মত-বিশ্লেষণ

লগ্নিকারীদের আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হুমকি

নিকোলাস স্পাইরো:ইউরোপ ও আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের ঐক্য ভেঙে পড়েছে। আর্থিক নীতিতে শিথিলতা আনার প্রয়োজনে তারা বিভিন্ন উপায় ভেবে দেখছেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, নিজেদের পরিচয়ধারী অর্থনীতিকে উন্নীত করার সক্ষমতাও এখন তারা হারিয়ে ফেলেছেন। এই দশা সৃষ্টি হয়েছে খুব আকস্মিকভাবে। ফলে চলমান নীতিমালা এখানে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হচ্ছে।

খুব বেশি আগে নয়, একটি সময় ছিল যখন বিনিয়োগকারী ও ব্যাবসায়ীরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের বিশ্ব অর্থনীতির কারিগর হিসেবে বিবেচনা করতেন। তারা বিশ্বমন্দার সময়ে সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক আর্থিক সংকট উদ্ধার করেছিলেন। এখানেই শেষ নয়, তারা সে সময়ে ব্যাংকঋণ দেওয়ার জন্য ব্যাংকগুলোর সক্ষমতাও বাড়িয়েছিলেন। তাছাড়া সারা পৃথিবীতে তারা সস্তা অর্থের বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন। বলা চলে সে সময় তারা সম্পদের মূল্য পুনরানয়নের ক্ষেত্রে একটি নাটকীয় ও টেকসই পরিবর্তন আনতে সক্ষম হন। এই কৃতিত্ব তাদের দিতে হয়।

তবুও দু’বছর ধরে বিনিয়োগকারীরা তাদের আত্মবিশ্বাস হারিয়ে হতাশা বা আতঙ্কের মধ্যে পড়ে গেছেন। তারা কোনোভাবেই এখন আর প্রধান প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য ভূমিকা রাখতে পারছেন না। এমনকি তার বাজারমূল্যকে চাহিদা মোতাবেক বাড়িয়ে তোলার সার্বিক সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছেন। অন্তত এই জায়গাতে এসে ব্যাংকাররা কোনো সমাধান দিতে পারছেন না। এমনকি তারা নিজেরাই এই সমস্যার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

এই তো কয়েক দিন আগের কথা, ব্যাংক অব ইন্টারন্যাশনাল সেটলমেন্টস একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, অতিশিথিল আর্থিক নীতির একটি দশক কীভাবে মন্দ প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। এখানে অপর্যাপ্ত তারল্যের কথা এসেছে এবং বাজারের বিকৃত দশাও উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থভাণ্ডারের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতার তীব্রতা স্পষ্ট হয়েছে। তাছাড়া ব্যাংকগুলোর মুনাফাসীমা এখানে কর্তিত হচ্ছে নিচু বা নেতিবাচক সুদের হার ও হঠকারী ঝুঁকি গ্রহণের কারণে। আর্থিক শক্তি আনয়নের ক্ষেত্রে কোথাও কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে নাÑবিষয়টি ইউরো জোনের চেয়ে বেশি মারাত্মক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় যেখানে সরাকারি বন্ডের প্রায় ৭০ শতাংশ এখন ঋণাত্মক পর্যায়ে ব্যবসা করছে। অথচ এর মাত্রা বছরের শুরুর দিকে ছিল মাত্র ৪০ শতাংশ। ট্রেডওয়েব থেকে এ উপাত্ত পাওয়া যায়।

ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক বোর্ডের জার্মান প্রতিনিধি গত মাসে পদত্যাগ করেছেন ঠিক তখনই যখন ইনস্টিটিউট থেকে বন্ড কেনা কর্মসূচিকে আবার চালু করা হলো। এর সঞ্চয় হার ঋণাত্মক পর্যায়ে আরও গভীরে নেমে যায়। গত সপ্তাহে ইসিবি’র এক সাবেক জ্যেষ্ঠ নীতিনির্ধারক এই ইনস্টিডউটের ওপর কঠোর আক্রমণ চালিয়েছেন।

