প্রথম পাতা

রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধে অন্তর্বর্তী আদেশ চায় গাম্বিয়া

আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার শুরু

শেয়ার বিজ ডেস্ক: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদিদের ওপর হিটলার যে ধরনের নির্যাতন করেছিল, মিয়ানমার নিপীড়িত জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের ওপর একই ধরনের গণহত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে নির্যাতন চালাচ্ছে বলে অভিহিত করেছে গাম্বিয়ার আইনি দল। নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গতকাল শুনানির শুরুর দিনে গাম্বিয়ার আইনি দল এ অভিযোগ তোলে।

দেশটির সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু মুসলিম জাতিগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা, ধর্ষণসহ ভয়াবহ নিপীড়নের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গত ১১ নভেম্বর মামলাটি দায়ের করে গাম্বিয়া।

এদিন শুনানির শুরুতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো উপস্থাপনের পর গাম্বিয়ার আইনজীবীরা মিয়ানমারে এখনও থাকা ছয় লাখ রোহিঙ্গাকে গণহত্যা থেকে রক্ষা করার জন্য অবিলম্বে আদালতের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

গতকাল বাংলাদেশ সময় বেলা ৩টায় বিচারের শুনানি শুরু হয়েছে। আদালতে ১৫ জন বিচারপতির সঙ্গে যোগ দিয়েছেন দুজন অ্যাডহক বিচারপতি। ওই দুজন গাম্বিয়া ও মিয়ানমারের মনোনীত। আদালতের সিদ্ধান্ত হবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে।

আদালতে অং সান সু চি মিয়ানমারের পক্ষে হাজির হয়েছেন। গাম্বিয়ার পক্ষে আছেন দেশটির আইনমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবেদু। নিয়মানুয়ায়ী শুরুতেই দুই অ্যাডহক বিচারপতি গাম্বিয়ার নাভি পিল্লাই ও মিয়ানমারের প্রফেসর ক্লাউস ক্রেস শপথ নেন।

আন্তর্জাতিক আইনে বিশেষজ্ঞ যুক্তরাজ্যের অধ্যাপক ফিলিপ স্যান্ডসসহ বেশ কয়েকজন বিশ্ব পরিসরে নেতৃস্থানীয় আইনজ্ঞের শুনানিতে অংশ নিচ্ছেন। গতকাল আদালতে গাম্বিয়া তার বক্তব্য উপস্থাপন করে। আজ বুধবার মিয়ানমার তার অবস্থান তুলে ধরবে। এরপর আগামীকাল সকালে গাম্বিয়া এবং বিকালে মিয়ানমার প্রতিপক্ষের যুক্তি খণ্ডন ও চূড়ান্ত বক্তব্য পেশ করবে। মামলার রায় পেতে স্বল্পতম আট সপ্তাহ থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত লাগতে পারে।

আইসিজেতে এই শুনানি উপলক্ষে এবং দ্য হেগ শহরে গাম্বিয়া ও মিয়ানমার ছাড়াও অন্য কয়েকটি দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা হাজির হন। এসব দেশের মধ্যে আছে বাংলাদেশ ও কানাডা। মামলায় গাম্বিয়াকে সমর্থন দিতে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) কূটনীতিকরাও উপস্থিত হয়েছেন। আরও জড়ো হয়েছেন বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী এবং মিয়ানমার সরকারের সমর্থকরা।

মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও স্টেট কাউন্সিলরের সমালোচনা করে বাদীপক্ষের আইনজীবীরা জানান, এসব রোহিঙ্গাকে রক্ষা করার জন্য আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত যদি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ না দেন, তবে এটি প্রমাণিত হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যে কোনো অপরাধকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারে।

এ মামলায় অন্য যে বিষয়গুলোর জন্য গাম্বিয়া অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ চেয়েছে সেগুলো হচ্ছেÑগণহত্যা বন্ধের জন্য মিয়ানমার অবিলম্বে ব্যবস্থা নেবে; সামরিক, আধা সামরিক ও বেসামরিক অস্ত্রধারী ব্যক্তিরা যাতে কোনো ধরনের গণহত্যা সংঘটন না করে তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা; মিয়ানমার যাতে সংঘটিত গণহত্যার কোনো প্রমাণ নষ্ট করতে না পারে, সে বিষয়ে নির্দেশনা এবং বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল ও খারাপ হতে পারেÑএমন ধরনের কাজ থেকে মিয়ানমারের বিরত থাকা।

