দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

লকডাউনে শিশুকে ভালো রাখার উপায়

এম জসীম উদ্দিন: ইলা, ইরা ও রায়ীম তিন ভাইবোন। সারা দিন ঘরে থেকে তারা দিন অতিবাহিত করছে। দুষ্টুমি, মারামারি ও খেলাধুলায় তাদের জুড়ি মেলা ভার। ইলা ও ইরা দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আর রায়ীম হেফজ পড়ছে। হেফজ পড়ার কারণে এ বছর লকডাউনে পরিবারের সবার সঙ্গে জামাতে নামাজ পড়ছে। সে ইমামতি করে। ইলা ও ইরা সংসদ টিভিতে অনলাইনে ক্লাস করে। সব মিলিয়ে ভালোই চলছে।

করোনাভাইরাসের আতঙ্কে সমগ্র দেশ যখন গৃহবন্দি, তখন শিশুরা বাধ্য হচ্ছে বাড়িতে থাকতে। কোনো কোনো শিশু ব্যাপারটাকে উপভোগ করছে বাবা-মা-ভাইকে পাশে পাচ্ছে বলে, আবার অনেকে খেলাধুলা করতে পারছে না বলে তাদের কাছে লকডাউন অসহ্য ব্যাপার হয়ে উঠেছে। এ সময় শিশুরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে, বিরক্তি বোধও হতে পারে। অনেকেই হতে পারে আতঙ্কগ্রস্ত। এজন্য এ সময়টাকে শিশুদের বাড়তি যতœ নিতে হবে, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশুদের বিরক্তিবোধ কাটাতে তাদের সঙ্গে সময় অতিবাহিত করুন। ঘরে সীমিতভাবে শিশুদের খেলার বন্দোবস্ত করতে হবে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অভ্যাস করতে হবে। এ সময় করোনাভাইরাস কী, কীভাবে ছড়ায়, কী করতে হবে এ বিষয়গুলো শিশুদের কাছে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। শিশুদের বোঝাতে হবে, কীভাবে এ রোগ থেকে বাঁচা যাবে। তাদের বুঝিয়ে বলুন কেন বাড়িতে থাকা নিরাপদ, বাইরে গেলে কী সমস্যা হতে পারে আর কীভাবেই বা আমরা সতর্ক থাকতে পারি।

শিশুদের বিরক্তিবোধ কাটাতে তাদের সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় কাটানোর পাশাপাশি ঘরেই খেলায় মেতে উঠুন। তাদের বই পড়তে ও পারিবারিক ছোটখাটো কাজ করতে উৎসাহিত করুন। কিছু লিখতে বা কোনো সৃষ্টিশীল কাজে ব্যস্ত রাখুন। এ সময় শিশুরা যেন গেমস খেলার দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে না পড়ে, সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

যেহেতু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, তাই ঘরবন্দি এ শিশুদের মানসিক চাপ কমানোর জন্য বাড়ির পরিবেশকে আনন্দদায়ক করে শিশুদের সক্রিয় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন মনোবিজ্ঞানীরা। আর এ কাজ মা-বাবা ও অভিভাবকদেরই করতে হবে। ঘরবন্দি অসহায় শিশুরা কীভাবে সময় কাটাবে, সে জন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক আফরোজা হোসেন। তিনি বলেন, লকডাউনের সময় বাড়িতেও শিশুকে সক্রিয় রাখতে হবে। যেহেতু মা-বাবা বা অন্য অভিভাবকেরাও এ সময়ে বাসায় বা বাড়িতে আছেন, সুতরাং এ পরিবেশ তারাই তৈরি করবেন। মা-বাবার মানসিক চাপ যেন শিশুদের ওপর না পড়ে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। ছবি আঁকা, গল্পের বই পড়াসহ শিশুরা যে কাজটি করতে ভালোবাসে সেটি করতে দিলে শিশুরা ভালো থাকবে। শিশুর হাতে মোবাইল ফোন না দিয়ে কিছু কাজ বাবা-মা সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে করতে পারেন এবং সন্তানকে সেই কাজের স্বীকৃতি দিতে পারেন। এর মাধ্যমে কোনো কাজই যে ছোট নয়, সেটি উপলব্ধি করতে সহায়তা করা যায়।

