মত-বিশ্লেষণ

লকডাউন যেন নীরব দুর্ভিক্ষ ডেকে না আনে

পাঠকের লেখা

নভেল করোনাভাইরাসজনিত রোগ কভিড ও লকডাউন। এ দুটি শব্দ যেন পরস্পরের পরিপূরক। আবার আতঙ্কের নামও বটে। করোনাভাইরাস বিশ্বজুডে সংক্রমিত করেছিল। মাঝে কিছুটা নিয়ন্ত্রিত ছিল কিন্তু সম্প্রতি সময়ে আবারও সংক্রমণ বেড়ে চলছে। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। সংক্রমণের কমতি নেই আমাদের দেশেও। আর এই সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য সরকার লকডাউনের ঘোষণা দিয়েছে; যা এখনও চলমান। কিন্তু এই লকডাউন সংক্রমণ ঠেকাতে কতটুকু কার্যকর হবে সেটি নিয়েও প্রশ্ন। লকডাউন দিলেও তা পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়ন হয় না। আমাদের দেশে এ পদ্ধতি বা কৌশল সফল হওয়া অসম্ভব। সফল না হওয়ার পেছনে কিছু আর্থসামাজিক বাস্তবতা রয়েছে। এদেশের অধিকাংশ মানুষ নি¤œমধ্যবিত্ত পরিবারের। এসব পরিবারের মানুষগুলো দিন আনে দিন খায়। এছাড়া করোনাকালে অনেকেই চাকরিচ্যুত বা কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। এমন মানুষের সংখ্যা বলতে গেলে প্রায় পাঁচ কোটির মতো। এর মধ্যে লকডাউন দিলে এদের প্রায় সবাই জীবিকা উপার্জনের থেকে বঞ্চিত হতে হয়। তাই যেকোনোভাবে পরিবারের ভরণ-পোষণ করার জন্য অন্য পন্থায় লিপ্ত হতে বাধ্য হয়। সে কারণে লকডাউন করে তাদের ঘরে রাখা অসম্ভব হয়ে ওঠে। এই লকডাউনের কারণে সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করতে হচ্ছে। লকডাউনে জরুরি সেবা ছাড়া সবকিছুই বন্ধ থাকবে। যার পরিপ্রেক্ষিতে দৈনন্দিন উপার্জন করা মানুষগুলো দুঃখকষ্টে জীবনযাপন করবে। এদের মধ্যে অনেকেই আছে যারা বিভিন্ন উপায়ে আয়-উপার্জন করে পরিবারের ভরণ-পোষণ করার জন্য। তাদের মধ্যে এক শ্রেণির লোক আছে যারা কিনা বাস, রিকশা, সিএনজি চালিয়ে এবং মোটরসাইকেল বা পাঠাও-রাইড শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে তাদের পরিবারের ভরণ-পোষণ করার জন্য আয়ের উৎস হিসেবে বেছে নিয়েছে। কিন্তু লকডাউনের পরিস্থিতিতে আয়-উপার্জন থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। যার ফলে তারা পরিবারের ভরণ-পোষণ করতে হিমশিম খাচ্ছে। তাদের অনেকেরই পরিবারের সদস্য বৃদ্ধ লোক এবং শিশু রয়েছে। যারা কিনা অধিকাংশই অসুস্থ। বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে খুবই দুর্দশা পোহাতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি সত্যিই তাদের জন্য খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। আবার অনেকেই আত্মহত্যার মতো নিকৃষ্ট কাজ করার চেষ্টা করেছেন শুধু পরিবারের ভরণ-পোষণ করতে না পারায়। করোনার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে খোলার আশ্বাস দিলেও পালাক্রমে পিছিয়ে দেয়া হচ্ছে। ঈদের পরও যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে সেটা নিয়েও কিন্তু অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এই করোনার কারণে কর্মহীন পড়েছে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। এদের মধ্যে যারা ব্যক্তি কেন্দ্রিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তাদের পরিবারে চলছে নীরব দুর্ভিক্ষ। কারণ তাদের বেতন নেই, আয়-উপার্জন নেই। মূলত শিক্ষার্থীদের বেতনের টাকায় তাদের পরিবারের ভরণ-পোষণ চলে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বিভিন্ন কোচিং সেন্টার বা প্রাইভেট টিউশনের মাধ্যমে উপার্জন করতেন। সেটাও কিন্তু বন্ধ রয়েছে। যার ফলে চরম বিপাকে