জাতিসংঘ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের রিপোর্টকে উ™ৃ¬ত করে বাদীপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, রোহিঙ্গা শিশু ও নারীরা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর লক্ষ্য ছিল। এ কারণে দেশটির সেনাবাহিনীকে বিচারের সম্মুখীন করতে হবে।

মিয়ানমার সেনাবাহিনী গণহত্যা চালানোর সময় রোহিঙ্গা শিশুদের আগুনে পুড়িয়ে এবং আছাড় মেরে হত্যা করেছে, যা সুস্পষ্টভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ। তাদের দ্বারা রোহিঙ্গা নারীরা নির্বিচারে ধর্ষণ ও গণধর্ষণেরও শিকার হয়েছে। পুরুষদের নানা ধরনের নিপীড়ন করে হত্যা করা হয়েছে এবং তাদের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে উচ্ছেদ করা হয়েছে। মানবতাবিরোধী এসব অপরাধেও দেশটির সেনাবাহিনীকে বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানান তারা।

এদিন শুনানির শুরুতে গাম্বিয়ার আইনমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবেদ্যু তার বক্তব্যে বলেন, রাখাইনের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত শত শত গ্রামে গণহত্যা চালানো হয়েছে এবং তাদের রক্ষায় মানবজাতি ব্যর্থ হয়েছে। তবে এখনও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিলে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সরকারের হাত থেকে রোহিঙ্গাদের রক্ষা করা সম্ভব।

তিনি বলেন, জাতিসংঘ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন রোহিঙ্গা নির্যাতন নিয়ে দুই বছর ধরে তদন্ত করে এক হাজারের বেশি ক্ষতিগ্রস্তের সাক্ষাৎকার নিয়েছে এবং ফটো ও ভিডিও পর্যালোচনা করেছে।

মিয়ানমার ওই মিশনকে সহযোগিতা না করলেও তারা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, গণহত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নির্যাতন করেছে। দলের অন্য একজন সদস্য এন্ড্র লয়েনস্টেইন বলেন, মিয়ানমার বর্ণবৈষম্যে বিশ্বাস করে এবং তাদের এ ধরনের কাজের হাজার হাজার প্রমাণ আছে। তিনি বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা অধ্যুষিত ৩৯২টি গ্রাম সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে পুড়িয়ে দিয়েছে।

একটি গ্রামের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, মংডুর একটি গ্রাম থেকে পালিয়ে আসা প্রতিটি মানুষের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। তারা জানিয়েছে, শুধু ওই গ্রামেরই ৭৫০ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। অন্য আরেকটি গ্রামে ঢুকে ১০০ জনের মতো হত্যা করা হয়েছে এবং এর মধ্যে প্রায় ৩০ জন ছিল ১৮ বছরের নিচে।

তিনি বলেন, চক্ত নামের একটি গ্রামে ৩৫৮ জনকে হত্যা করা হয় এবং এর মধ্যে ১২৭ জন শিশু এবং মিয়ানমার সরকার এর কোনো কিছুই স্বীকার করে না এবং প্রকাশ্যে সেনাবাহিনীকে প্রশংসা করে থাকে।

দলের আরেক সদস্য আরসালান সুলেমান বলেন, গাম্বিয়া যে অভিযোগ করেছে সেটি পরিষ্কার এবং এ বিষয়ে আদেশ দেওয়ার এখতিয়ার আছে আদালতের। তিনি বলেন, গাম্বিয়া ও মিয়ানমার উভয়ই জেনোসাইড কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে এবং গণহত্যা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখন আদালতকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বাদীপক্ষের আরেক সদস্য পায়াম আকাভান তার বক্তব্যে আদালতকে বলেন, রোহিঙ্গারা জš§ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নির্যাতনের শিকার হয় এবং সামাজিক যোগাযোগ যেমন ফেসবুক ও টুইটারের মাধ্যমে অন্য জাতিগোষ্ঠীগুলোকে দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ঘৃণা বক্তব্য ছড়ানো হয়।

মিয়ানমারের যে গণহত্যার উদ্দেশ্য ছিলÑসেই বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে জাতিসংঘ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন তার রিপোর্টে বলেছে, এর পেছনে সাতটি কারণ আছে। আদালতে সেসব কারণ তুলে ধরেন তিনি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..