সারা বাংলা

রোগী বহনের নামে বরিশালে চলছে স্পিডবোট

প্রতিনিধি, বরিশাল: গত ২৩ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সরকারি নির্দেশে দেশব্যাপী চলছে সর্বাত্মক কঠোর লকডাউন। কভিড-১৯ সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারি বিধিনিষেধ মানতে দেশের সব জায়গায় চলছে এ কর্মসূচি। সরকারি নির্দেশ বাস্তবায়নে মাঠে নিরলসভাবে কাজ করছেন জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা। তবে প্রশাসন কঠোর হলেও বরিশালে বেপরোয়া স্পিডবোট কোনোভাবে থামানো যাচ্ছে না। গাদাগাদি করে দ্বিগুণ যাত্রী বহন করা হচ্ছে।

স্পিডবোটগুলো সরকারি আইন অমান্য করে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে নদী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আইনের তোয়াক্কা না করে দ্বিগুণেরও বেশি ভাড়া নেয়া হচ্ছে। প্রতিদিন ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। একটি সূত্র জানিয়েছে, বন্দর থানা পুলিশ ও কোস্টগার্ডের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করেই ইজারাদার রাসেল চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের অবৈধ স্পিডবোটগুলো।

স্বাস্থ্যবিধি ও নজরদারি ছাড়াই লাহারহাটে বেপরোয়া গতির স্পিডবোট চলাচল করেছে। ট্রলার-স্পিডবোটে সামাজিক দূরত্ব নেই, নেই লাইফ জ্যাকেটও। ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ যাত্রী বহন করছে এসব নৌযান। কেন তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলে।

লাহারহাট লঞ্চ ঘাট থেকে ভোলার উদ্দেশে ট্রলারে যাত্রা করবেন আলম। তাকে মাস্ক ব্যবহারের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, মাস্ক দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে রাখলে গরমে দম আটকে আসে। নিঃশ্বাস ছাড়তে পারি না। তাই মাস্ক পরি নামে মাত্র।

বরিশাল থেকে আসা ভোলাগামী যাত্রী সাব্বির বলেন, ‘আমার বাসা ভোলায়। বরিশালের কাউনিয়ায় আল-আমিন বেকারিতে কাজ করি। জরুরি কাজে ছুটি নিয়ে দেশের বাড়িতে যাচ্ছি।’

ঘাটে বিআইডব্লিউটিএর সিটিজেন চার্ট বা ভাড়া নির্ধারিত তথ্য বোর্ড নেই। ইচ্ছানুযায়ী ঘাটের ইজারাদার রাসেল ভাড়া আদায় করে থাকেন। এতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা। তাদের অভিযোগ, বন্দর থানার কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না তারা।

লাহারহাট লঞ্চ ঘাট দিয়ে প্রতিদিন বরিশাল, হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ ও ভোলায় যাতায়াত করেন পাঁচ হাজারের বেশি যাত্রী। সরকারের নিয়মে এ ঘাটে প্রবেশমূল্য দেয়া আছে তিন টাকা। কিন্তু যাত্রীদের অভিযোগ ঘাটের ইজারাদাররা তাদের কাছ থেকে পাঁচ টাকা আবার কখনও ১০ টাকা করে আদায় করছেন। তার ওপর কোনো টিকিটও দেয়া হয় না। প্রতিবাদ করলে তাদের হাতে হতে হয় হয়রানির শিকার।

লাহারহাট ঘাটে যাত্রীদের হয়রানির বিষয়ে জানতে চাইলে ইজারাদার রাসেল বলেন, সরকারি নিয়ম মেনে টাকা নিচ্ছি। যদিও টিকিটের বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি।

