি সিপিসি সুবিধাপ্রাপ্ত হবে কি না, সে বিষয়ে পাঁচ কার্যদিবস ও পরবর্তী তিন কার্যদিবসের মধ্যে খতিয়ে দেখতে পানগাঁও কাস্টম হাউসকে নির্দেশ দেন আদালত। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পানগাঁও কাস্টম হাউস সাত সদস্যের কমিটি গঠন করে। কমিটি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও যাচাই করে প্রতিবেদন দেয়। এতে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি রেয়াতি সুবিধা পাবে না। পরে ওই প্রতিবেদনের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করে প্রতিষ্ঠানটি রেয়াতি সুবিধা ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে শুল্কায়ন করে পণ্য খালাস নেয়। পানগাঁও কাস্টম হাউসের গঠিত কমিটি ও কাস্টমস গোয়েন্দার গঠিত কমিটি অনুসন্ধান শেষে প্রায় একই রকম প্রতিবেদন দেয়।

অপরদিকে, কাস্টমস গোয়েন্দার গঠিত কমিটির দুটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস দিয়ে ৭২টি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে প্রি-ফেব্রিকেটেড বিল্ডিং কাঁচামাল আমদানি করেছে। এর মাধ্যমে শুল্ককর হিসেবে ১১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা রেয়াতি সুবিধা নিয়েছে। এছাড়া একই সময়ে পানগাঁও কাস্টম হাউস দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ১৪টি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে একই কাঁচামাল আমদানি করে এক কোটি ৮৮ লাখ টাকা রেয়াতি সুবিধা নিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ১২ জুলাই প্রতিষ্ঠান ও এর গোডাউন পরিদর্শন করা হয়। এতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন নেই। কারখানার মেশিনারিজের অধিকাংশই পুরনো, মরিচা ধরা ও অকার্যকর। অথচ উৎপাদনের শর্তে প্রতিষ্ঠানটি বিপুল পরিমাণ প্রি-ফেব্রিকেটেড বিল্ডিং কাঁচামাল আমদানি করেছে। এছাড়া লালবাগ ভ্যাট বিভাগ ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, প্রতিষ্ঠানের মেশিনগুলো স্থানীয় বাজার থেকে কেনা হয়েছে। এসব মেশিন দিয়ে প্রি-ফেব্রিকেটেড বিল্ডিং তৈরি কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

প্রতিষ্ঠানের দাখিলপত্র যাচাই করে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি স্টিল শিট কাটিং অ্যান্ড করোগেশন (করোগেশন শিট) উৎপাদন করে। এনবিআরের এসআরও অনুযায়ী (এসআরও-১৪৮/২০১৮, সংশোধিত এসআরও-১৫০/২০১৯) রেয়াতি সুবিধা প্রদান করা হয় প্রি-ফেব্রিকেটেড বিল্ডিং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটিকে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি প্রি-ফেব্রিকেটেড বিল্ডিং উৎপাদন করে না। তাই এর কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা নিতে পারে না।

পরিদর্শনে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত কোনো পণ্য না পেলেও তাদের বিক্রয় রেজিস্টার অনুযায়ী, তাদের উৎপাদিত পণ্য শুধু করোগেশন শিট, যা সারা দেশব্যাপী বিভিন্ন ট্রেডার্সের কাছে বিক্রি করা হয়েছে, যে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রি-ফেব্রিকেটেড বিল্ডিং ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান নয়। এছাড়া পরিদর্শনের সময় প্রতিষ্ঠানটির একটি কম্পিউটারে দলিলাদি যাচাই করে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি কোনো ধরনের মূল্য সংযোজন না করে সরাসরি কয়েল আকারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে পণ্যগুলো (কোরিয়ান কালার কয়েল, জিপি/জিআই কয়েল, ম্যাট/জিপি কয়েল, ফ্ল্যাট রোল শিট) বিক্রি করে থাকে। এসব ক্রেতার নাম, ঠিকানা ও সার্বিক বিশ্লেষণে প্রতিষ্ঠানগুলো ট্রেডার্স হিসেবে প্রতীয়মান এবং কোনোক্রমেই প্রি-ফেব্রিকেটেড বিল্ডিং ভোক্তা প্রতিষ্ঠান নয়। প্রি-ফেব্রিকেটেড বিল্ডিং একটি দৃশ্যমান স্থাপনা। সাধারণভাবে প্রি-ফেব্রিকেটেড বিল্ডিংয়ের গ্রাহক বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং এর ওয়্যারহাউসের স্বত্বাধিকারীরা হয়ে থাকে। এভাবে আমদানি করা কাঁচামাল খোলাবাজারে সরাসরি বিক্রির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এসআরও সুবিধার আওতায় রেয়াতি সুবিধার অপব্যবহার করেছে। এছাড়া খোলাবাজারে বিক্রি করায় বাণিজ্যিক আমদানিকারকরা অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছে।

