প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

রেশম উন্নয়ন বোর্ড চালিত কারখানায় উৎপাদন শূন্য

রাজশাহী প্রতিনিধি: জনবল সংকটসহ নানা জটিলতায় ভুগছে রাজশাহীতে অবস্থিত রেশম উন্নয়ন বোর্ড। বন্ধ রয়েছে বোর্ড চালিত দুটি কারখানা। জনবল সংকট ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে উৎপাদন কমতে কমতে শূন্যের কোঠায়

নেমে এসেছে।

রেশম উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ রেশম বোর্ড সৃষ্টি করা হয়। পরে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ রেশম বোর্ড, বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ সিল্ক ফাউন্ডেশনকে একীভূত করে প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তীব্র জনবল সংকট ছিল প্রতিষ্ঠানটিতে। বিশেষ করে প্রথম শ্রেণির পদে জনবল সংকট থাকায়

কর্মরত কর্মকর্তাদের একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের প্রথম শ্রেণির ৪৮টি পদের মধ্যে ৩০টি পদই শূন্য রয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণির ৫১টি পদের শূন্য ২০টি, তৃতীয় শ্রেণির ৩২৭টি পদের শূন্য ১৪৭টি ও চতুর্থ শ্রেণির ১০৫টি পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ৬১টি।

সূত্র জানায়, ১৯৫৯-৬০ সালে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে রাজশাহী রেশম কারখানা স্থাপিত হয়। ১৯৭৬ সালে স্থাপিত হয় ঠাকুরগাঁও রেশম কারখানা। কিন্তু এ রেশম কারখানা দুটি আর্থিক সংকটের কারণে ২০০২ সালের ৩০ নভেম্বর বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হওয়ার সময় রাজশাহী রেশম কারখানায় অনুমোদিত জনবল ছিল কর্মকর্তা ১৬ জন, কর্মচারী ৯৩ জন ও শ্রমিক ৩৬১ জন। অর্থাৎ রাজশাহী রেশম কারখানায় মোট জনবল ছিল ৪৭০ জন। গোল্ডেন হ্যান্ডসেক পাওয়া জনবল ছিল ২৭২ জন।

ঠাকুরগাঁও রেশম কারখানায় অনুমোদিত জনবলের মধ্যে কর্মকর্তা আটজন, কর্মচারী ২৬ জন ও শ্রমিক ৭৭ জন ছিল। এ কারখানায় গোল্ডেন হ্যান্ডসেকপ্রাপ্ত জনবল ছিল ৮৬ জন। দুটি কারখানা মিলে অনুমোদিত জনবল ছিল ৫৮১ জন ও গোল্ডেন হ্যান্ডসেকপ্রাপ্ত জনবল ছিল ৩৫৮ জন। এর মধ্যে রাজশাহী রেশম কারখানা থেকে ২৭২ জন ও ঠাকুরগাঁও রেশম কারখানা থেকে ৮৬ জনকে গোল্ডেন হ্যান্ডসেকের মাধ্যমে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এছাড়া বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় ২০০৯ সালে রেশম কারখানা দুটির মোট ৫৮১টি পদ বিলুপ্ত করে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৪ বছর ধরে রেশম কারখানা দুটি বন্ধ থাকায় মূল্যবান মেশিনপত্র ও যন্ত্রপাতিগুলোর উৎপাদন কার্যক্ষমতা দিন দিন কমছে। এছাড়া কারখানা দুটি বন্ধ থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ বিল, পৌরকর, খাজনা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নকরণ, নিরাপত্তা ইত্যাদি খাতে বছরে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। কিন্তু সরকারিভাবে এ খরচ মেটানোর জন্য কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয় না। বুধবার রাজশাহী রেশম কারখানায় গিয়ে প্রতিটি ভবনই তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় ভবনের প্রতিটি দরজা-জানালা নষ্ট হয়ে গেছে। ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা। এলাকাজুড়ে গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য গাছপালা।

রাজশাহী রেশম উন্নয়ন বোর্ডের ভেতরে সিঁড়ির পাশের দেয়ালে বড় বড় অক্ষরে রেশম উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক উৎপাদনের পরিসংখ্যান দেওয়া আছে। পরিসংখ্যানে ১৯৮৯-৯০ অর্থবছর থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের উৎপাদনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তাতে ১৯৮৯-৯০ অর্থবছরে রেশম গুটি উৎপাদন করা হয়েছে পাঁচ লাখ ৬২ হাজার কেজি। সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয়েছে ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে। ওই বছরে মোট উৎপাদন ছিল ৯ লাখ ৫৭ হাজার কেজি। এই উৎপাদনই কমে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের এসে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩০ হাজার কেজি।

১৯৮৯-৯০ অর্থবছরে তুঁত চারা উৎপাদন ও রোপণ করা হয়েছে ১৭ লাখ। সবচেয়ে বেশি উৎপাদন ও বিতরণ করা হয়েছে ১৯৯০-৯১ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরে তুঁত চারা উৎপাদন ও রোপণ করা হয়েছিল ২৬ লাখ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কমে উৎপাদন ও রোপণ দাঁড়ায় তিন লাখ ৯৫ হাজার চারা।

১৯৮৯-৯০ অর্থবছরে রোগমুক্ত রেশম ডিম উৎপাদন ও বিতরণ করা হয় ৩১ লাখ। সবচেয়ে বেশি উৎপাদন ও বিতরণ করা ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরে রোগমুক্ত রেশম ডিম উৎপাদন ও বিতরণ করা হয় ৫২ লাখ ৮৬ হাজার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় মাত্র তিন লাখ ৭৯ হাজারে।

১৯৮৯-৯০ অর্থবছরে রেশম সুতা উৎপাদন করা হয় ৩৪ হাজার ৭০০ কেজি। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে ওই উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ হাজার ৪৫০ কেজি। এই উৎপাদনই ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৮৭০ কেজি। তবে বর্তমানে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

রেশম উন্নয়ন বোর্ডের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ বিভাগের সদস্য সেরাজুল ইসলাম জানান, কারখানা দুটি প্রাইভেটাইজেশন কোম্পানির হাতে রয়েছে। সেগুলো কখন, কীভাবে বোর্ডর অধীনে আসবে তা বলা যাচ্ছে না। তবে নিয়ে আসার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। তা সম্ভব হলে চালুর বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

রেশম শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি লিয়াকত আলী জানান, ঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে রেশমশিল্পকে আবার লাভজনক করা সম্ভব। রেশমশিল্পকে যথাযথভাবে গুরুত্ব দেওয়া হলে এই শিল্পের মাধ্যমে বহু লোকের কর্মসংস্থানও হবে।