লকডাউনের মধ্যেও স্পিডবোট চলাচল করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি স্পিডবোট ঘাটের বিষয়ে কিছু জানি না। এটা আমি নিয়ন্ত্রণ করি না। আগের ইজারাদাররা স্পিডবোট ঘাট নিয়ন্ত্রণ করেন। তাদের ব্যাপারে আমি কিছুই বলতে পারব না। তারা খুব প্রভাবশালী। আপনি ঘাটে এসে দেখেন। এখানে নৌ-পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের লোক ডিউটিতে রয়েছেন। তবে অসুস্থ রোগীদের সেবার জন্য কয়েকটি স্পিডবোট ভোলা, হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জের উদ্দেশে ছয়-সাতজন করে যাত্রী নিয়ে আমাদের ঘাট থেকে ছেড়ে যায়। সব বোটে রোগী রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতেই রোগীসহ ছয়-সাতজন লোক নিয়ে বোটগুলো ছাড়া হচ্ছে।

স্থানীয় শরীফ নামে এক বৃদ্ধ বলেন, এ স্পিডবোটে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা হয় না।

স্পিডবোট চলাচলের কারণে করোনাভাইরাস ছড়াচ্ছে বলে ধারণা করছে সচেতন মহল। তাই তারা প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন, লকডাউনের মধ্যে যেন স্পিডবোটগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়।

ভোলাগামী যাত্রীরা বরিশাল থেকে সড়কপথে লাহারহাট গিয়ে ফেরি কিংবা লঞ্চে না উঠে দ্রুত কালাবদর নদী পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছার জন্য স্পিডবোটের যাত্রী হন। যাত্রীপ্রতি ভাড়া ৩০০ টাকা। চার থেকে পাঁচজন ধারণক্ষমতার স্পিডবোটে যাত্রী বহন করা হয় ১০ থেকে ১২ জন। ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ যাত্রী নিয়ে উত্তাল কালাবদর পাড়ি দিতে লক্কড়-ঝক্কড় স্পিডবোট চালানোর জন্য দক্ষ ড্রাইভার নেই। এসব স্পিডবোটের চলাচলের অনুমতি নেই, বৈধ কাগজপত্রও নেই। সরকারি দপ্তরের বিকল ও বাতিল পুরোনো স্পিডবোট নিলামে কিনে জোড়াতালি দিয়ে চলছে এ রমরমা ব্যবসা।

মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটলে তার আপস নিষ্পত্তি হয়ে যায়। এ রুটের স্পিডবোট দুর্ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি মারা গেলেও দোষী কাউকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি।

বরিশাল মেট্রোপলিটন বন্দর থানার ওসি আসাদুজ্জামান বলেন, যদি কেউ সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে স্পিডবোট জরুরি প্রয়োজন ছাড়া চলাচল করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া যদি কেউ স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করে, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। বিষয়টি আমি দেখছি।

এ বিষয়ে বরিশাল সদর নৌ-থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হাসানাতুজ্জামান বলেন, জরুরি সেবা ছাড়া লাহারহাট ঘাট থেকে কোনো স্পিডবোট চলাচল করতে দেয়া হচ্ছে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের বরিশাল দক্ষিণ জোন স্টেশনের কন্টিনজেন্ট কমান্ডার এছাহাক আলী বলেন, লকডাউনে সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে নদীপথে ২৪ ঘণ্টা ডিউটিতে রয়েছেন আমাদের সদস্যরা। আমাদের সদস্যরা ডিউটিতে থাকাকালে ইমারজেন্সি ও রোগী বহন ছাড়া কোন স্পিডবোট চলাচল করতে দেয়া হচ্ছে না। আমাদের অনুপস্থিতিতে দু-একটি স্পিডবোট ছাড়তে পারে। এখন থেকে আমাদের কঠোর নজরদারি থাকবে। কেউ সরকারি আইন অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বরিশাল নদীবন্দর কর্মকর্তা মোস্তফিজুর রহমান জানান, প্রমাণ পেলে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ঘাট বাতিল করা থেকে শুরু করে সব ধরনের যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। লকডাউনের মধ্যেও কীভাবে স্পিডবোট চলছে এ প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..