অর্থ কাঠামোকে আরও বেশি শক্তিশালী করার পেছনে তারা যে প্রশ্নগুলো করেছেন, সেগুলো যৌক্তিক। তাছাড়া কয়েক বছরের সংখ্যাগত স্বাচ্ছন্দ্যের পর ইসিবির অব্যাহত সিকিউরিটি কিনেছেন। তাতে অবশ্য প্রবৃদ্ধিতে খুব সামান্যই প্রভাব পড়ে। সমালোচকেরা এখন ইসিবিকেই দায়ী করছেন। তারা বলছেন, ইসিবি সিকিউরিটির স্বাধীনতার সঙ্গে আপস করেছে এবং দেখে মনে হচ্ছে, সুদের হারের উত্থানে ঋণগ্রস্ত সরকারকে দৃঢ়তার সঙ্গে সুরক্ষা দিতে তারা কাজ করে যাচ্ছে। উপরন্তু বাজার মূল্যায়নে এসেছে মরণান্তিক বার্তা।

ইউরো জোনে বন্ড বিনিয়োগকারীরা স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনতে দাম আরও বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এর অন্যতম কারণ হলো জার্মানির ১০ বছরের বেঞ্চমার্ক বন্ড। এটা ঋণাত্মকতার বিচারে পশ্চাৎপদ। অবস্থাটি গত মার্চ মাসের। আর সে সময় থেকেই এটা আরও ৫৫ পয়েন্টে পিছিয়ে রয়েছে। তবে তারা বিশ্বাস করতে চান না যে, বিভিন্ন মানদণ্ডে এটা কার্যকর প্রমাণিত হবে।

পাঁচ বছরের মুদ্রাস্ফীতি প্রত্যাশার হিসাব-নিকাশ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে বেঞ্চমার্ক বন্ডকে একটি খাড়া পতনের উৎকৃষ্ট নজির বলা হয়েছে। এখানে পাঁচ বছরের ব্রেক-ইভেন চলমান ছিল। এটা ইউরো জোনের মধ্যে আজ থেকে পেছনের দিকে পাঁচ বছর ধরে মুদ্রাস্ফীতির সমর্থক বলে বিবেচিত হয়েছে। এখানে ১.১ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি লক্ষ করা যায়। এটাকে সব সময়ের জন্য নিচু বলতে হবে এবং খসড়া হিসেবেও বেঞ্চমার্ক বন্ড ইসিবির লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক ধরা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল রিজার্ভ একটি নির্দিষ্ট হারের কর্তনে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। কেননা, অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে এখনও একটি ভালো কাঠামোর মধ্যে রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নীতিকে ক্রমবর্ধমান হারে রাজনীতিকরণ করা হচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেডারেলদের বিরুদ্ধে এক টুইটে তর্জন-গর্জন করেছেন। তিনি সেন্ট্রাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান জেরম পাওয়েলের বিরুদ্ধে যারপরনাই আক্রমণ করেছেন এবং পাওয়ালকে নিজের শত্রু বলে বিবেচনা করেছেন। আরও বাড়িয়ে বলা যায়, তিনি সেন্ট্রাল ব্যাংকের এই চেয়ারম্যানকে আমেরিকারই শত্রু বলে আখ্যা দিয়েছেন। কেননা ফেডারেলরা তার ‘ইজ পলিসি’কে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ফলে এ উভয় সংকট নীতিনির্ধারকদের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভোগান্তিটা বেশ প্রকট রূপ নেয়। বিশেষ করে তারা যখন বাণিজ্যযুদ্ধকে ঘিরে নানারকম অনিশ্চয়তায় প্রায় সামগ্রিক ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করে।

দ্বন্দ্ব-বিদ্বেষ যখন প্রাণরস চুষে খাওয়ার গতি বাড়িয়ে তুলছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি যত দূর পর্যন্ত সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে, ততদূর পর্যন্তই তারা ফেডারেলের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে।