যদিও রেয়াতি সুবিধার অপব্যবহারের বিষয়টি অস্বীকার করেন প্রতিষ্ঠানের মালিক মো. খাজা নেহাল। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমি রেয়াতি সুবিধার অপব্যবহার করি না। আমার প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। আমি পণ্য উৎপাদন করি। কাস্টমস গোয়েন্দা ভুল তথ্য দিয়েছে। আমার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে। আমি আদালতে গিয়েছি। আদালত আমার পক্ষে বলেছে। তবুও আমি টাকা জমা দিয়েছি।’

পরিদর্শনে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত কোনো পণ্য না পেলেও তাদের বিক্রয় রেজিস্টার অনুযায়ী, তাদের উৎপাদিত পণ্য শুধু করোগেশন শিট, যা সারা দেশব্যাপী বিভিন্ন ট্রেডার্সের কাছে বিক্রি করা হয়েছে, যে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রি-ফেব্রিকেটেড বিল্ডিং ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান নয়। এছাড়া পরিদর্শনের সময় প্রতিষ্ঠানটির একটি কম্পিউটারে দলিলাদি যাচাই করে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি কোনো ধরনের মূল্য সংযোজন না করে সরাসরি কয়েল আকারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে পণ্যগুলো (কোরিয়ান কালার কয়েল, জিপি/জিআই কয়েল, ম্যাট/জিপি কয়েল, ফ্ল্যাট রোল শিট) বিক্রি করে থাকে। এসব ক্রেতার নাম, ঠিকানা ও সার্বিক বিশ্লেষণে প্রতিষ্ঠানগুলো ট্রেডার্স হিসেবে প্রতীয়মান এবং কোনোক্রমেই প্রি-ফেব্রিকেটেড বিল্ডিং ভোক্তা প্রতিষ্ঠান নয়। প্রি-ফেব্রিকেটেড বিল্ডিং একটি দৃশ্যমান স্থাপনা। সাধারণভাবে প্রি-ফেব্রিকেটেড বিল্ডিংয়ের গ্রাহক বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং এর ওয়্যারহাউসের স্বত্বাধিকারীরা হয়ে থাকে। এভাবে আমদানি করা কাঁচামাল খোলাবাজারে সরাসরি বিক্রির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এসআরও সুবিধার আওতায় রেয়াতি সুবিধার অপব্যবহার করেছে। এছাড়া খোলাবাজারে বিক্রি করায় বাণিজ্যিক আমদানিকারকরা অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির এমন জালিয়াতির বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র ও বক্তব্য উপস্থাপন করতে চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি কোনো দলিলাদি দেখাতে পারেনি। শুধু প্রতিষ্ঠানের নামে বিবৃতি দেওয়া হয়। শুনানিতে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান রেয়াতি সুবিধা নেওয়ার পক্ষে কোনো প্রমাণাদি দেখাতে ব্যর্থ হয়। প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য ও রেয়াতি সুবিধা নেওয়ার তথ্য পর্যালোচনা করে কমিটি দেখতে পায়, প্রতিষ্ঠানটি রাজস্ব ফাঁকির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। মোট ৮৬টি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানির বিপরীতে মোট ১৩ কোটি ৫৪ লাখ ৩৬ হাজার ৮৬১ টাকা শুল্ককর ফাঁকি দিয়েছে, যা আদায়যোগ্য। পরে ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম ও পানগাঁও কাস্টম হাউস কমিশনারকে প্রতিবেদন দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, ‘আমার পেছনে লোক লেগেছে। আমি সব তথ্য কাস্টমস গোয়েন্দাকে দিয়েছি। আমার দুটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আমি প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন দিই, ভ্যাট দিই। তাহলে কীভাবে রেয়াতি সুবিধার অপব্যবহার করব?’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..