প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

র স না লো ভ ন: পুরান ঢাকার বাকরখানি

 

শুধু রসনা বিলাস নয়, খাদ্যগ্রহণকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ভাবনা বরাবরই ছিল, আছে বাঙালির চিন্তা ও রুচিতে। খাবারের পদবৈচিত্র্য তাই এ জনপদজুড়ে। এবার পুরান ঢাকার বাকরখানির কথা জানাচ্ছেন মীর মাইনুল ইসলাম

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবার বাকরখানি। প্রায় আড়াইশ বছরের পুরোনো খাবার এটি। কাপভর্তি চা ও বাকরখানিতে আজও জেগে ওঠে পুরান ঢাকাবাসীর সকাল।

বাকরখানি তৈরির পেছনে রয়েছে এক অমর প্রেমকাহিনি। আগা বাকের নামে তুর্কিস্তানের এক বালক ক্রীতদাস হয়ে এসেছিল ভারতবর্ষে। বাংলার তৎকালীন সুবাদার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ সুদর্শন বালককে কিনেছিলেন। আগা বাকেরের বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ হয়ে নবাব তার পড়ালেখার ব্যবস্থা করেন। আগা বাকের প্রথমে চট্টগ্রামে ফৌজদারের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি বাকলা চন্দ্রদ্বীপের শাসনকর্তা ছিলেন। তার নামানুসারেই বাকেরগঞ্জ জেলার (বর্তমান বরিশাল) নামকরণ হয়। আগা বাকের ভালোবেসেছিলেন সুন্দরী নর্তকী খনি বেগমকে। তার প্রেমের প্রতিদ্বন্দ্ব^ী ছিলেন কোতোয়াল জয়নুল খাঁ। নর্তকীকে ঘিরে আগা বাকের ও জয়নুল খাঁর দ্বন্দ্ব শুরু হয়। নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ এ দ্বন্দ্বের কারণে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে বাকেরকে এক বাঘের খাঁচায় নিক্ষেপ করেন। শক্তিধর বাকের বাঘকে হত্যা করে খাঁচা থেকে বীরের মতো বেরিয়ে আসেন। অন্যদিকে খনি বেগমকে অপহরণ করে দুর্গম চন্দ্রদ্বীপের গহিন বনে পালিয়ে যান জয়নুল খাঁ। আগা বাকের প্রেমিকাকে উদ্ধারের জন্য চন্দ্রদ্বীপে উপস্থিত হলে জয়নুল খাঁ খনি বেগমকে হত্যা করে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

খনি বেগমকে না পেলেও প্রেমের স্মৃতি চিরজাগরূক রাখতে আগা বাকের একধরনের শুকনো রুটি তৈরি করেন। এর নাম রাখেন বাকেরখনি। পুরান ঢাকার প্রখ্যাত লেখক নাজির হোসেনের ‘কিংবদন্তির ঢাকা’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে এ কাহিনি। মানুষের মুখে মুখে একসময় বাকরখানিতে রূপ নেয় বাকেরখনি।

অতীতে ময়দার সঙ্গে দুধের সর ও মাখন মিশিয়ে খামির তৈরি করে বাকরখানি বানানো হতো। সে সময় এটা ছিল নবাব ও আমিরদের প্রিয় খাবার। মালাই-মাখন দিয়ে এখন বাকরখানি তৈরি হয় না। পুরান ঢাকার অনেক বনেদি পরিবার বাড়িতেই বাকরখানি তৈরি করতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে গেলে দুধের মালাইয়ের পরিবর্তে বাকরখানিতে ডালডা ও তেল ব্যবহারের প্রচলন হয়।

বাকরখানি তৈরির জন্য প্রথমে একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় ময়দা, সামান্য পানি ও ডালডার সমন্বয়ে খামির বানানো হয়। খামির থেকে কেটে ছোট ছোট গোলাকার কোয়া তৈরি করা হয়। বেলুন দিয়ে কাঠের পিঁড়িতে কোয়াটি দিয়ে গোলাকার কাঁচা রুটি তৈরি করেন কারিগররা। কাঁচা রুটির মাঝখানে ছুরি দিয়ে লম্বা করে কয়েকটি দাগ কাটা হয়। এর এক পাশে পানির সামান্য প্রলেপ দিয়ে তন্দুরের দেয়ালে আটকে দেওয়া হয়। পাঁচ থেকে সাত মিনিটে তৈরি হয়ে যায় বাকরখানি। এ ছাড়া ঘি দিয়েও বাকরখানি তৈরি করেন অনেকে। লবণ, কাবাব, ছানা, পনির, চিনি, কিমা ও নারিকেলের সংমিশ্রণেও বানানো যায়। তা ছাড়া গরু ও খাসির মাংস দিয়েও একধরনের বাকরখানি তৈরি করা হয়। এ বাকরখানি সাধারণত ঈদের সময় স্পেশাল অর্ডার দিয়ে বানিয়ে নেন অনেকে।

রাজধানীর লালবাগ কেল্লার কাছে প্রথম বাকরখানির দোকান গড়ে উঠেছিল। সেখান থেকে ধীরে ধীরে পুরান ঢাকার চানখাঁরপুল, আগা নবাব দেউড়ি, কোতোয়ালি, চকবাজার, বংশাল, হাজারীবাগ ও সূত্রাপুর এলাকায় বিস্তার লাভ করে। পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের দোকানগুলোর বাকরখানি ধানমন্ডি, উত্তরা, বনানী, গুলশানসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সাধারণ দোকান ও ডিপার্টমেন্ট স্টোরে সরবরাহ করা হয়। চা, গরু, খাসি ও মুরগির মাংস, ক্ষীর কিংবা পায়েসের সঙ্গেও পরিবেশন করা হয় বাকরখানি। বাকরখানি মূলত কেজি দরে বিক্রি হয়। কুয়েত, শ্রীলঙ্কা, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হয় এটি।