দিনের খবর সারা বাংলা

লকডাউন নয়, কঠোর স্বাস্থ্যবিধি চান নোয়াখালীবাসী

আকাশ মো. জসিম, নোয়াখালী: এক সপ্তাহের সর্বাত্মক লকডাউনের খবরে আবারও নানা শঙ্কায় নোয়াখালীর মধ্য ও নিম্নআয়ের মানুষ। লকডাউনে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াসহ অতীতের দুর্বিষহ পরিস্থিতির কথা মনে করে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন তারা।

গত বছর লকডাউনে ত্রাণসামগ্রী চুরির কথা স্মরণ করে অনেকে বলছেন, দু-একদিন কেউ নামমাত্র ত্রাণ দিয়ে আর হয়তো খোঁজই নেবে না! অতীত ইতিহাস এমন বলে। এ নিয়ে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করা শ্রমিকরা বলছেন, আবারও হয়তো ভোটার আইডি নিয়ে রাস্তায় সাহায্যের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। লকডাউনের খবরে জেলার মধ্যবিত্তদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। আবারও পরিবার-পরিজন নিয়ে ঋণগ্রস্ত কিংবা নিঃস্ব হওয়ার শঙ্কায় রয়েছে তাদের একটি অংশ।

তাই জেলার নানা শ্রেণি-পেশার সাধারণ মানুষ কেউই চাচ্ছে না লকডাউন। বরং স্বাস্থ্যবিধি কড়াকড়ি আরোপ করা, মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা ও স্বাস্থ্যবিধি না মানলে প্রয়োজনে কঠোর শাস্তির দাবি তুলছেন তারা। সমাজ সচেতন নাগরিকদের একটি অংশ দাবি করছেন, লকডাউনের বদলে দেশে সব কর্মকাণ্ড ২৪ ঘণ্টা সার্ভিস দিলে ভালো হবে। প্রয়োজনে কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে বলেও মত প্রকাশ করেছেন তারা। অ্যাডভোকেট জামাল উদ্দিন ভূঁঞা মনে করেন, পরিবহন, চিকিৎসা ও আইনিসেবাসহ হাটবাজার প্রভৃতি ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা উচিত। এতে করে জনসমাগম কম হবে। মানুষের চাপও কম থাকবে। এভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। সাধারণ মানুষও বেঁচে থাকবে। সরকারের ওপর চাপ বাড়বে না। এটি হতে পারে বিভিন্ন রাষ্ট্রের জন্য মডেল।

আইনজীবী ও সমাজকর্মী এবিএম শাহজাহন শাহীন বলেন, যথাযথ, সুষ্ঠু ও সর্বজনগ্রাহ্য পরিকল্পনা ছাড়া এভাবে লকডাউন দিলে তা হবে প্রহসনের লকডাউন। সব কিছুর দাম বাড়বে। গরিবরা পথে বসবে। ব্যবসায়ী শ্যামল কর্মকার বলেন, বাংলাদেশের মতো এত ঘনবসতিপূর্ণ দেশে লকডাউন কার্যকর নয়। লকডাউন দেয়ার পরও একটা বিষয় পরিষ্কার যে, এই এক বছরে কমবেশি অনেকে কভিডে আক্রান্ত হয়েছি। যে ভাইরাসটা এত দ্রুত সারাবিশ্বে ছড়িয়েছে, তা ১৮ কোটির এই দেশে লকডাউন দিয়ে প্রতিরোধ করা অসম্ভব। এটি নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছু নয় বলে মন্তব্য করেন শ্যামল।

বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক আবদুস সাত্তার ফরয়েজী বলেন, এখন আর লকডাউন দিয়ে কী লাভ? সব আচার-অনুষ্ঠান, পরীক্ষা, সভা, সমাবেশ দিয়ে মানুষের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে এখন প্রহসনের লকডাউনের যৌক্তিকতাই বা কী! এতে করে সব কিছুর দাম বাড়বে। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত বাঁশ খাবে। এমনিতে চিকিৎসা খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছে, এখন খাদ্যপণ্য কিনতে গেলে হাবুডুবু খাবে।

সুবর্ণচরের আনোয়ার হোসেন বলেন, বড়লোক ভয় পান করোনা। আর গরিব ভয় পান লকডাউন। তাই লকডাউন কোনো সমাধান হতে পারে না। করোনায় বাঁচতে হবে ও বাঁচাতেও হবে। লকডাউনের বদলে দেশের সব কর্মকাণ্ড ২৪ ঘণ্টা সার্ভিস দিলে ভালো হয়।

সোনাপুর গ্রামের শিফিকা আক্তার চন্দন বলেন, সরকার লকডাউন না দিয়ে সেনাবাহিনী নামিয়ে স্বাস্থ্যবিধির নজরদারি করতে পারত।

জেলার নানা শ্রেণির মানুষ একই কথা বলেছেন, গত বছর লকডাউন দিয়ে সংক্রমণ থামানো তো যায়নি, উল্টো অনেক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। সে সময় অনেকে বেকার হন। তাদের মতে, সংক্রমণ ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি কড়াকড়ি করা ও মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা। স্বাস্থ্যবিধি না মানলে প্রয়োজনে কঠোর শাস্তি দেয়া হোক, তবে লকডাউন একেবারে নয়। স্বাস্থ্যবিধির ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেই সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব, লকডাউন দিয়ে নয়।

তাই সব অফিস-আদালত, কল-কারখানা ও পাবলিক সার্ভিস খোলা রেখে স্বাস্থ্যবিধির ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন। উপরন্তু যে সিন্ডিকেট নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে আগে তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নিয়ে দাম কমানো উচিত বলে মনে করেন অনেকে।

কভিডের হঠাৎ এমন ঊর্ধ্বগতির জন্য সমাজের সবাই কমবেশি দায়ী। চলতি বছর যত সভা-সমাবেশ, মিছিল, বিক্ষোভ, হরতাল হয়েছে তা গত এক বছরেও হয়নি। আর এর নেপথ্যে রয়েছে রাজনীতিক ও সুশীল সমাজের কিছু লোক। তারা জানতো এমন কিছু একটা হতে পারে, কিন্তু তারা তাদের ক্ষমতা দেখানোর জন্যই এমন কিছু করছে বলে মনে করেন কেউ কেউ।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..