দিনের খবর শেষ পাতা

লকডাউনের মধ্যে পোশাক শ্রমিকদের কাজের অভিজ্ঞতা

‘গার্মেন্ট ওয়ার্কার ডায়েরিজ’

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ, আয়, ব্যয়, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও মজুরি ব্যবস্থার ডিজিটাইজেশন নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও মাইক্রোফাইন্যান্স অপরচুনিটিজ (এমএফও) যৌথভাবে ‘গার্মেন্ট ওয়ার্কার ডায়েরিজ’ নামে একটি জরিপ পরিচালনা করেছে। জরিপের মূল লক্ষ্য, নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে তথ্যভিত্তিক নীতি গ্রহণ ও বৈশ্বিক ব্যান্ডগুলোকে শ্রমিকমুখী উদ্যোগ নিতে সহায়তা করা, যা পোশাক শ্রমিকদের জীবনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে স্বচ্ছতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা ও তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের ওপর কভিড-১৯-এর প্রভাব আরও ভালোভাবে বুঝতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহায়তার ক্ষেত্রেও এ জরিপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

জরিপের অধীন সানেম ও এমএফও ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে বাংলাদেশের মূল পাঁচটি শিল্প

এলাকায় (চট্টগ্রাম, ঢাকা শহর, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভার) কর্মরত পোশাক শ্রমিকদের সম্পর্কে প্রতি মাসে তথ্য সংগ্রহ করছে। গত ৬ আগস্ট এক হাজার ২৭৮ শ্রমিকের একটি নির্বাচিত পুলের মধ্যে ফোনে পরিচালিত জরিপের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

জরিপে অংশ নেয়া তিন-চতুর্থাংশের বেশি উত্তরদাতা নারী শ্রমিক, যা সামগ্রিকভাবে এ শিল্পের বাস্তব চিত্রের প্রতিফলন। এ জরিপে পোশাক শ্রমিকদের মাঝে কভিড-১৯-এর কারণে ঘোষিত লকডাউনের প্রভাব এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যতে মজুরি হ্রাস-বৃদ্ধির সম্ভাবনার ব্যাপারে তাদের মনোভাবের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে।

আগস্টের প্রথম সপ্তাহে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য লকডাউন শিথিল করার সিদ্ধান্ত আসার পর পোশাক শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে ফেরার নির্দেশ দেয়া হয়। ৬ আগস্ট পরিচালিত এ জরিপে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের কাছে লকডাউনে কাজে ফেরার নির্দেশের ব্যাপারে তাদের মনোভাব জানতে চাওয়া হয়। ৮৪ শতাংশ উত্তরদাতা জানান, তারা বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি চালু হওয়ার পর প্রথম সপ্তাহে শ্রমিকদের উপস্থিতি স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা কম ছিল। ৮৩ শতাংশ উত্তরদাতা জানান, তারা এর আগের সপ্তাহে কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন।

পুরুষদের তুলনায় নারী শ্রমিকদের উপস্থিতি কিছুটা কম ছিল। প্রথম সপ্তাহে ৮৯ শতাংশ পুরুষ ও ৮১ শতাংশ নারী শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন। কাজে উপস্থিত থাকা ৮৩ শতাংশ উত্তরদাতার মধ্যে ৪৪ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা লকডাউনের মধ্যে কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে অসুবিধা বোধ করেননি। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে কাজে উপস্থিত থাকা পোশাক শ্রমিকদের মধ্যে ৪৫ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের কাজের সময় পরার জন্য মাস্ক দেয়া হয়েছিল। তবে কাজের সময় কারখানায় সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে পেরেছেন কি না, জানতে চাইলে তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক চিত্র পাওয়া যায়। কাজে যোগ দেয়া উত্তরদাতাদের মাঝে ৭৭ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা কাজের সময় কারখানায় সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে পেরেছেন।

মাস্ক পরা ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা বাদে অন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কি না, জানতে চাইলে জরিপে অংশগ্রহণকারী ৪৭ শতাংশ পোশাক শ্রমিক জানান, তাদের কারখানায় কভিড-১৯ সংক্রমণ রোধে অতিরিক্ত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এ ৪৭ শতাংশের মধ্যে ৮৩ শতাংশ মনে করেন, অতিরিক্ত পদক্ষেপগুলো সংক্রমণ রোধে যথেষ্ট ছিল। ৮৭ শতাংশ নারী শ্রমিক ও ৭১ শতাংশ পুরুষ শ্রমিক মনে করেন, কারখানায় নেয়া অতিরিক্ত পদক্ষেপগুলো যথেষ্ট ছিল।

ভবিষ্যতে কী পরিমাণ মজুরি পাবেন বলে ধারণা করেন জানতে চাইলে ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা জানান, তারা প্রায় একই ধরণের মজুরি পাবেন বলে প্রত্যাশা করেন। ১৯ শতাংশ এ ব্যাপারে অনিশ্চিত। ১৬ শতাংশ উত্তরদাতা জানান, তারা স্বাভাবিকের চেয়ে কম মজুরি পাবেন। এক শতাংশ উত্তরদাতা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মজুরি পাওয়ার প্রত্যাশা করেন, যাদের মধ্যে প্রায় সবাই বেশি ওভারটাইম কাজ করেছেন।

তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পোশাক শ্রমিকরা তাদের কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ নিয়ে নিরাপদ বোধ করছেন না এবং কারখানার মালিকরা তাদের উদ্বেগ কমাতে যথেষ্ট ব্যবস্থা নেননি। শ্রমিকদের তাদের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের উদ্বেগ নিরসন ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে পদক্ষেপ নিতে হবে। তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন, রপ্তানি ও সামগ্রিকভাবে পুরো অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কারখানার মালিকপক্ষ, সরকার, নীতিনির্ধারক ও অ্যাডভোকেসি গ্রুপগুলোকে সম্মিলিতভাবে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও জীবনের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..