সম্পাদকীয়

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হোক

আবারও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মিয়ানমার সরকার। গতকাল শেয়ার বিজে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর সোমবার প্রথম টেলিভিশন ভাষণে সামরিক শাসক জেনারেল মিন অং হ্লাইং মিন এ প্রতিশ্রুতি দেন। তবে অতীত সরকারগুলোর মতোই ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করেননি তিনি।

ভাষণে জেনারেল মিন অং হ্লাইং দমন-পীড়নের ভয়ভীতি দেখানোর বদলে ক্ষমতা দখলের কারণ ব্যাখ্যার দিকে মনোযোগী ছিলেন। নাগরিকদের প্রতি ‘আবেগের বশবর্তী না হয়ে সত্য তথ্য-উপাত্ত দেখার আহ্বান’ জানান তিনি। নিজ দেশের নাগরিকরা জেনারেল মিন অংয়ের আহ্বানে কীভাবে সাড়া দেন, সেটি একান্তই দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়। তার ভাষায় ‘সত্যিকারের ও নিয়মতান্ত্রিক গণতন্ত্র’ অর্জিত হবে বলে আমরা আশাবাদী। যেহেতু মিয়ানমার ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে ‘বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের’ ফিরিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তাই আমরা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসনে তার প্রতিশ্রুতির বিষয়ের ওপরই মনোযোগ দেব।

ভাষণে জেনারেল মিন ‘রোহিঙ্গা’ শব্দ উচ্চারণ না করলেও বাস্তুচ্যুত মানুষদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নেবেন, এটি শান্তির বার্তা বলেই আমরা মনে করি। আমরা তাকে বিশ্বাস করতে পারি। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা ইতিবাচক নয়। একথা-সেকথা বলে বরাবরই পাশ কেটে গেছে মিয়ানমারের শাসক কর্তৃপক্ষ। রোহিঙ্গাদের কক্সবাজার ক্যাম্প অথবা ভাসানচরের কথা উল্লেখ না করলেও  বলেছেন, ‘আইডিপি ক্যাম্প থেকে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের কাজও অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা হবে।’ এ বিষয়ে টুইটারেও একটি বার্তা দিয়েছেন তিনি। দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলায় তৃতীয় কোনো পক্ষকে এখানে সম্পৃক্ত করার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিয়ে সরব হওয়া দেশগুলো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবে হয়তো।

উগ্র বৌদ্ধবাদকে ব্যবহার করে দেশটির সেনাবাহিনী বিভিন্নভাবে রোহিঙ্গাদের নিপীড়ন চালিয়েছে, সেটির দায় কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। রোহিঙ্গারা এক দিনে বিশ্বের সবচেয়ে বিপন্ন শরণার্থী জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়নি। আধুনিক সভ্যতায় কোনো জনগোষ্ঠীর মৌলিক  মানবাধিকার যাতে ক্ষুন্ন না হয়, সে জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়কে সচেতন থাকতে হবে। দ্বিপক্ষীয় চুক্তির কথা বলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় যেন কালক্ষেপণ না করা হয়। রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে পুনর্বাসনকে স্বাগত জানালেও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় স্বতঃস্ফূর্ততার গুরুত্ব দিয়েছে ইউএনএইচসিআর। তাই প্রত্যাবাসনেও সংস্থাটি ভূমিকা রাখতে পারে। দ্বিপক্ষীয় চুক্তির কথা বলা হলেও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রচেষ্টা রয়েছে। শরণার্থী সমস্যার সমাধান ও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি তত্ত্বাবধান করছে জাতিসংঘ। দুটি দেশই বিশ্বসংস্থার সদস্য হওয়ায় সংস্থাটি ভূমিকা রাখতে পারে। রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের যুদ্ধাপরাধ তদন্ত করে দেখার জন্য তহবিল বরাদ্দ করেছে জাতিসংঘ। বিপুল ব্যবধানে নিন্দা প্রস্তাব পাস হয়েছে। তাই জাতিসংঘকে এড়িয়ে কোনো প্রত্যাবাসন আদৌ বাস্তবায়ন হবে কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘ প্রথম থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জাতিসংঘে টানা চতুর্থবার বড় ব্যবধানে নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।

নির্বিচারে নির্যাতন, গণহত্যা, জন্মস্থান থেকে বিতাড়নের মাধ্যমে মানবাধিকারের চূড়ান্ত লঙ্ঘন করেছে মিয়ানমার। তা থেকে ফিরে এসে দেশটি মানবতার পক্ষে অবস্থান নেবে। দ্বিপক্ষীয় হোক আর বহুপক্ষীয় হোক, রোহিঙ্গাদের শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসনই মূল বিষয়। এ প্রক্রিয়া শিগগির এগিয়ে নিতে হবে। এ লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হবে বলে প্রত্যাশা।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..