করোনাভাইরাসের গণসংক্রমণ ঠেকাতে মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে বন্ধ রয়েছে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ সময় শিক্ষার্থীরা যার যার বাড়িতে, শহরে কিংবা গ্রামে অবস্থান করছে। এ অবস্থায় শিক্ষা কার্যক্রমে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়ায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে অনলাইনে ক্লাস পরিচালনা শুরু করেছে। শিক্ষাবান্ধব প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে ‘আমার ঘরে আমার স্কুল’ প্রোগ্রামের আওতায় সংসদ টেলিভিশনের মাধ্যমে এই অনলাইন ক্লাস সরাসরি পরিচালিত হচ্ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই এখন অনলাইনে চালিয়ে যাচ্ছে নিজেদের শিক্ষা কার্যক্রম, যা দেশব্যাপী সব মহলের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

বেশিরভাগ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের অভিজ্ঞতাটা একেবারেই নতুন। নতুন হলেও এই মাধ্যমটিই এখন একমাত্র ভরসা। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষা কার্যক্রম টেলিভিশনের মাধ্যমে নেওয়া হলেও উচ্চশিক্ষায় দেশের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাস নিচ্ছে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে। ফেসবুক গ্রুপ থেকে শুরু করে গুগল ক্লাসরুম, জুম, ভাইভার, হোয়াটসঅ্যাপ, হ্যাংআউট-সহ নানা অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন শিক্ষকরা।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইনে ক্লাস পরিচালনা করার জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করেছে এবং অনলাইনে শিক্ষাদানের পাশাপাশি করোনা বিস্তার রোধে প্রয়োজনীয় জনসচেতনামূলক কার্যক্রম, যেমন হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরির সহজ পদ্ধতি, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নিরাপত্তার বিষয়ে কীভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখা যায়, সে ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য আহ্বান জানিয়েছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ গবেষণা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ডেটা সেন্টারের স্থাপিত জুম অ্যাপলিকেশন ব্যবহার করার জন্য বলা হয়েছে। এরই মধ্যে এই সফটওয়্যারটির লিংক ও ব্যবহারবিধি সব পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। আগ্রহী শিক্ষকদের অনেকেই এরই মধ্যে এই সফটওয়্যারটি তাদের কম্পিউটারে সংযোজন করেছেন এবং অনেকেই সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া শুরু করেছেন। উল্লেখ্য, প্রায় সবকটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে শতভাগ ক্লাস পরিচালনা করে আসছে এই মহামারি কভিড শুরু হওয়ার পরপরই, অর্থাৎ সরকার ঘোষিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই।

করোনার বিস্তার রোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে মাধ্যমিক ও নিন্ম মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। সংসদ টিভিতে ‘আমার ঘরে আমার স্কুল’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিষয়ভিত্তিক ক্লাস চালু করা হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই ক্লাস করতে পারে এবং পড়াশোনার ধারাবাহিকতা নষ্ট না হয়।

পাঠদানকারী শিক্ষকরা ক্লাস শেষে বাড়ির কাজ দেবেন। প্রতিটি বিষয়ের জন্য শিক্ষার্থীরা আলাদা খাতায় তারিখ অনুযায়ী বাড়ির কাজ সম্পন্ন করবে। এরপর স্কুল খোলার পর সংশ্লিষ্ট শ্রেণিশিক্ষকের কাছে সেই খাতা জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে, যা ধারাবাহিকভাবে মূল্যায়নের অংশ হিসেবে বার্ষিক পরীক্ষায় যোগ হবে। বাসায় অবস্থানকালে শিশুদের এ ক্লাসগুলোতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে তাদের কাছে গৃহবন্দি অবস্থা হতাশায় রূপ নেবে না।

দেশের এ ক্রান্তিকালে শিশুদের অবশ্যই কোয়ালিটি টাইম দিতে হবে, অর্থাৎ আনন্দময় ও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করলে শিশুরা ভালো থাকবে। কোনোভাবেই তাদের হতাশ হতে দেওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে ঘরে সীমিতভাবে শিশুদের খেলাধুলার বন্দোবস্ত করতে হবে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। তাদের সঙ্গে কথা বলুন, তাদের আশ্বস্ত করুন। দেশে এ সংক্রমণ হচ্ছে বলে যে সবারই হবে, তা নয়। তাছাড়া সংক্রমিত বেশিরভাগ রোগীই যে সুস্থ হয়ে ওঠে, তা তাদের জানাতে হবে। এভাবেই লকডাউন চলাকালে শিশুদের হাসিখুশি ও প্রাণবন্ত রাখতে হবে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..