পড়ছেন তারা। একদিকে যেমন লোকলজ্জার ভয়ে কাউকে কিছু বলতে পারে না, অন্যদিকে দুর্ভিক্ষের মধ্য দিয়ে চলছে তাদের জীবনযাত্রা। অসচ্ছল পরিবারের এসব শিক্ষকের সহায়তায় কেউ এগিয়ে আসে না। যদিওবা আসে তবে সেটা খুব নগণ্য। শুধু লকডাউনের কারণে যে এমন পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ তা কিন্তু নয়। বরং অন্যদিকে বাজারে অনিয়ন্ত্রিত নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি। যার পরিপ্রেক্ষিতে এসব মানুষগুলো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করতে হিমশিম খাচ্ছে। হয়তো আমাদের অধিকাংশ মানুষের সামর্থ্য আছে বলে ক্রয় করতে পারছি। কিন্তু যাদের সামর্থ্য নেই তাদের কী হবে? তাদের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এসব বিষয়গুলো কি কখনও আমরা ভেবেছি? মুখে আমরা যতই বলি দেশ উন্নত হচ্ছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আসলে কি দেশ উন্নত হচ্ছে? শুধু যাতায়াত ব্যবস্থা বা আনুষঙ্গিক যেসব বিষয় রয়েছে, সেগুলো উন্নত সাধন করলেই কেবল উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে ওঠা যাবে না। বরং সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যা যা প্রয়োজনীয়। সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল দেশ উন্নত হিসেবে বিবেচিত হবে। অন্যথায় মুখে যতই বলি দেশ উন্নত হচ্ছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দেশ উন্নত নয়। তাই তাদের বেঁচে থাকার জন্য যা যা প্রয়োজন সেগুলো নিশ্চিত করতে হবে। পরিশেষে বলতে চাই, লকডাউন  দেশব্যাপী না দিয়ে যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি সে এলাকাগুলো চিহ্নিত করে লকডাউন ঘোষণা দেয়া যেতে পারে। ফলে সাধারণ মানুষের কিছুটা হলেও দুর্ভোগ কমবে। লকডাউনের সময়ে সাধারণ মানুষের দুর্যোগ মোকাবিলা করার জন্য সরকার কেন্দ্রীয় উদ্যোগ নিয়ে একটি তহবিল গঠন করতে পারে। কারণ ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় পুরো বিষয়টি দেখতে সক্ষম হবে না। আর এটা তাদের একার পক্ষে সম্ভবও নয়। কারণ আমাদের দেশে জনসংখ্যা অনেক বেশি। তাই এই তহবিলে শুধু সরকার নয়, দেশের বিত্তবানদেরও অংশ নেয়া উচিত। এই কাজে বিভিন্ন পর্যায়ের প্রশাসক ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করতে হবে। কেননা জনপ্রতিনিধিদের মনে রাখতে হবে মানুষের জন্য এখন তাদের কাজ করার সময় এসেছে। যদিও সাম্প্রতিকালে লকডাউন যাতে কার্যকর করা যায় সেজন্য হতদরিদ্র, খেটে খাওয়া মানুষদের খাদ্য সহায়তা দেয়ার জন্য ইতোমধ্যে দেশের সব ইউনিয়ন ও উপজেলায় সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। এই বরাদ্দকৃত টাকাগুলো সাধারণ মানুষের কাছে সুষম বণ্টন করতে পারলে তাদের জীবনযাত্রার মান কিছুটা স্বাভাবিক থাকবে। আর বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। কারণ অনিয়ন্ত্রিত দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে জনগণের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সচেতনতা অবলম্বন করে চলাচল করতে হবে আমাদের। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সচেতনতার বিকল্প কিছু নেই। সুতরাং প্রত্যাশা রাখি পৃথিবী আগের রূপে ফিরে পাওয়ার এবং এই লকডাউনে সাধারণ মানুষগুলো সুস্থ ও সুন্দরভাবে জীবনযাপন করার।

মু. সায়েম আহমাদ

শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

ঢাকা কলেজ, ঢাকা

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..