২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের সময় থেকে বিনিয়োগী চেতনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পালাবদল হলো আর্থিক শক্তি বাড়িয়ে তোলার আকাক্সক্ষা। তবে এটা আর কোনোভাবেই পুঁজিবাজারকে টেনেহিঁচড়ে ওপরে তুলতে সক্ষম হচ্ছে না।

ছয় মাস আগেও যা দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়েও আমরা তা দেখেছি, বর্তমানেও আমরা এটা এসএন্ডপি ৫০০ সূচকে বাড়তে দেখছি। এটা মূলত কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক উপাত্তের চেয়ে দুর্বল অর্থনৈতিক উপাত্ত প্রকাশ হয়ে যাওয়ার প্রতিক্রিয়া। ফলে ফেডারেল কর্তন হারকে যেখানে পৌঁছে দেয়, সম্ভবত সেখানেই এটা মিলিত হয়। এখন দুর্বল উপাত্তগুলো পুঁজির পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একইভাবে বিনিয়োগকারীরা ভয় পাচ্ছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি নিশ্চয় বিশ্বমন্দার সামনে নেতিয়ে পড়বে।

এটাকে সাধারণ অবস্থায় স্থির রাখতে হলে, খারাপ সংবাদগুলোকে ভালো সংবাদ বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। তবে বিনিয়োগকারীরা সে সময় থলের বিড়াল বের করে দেন। তারা খারাপ সংবাদকে খারাপ সংবাদ বলেই প্রকাশ করতে থাকেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে মন্দার ভয় এখন সংরক্ষণশীল আর্থিক নীতিকে আচ্ছন্ন করে নিয়েছে।

প্রধান প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক নীতিতে বিনিয়োগকারীরা আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলায় বাজার শক্তিশালী করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ছে। এই শক্তিশালীকরণ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে অর্থনীতি ও মুদ্রাস্ফীতির কাক্সিক্ষত কৌশলে প্রভাব পড়ে। 

আরেকটি ভুল কথা হলো, বিনিয়োগকারীরা অপরিহার্য জীবনীশক্তি বা জ্বালানি সরবরাহ না করেই বাজার ত্যাগ করেছেন। একই সঙ্গে আর্থিক অবিশ্বাসও জেগে উঠছে নতুন করে। ফলে বিনিয়োগকারীরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়-আশয়  নিয়ে অনেক বেশি স্পর্শকাতর আচরণ করছে। এই চিত্র অগ্রগামী অর্থনীতি ও বিকাশমান অর্থনীতিÑউভয় পরিসরেই দৃশ্যমান।

বাজারের আকাক্সক্ষা হলো রাজকোষের আর্থিক নীতিকে গ্রাস করে নেওয়া। আর এটাই হলো শক্তি আনয়নের প্রধান সূত্র। এখানে সংযোজিত হার কর্তন বা সংখ্যাতাত্ত্বিক স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে বেশি অর্থমূল্য প্রস্তাব করা হয়। তবে যেসব প্রধান অর্থনীতিতে তুলনামূলকভাবে ঋণের বোঝা কম রয়েছে এবং রাজকোষ নীতিতেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শিথিলতা, সেসব পরিকাঠামোই এখানে আশা করা হয়। এক্ষেত্রে জার্মানির উদাহরণ টানা যায়। তবে তারা তাদের পয়সাভর্তি গাঁটের রশি ঢিল করতে চাইছে না। তবে আর্থিক শক্তিমত্তা বাজারে একটি গালাগালিতে পরিণত হতে পারে। কিন্তু রাজকোষের শক্তিমত্তা জার্র্মানির ইতিহাসে বড় কলঙ্কের বিষয়। 

পার্টনার, লওরেসা অ্যাডভাইজরি (লন্ডন-ভিত্তিক আবাসন ও ব্যষ্টিক অর্থনীতির পরামর্শক প্রতিষ্ঠান)

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট থেকে

ভাষান্তর: মিজানুর রহমান শেলী

সর্বশেষ..