প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

রেলের ভূমি উদ্ধারে বাধা মামলা ও রাজনৈতিক চাপ

সাইদ সবুজ, চট্টগ্রাম: একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়ার পরও হাজার কোটি টাকার বেদখল ভূমি উদ্ধার করতে পারছে না বাংলাদেশ রেলওয়ে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ জেলা শহরগুলোর আশপাশে মূল্যবান জমি নিজেদের জিম্মায় নিতে পারছে না রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি। ফলে একদিকে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার, অন্যদিক প্রতি বছর রেল খাতে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ছে।
রেলের সম্পদের সঠিক ব্যবহার করা হলে লোকসানের পরিমাণ কমত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু রাজনৈতিক চাপ ও মামলা বেদখলে থাকা ভূমি উদ্ধারের প্রধান প্রতিবন্ধক বলে মনে করছেন তারা। এছাড়া সরকারদলীয় নেতা, এমপি ও মন্ত্রীদের তদবিরেও থমকে যাচ্ছে উদ্ধার কার্যক্রম এমনটি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, একসময় রেলের জায়গা বিক্রি হলেও বর্তমানে সেই সুযোগ নেই। অপারেশনাল কাজে ব্যবহার করা জায়গা বাদে বিপুল ভূমি অরক্ষিত থাকায় আয় বাড়াতে বিভিন্ন সময়ে কৃষি ও বাণিজ্যিক লিজ দেওয়া হয়েছিল। শর্ত ভঙ্গ করলে লিজ বাতিলের কথাও রয়েছে। কিন্তু তা অমান্য করে লিজের জায়গায় বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণসহ নানা কাজ অব্যাহত রেখেছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এসব ভূমি উদ্ধারে গেলে নানা দিক থেকে আসা চাপে পিছু হটতে হয় রেল কর্তৃপক্ষকে। বিভিন্ন সময়ে অবৈধ দখলদারদের পক্ষে ডিও লেটার দিয়েছেন স্থানীয় এমপি-মন্ত্রীরা।
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে এমন একটি উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্টরা জানান, মূলত উচ্ছেদ নোটিস জারির পর চট্টগ্রামের দুই সংসদ সদস্য এবং এক মন্ত্রীর ফোনে উচ্ছেদ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. শামছুজ্জমান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ভূমি উদ্ধার করতে গেলে রাজনৈতিক চাপ আসে কথাটা সত্য। এর পরও আমাদের বসে থাকলে হবে না, বেহাত হওয়া ভূমি উদ্ধার করতে হবে। বর্তমানে রেলে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। কিন্ত ভূমি দখল বন্ধ করা না গেলে হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের সুফল পাওয়া যাবে না। তবে আমাদের মন্ত্রী মহোদয় এ বিষয়ে অবগত আছেন এবং বেহাত হওয়া ভূমি উদ্ধারে কাজ করছেন।’
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ৮৫৪ একর বেদখল জমিতে ৯ হাজার ৬২৬টি অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৬৮৪ একর বেদখল ভূমিতে অবৈধ স্থাপনা রয়েছে দুই হাজার ৩৪৩টি। আর চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬৯ একর বেদখল ভূমিতে অবৈধ স্থাপনা রয়েছে সাত হাজার ২৮৩টি। এসব ভূমির মধ্যে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দখল করে রেখেছে ৫২৫ একর। তার মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৩৭৫ একর এবং চট্টগ্রাম বিভাগে রয়েছে ১৫০ একর। আর বিভিন্ন ব্যক্তি দখল করেছে ৩২৮ একর।
বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক নাসির উদ্দিন আহমেদ শেয়ার বিজকে জানান, ‘রেলের ভূমি উদ্ধারে প্রধান বাধা মামলা। অবৈধ দখলদারের কাছ থেকে ভূমি উদ্ধারে গেলে তারা আদালতে রিট করে দেন। এতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন আদালত। ফলে উদ্ধার তৎপরতা থমকে যায়। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের চাপ তো রয়েছেই।’ তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দখল করে রাখা জায়গা কেউ ছাড়তে চায় না।
এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আইন কর্মকর্তা মো. সালাহ্ উদ্দিন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘মামলার কারণে ভূমি উদ্ধার করা যাচ্ছে না, তা যেমন ঠিক; আবার মামলার রায় রেলওয়ের পক্ষে এসেছে, কিন্তু সেই ভূমি এখনও উদ্ধার করা হচ্ছে না, এমনও নজির আছে। চট্টগ্রামের মতি ঝরনা এলাকায় রেলওয়ের ২৬ একর ভূমি বেদখলে ছিল। এরপর মামলা হলে আদালতের রায় রেলওয়ের পক্ষে আসে। কিন্তু রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল এখনও ২৬ একর ভূমি উদ্ধার করেনি। অপরদিকে কনকর্ডের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করায় ফয়েজ লেকের ৩৩৬ একর ভূমি নিয়েও মামলা চলছে। কোর্ট ছয় মাসের স্থগিত আদেশ দিয়েছেন, যা অক্টোবরে শেষ হবে। এরপর দেখা যাক কী হয়।’
তথ্যমতে, জমি নিয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে এক হাজার ১৪২টি মামলা চলমান আছে। এর মধ্যে সুপ্রিমকোর্টে (আপিল বিভাগে) চলমান মামলা আছে ৩৫টি, হাইকোর্ট পর্যায়ে আছে ৪৫২টি, জজকোর্টে আছে ৬১৮টি ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে আছে ৩৭টি।
এই আইন কর্মকর্তা আরও জানান, ‘চট্টগ্রামে কনকর্ড ও মতি ঝরনা ছাড়াও বন্দরের সঙ্গে ১১০ একর ভূমি নিয়ে মামলা চলছে। একই সঙ্গে মামলা চলছে দেশের স্টিল খাতের জায়েন্ট শিল্প গ্রুপ বিএসআরএম ও তৈরি পোশাকশিল্পের কেডিএস গ্রুপের সঙ্গে। এছাড়া চট্টগ্রাম খুলশী এলাকায় ভূমি বিক্রয়-সংক্রান্ত চার একর জমি নিয়ে মামলা চলছে। অপরদিকে ঢাকা সিটি করপোরেশনের সঙ্গে শেরেবাংলা হকার মার্কেট, কাপ্তান বাজার, আনন্দ বাজারসহ বেশ জায়গা নিয়ে মামলা চলমান আছে। ফলে এসব ভূমি উদ্ধার করা যাচ্ছে না।’
এদিকে মতি ঝরনা এলাকার ভূমি উদ্ধার কার্যক্রমের দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মতি ঝরনা এলাকায় ভূমি উদ্ধার করতে হলে বড় ধরনের পরিকল্পনা প্রয়োজন। সেখানে অনেক বড় বড় বিল্ডিং রয়েছে। এগুলো অপসারণ করতে হলে বড় ধরনের ইকুইপমেন্ট লাগবে। পাশাপাশি লোকবল ও আর্থিক সাপোর্টের বিষয়ও রয়েছে। সকালে উদ্ধার করলাম আবার বিকালে অবৈধ দখলদাররা বেহাত করে নিলÑএরকম হলে উদ্ধার করে লাভ নেই। তাই পরিকল্পনা করে এগুতে চাই।’
উল্লেখ্য, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে মোট ২৪ হাজার ৪৪০ একর জায়গার মধ্যে অপারেশনাল কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে ১৫ হাজার একর, আর অবৈধ দখলকারীদের হাতে রয়েছে ৮৫৪ একর।

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..