মত-বিশ্লেষণ

লতিফুর রহমান: নৈতিক ও দেশপ্রেমিক ব্যবসায়ীর উদাহরণ

ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান আইসিসি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠালগ্নের সদস্য ছিলেন এবং তার জীবদ্দশায় শেষদিন পর্যন্ত ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের সহসভাপতি ও বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারের সহসভাপতি ছিলেন। এছাড়া তিনি দুই দফায় ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্যারিসভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল চেম্বারের নির্বাহী বোর্ডের সদস্য ছিলেন। আইসিসি বাংলাদেশের সূচনালগ্ন থেকে তার সহযোগিতা, অবদান, পরামর্শ ও সক্রিয় অংশগ্রহণ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণীয় থাকবে।

ট্রান্সকম গ্রুপের শুরু হয়েছিল পারিবারিক চা বাগানকে কেন্দ্র করে এবং প্রায় ৪৭ বছর ধরে এটি বাংলাদেশের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল ও বৈচিত্র্যময় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। লতিফুর রহমান ১৯৬৬ সালে তার পারিবারিক মালিকানাধীন ডব্লিউ রহমান জুট মিলসে প্রশিক্ষণার্থী হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন এবং ১৯৭১ সাল পর্যন্ত নির্বাহী ছিলেন, তিনি ১৯৭৩ সালে ট্রান্সকম গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ধীরে ধীরে তিনি তার বিভিন্ন উদ্যোগে দক্ষতা ছড়িয়েছেন। তিনি তার ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠান বৈচিত্র্যময় করেছেন। লতিফুর রহমান করপোরেট সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি গত শতকের আশির দশকে দুটি বড় বহুজাতিক কোম্পানি এসকায়েফ ও ফিলিপসকে বাংলাদেশে পরিচালনার দায়িত্ব পান এবং তিনি পুরোনো পরিচালনা পর্ষদ অক্ষত রেখেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন পেশাদার ম্যানেজমেন্ট যা করতে পারে বা করার কথা, তা-ই করা উচিত।

বর্তমানে ট্রান্সকমের মেডিসিন, খাবার, লাইটিং, ইলেকট্রনিকস, মিডিয়াসহ ১৬টি অপারেশনাল সত্তা রয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পিজা হাট, কেএফসি, পেপসিকো ও ফিলিপসের স্থানীয় ব্যবসায়িক অংশীদার। ট্রান্সকমের মোট লোকবল ১৭ হাজার এবং গ্রুপের বার্ষিক টার্নওভার ৮০ হাজার মিলিয়ন টাকা।

কভিড-১৯-এর কারণে ট্রান্সকম গ্রুপের ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও গ্রুপ থেকে কোনো কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়নি, কারণ গ্রুপ বিশ্বাস করে সব কর্মচারীই বড় পরিবারের একটা অংশ।

সততা ও বিশুদ্ধতার জন্য লতিফুর রহমানের খ্যাতি অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল এবং ব্যবসায়ের সর্বোচ্চ নৈতিক মান ধরে রাখার জন্য সর্বজনীনভাবে তাকে সম্মান করা হতো। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে যারা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রযাত্রায় অবদান রেখেছেন, তাদের মধ্যে লতিফুর রহমান ছিলেন অন্যতম। তিনি দেখিয়েছিলেন উচ্চ নৈতিক মান বজায় রেখেও ব্যবসা করে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। 

লতিফুর রহমানের বড় মেয়ে ট্রান্সকম ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের এমডি ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমান বলেন, তার বাবা ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের মানুষ। সিমিন রহমান বলেন, ‘যখন প্রথম আমরা কাজে যোগদান করি তখন তিনি আমাদের খুব স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, আমরা চেয়ারম্যানের সন্তান হওয়ায় কারণে কোনো বাড়তি সুবিধা প্রতিষ্ঠান থেকে পাব না; আমরা বেতনভুক্ত থাকব এবং সবার জন্য প্রতিষ্ঠানের যে বিধি-বিধান আছে, আমাদের জন্যও তা-ই প্রযোজ্য হবে। কেবল তখনই আমরা পুরস্কৃত হব, যদি তা পাওয়ার যোগ্য হই।’

তিনি বিশ্বাস করতেন এবং আদর্শে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন যে, গণতন্ত্রের জন্য মুক্ত ও স্বাধীন সংবাদপত্র প্রয়োজন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো পত্রিকা দুটো সৃষ্টি হয়, দুটো পত্রিকাই সার্বিকভাবে দেশের সর্বাধিক স্বতন্ত্র সংবাদপত্র হিসেবে স্বীকৃত। তিনি নীতি, আদর্শ ও বিশুদ্ধতায় আপসহীন ছিলেন, এমনকি তার নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলেও। তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি ও বাংলা দৈনিকের মালিক হওয়ায় বহুবার হয়রানির শিকার হন; কিন্তু তিনি পত্রিকার সম্পাদকদের কখনও কোনো ধরনের চাপ দেননি।

দেশের অন্য শিল্পপতিদের মতো লতিফুর রহমানও বিশ্বাস করতেন, সব শিল্পের শ্রমিক ইউনিয়ন থাকা উচিত। তিনি মনে করতেন, প্রতিটি শিল্পের একটি নির্বাচিত সিবিএ থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

নৈতিক ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে অসামান্য সাফল্যের জন্য তিনি ২০১২ সালে অসলো বিজনেস ফর পিস ফাউন্ডেশন দ্বারা ‘অসলো বিজনেস ফর পিস’ অ্যাওয়ার্ড পান। তিনি ২০০১ সালে আমেরিকান চেম্বার কর্তৃক বিজনেস এক্সিকিউটিভ অ্যাওয়ার্ড পান; ২০১২ সালে ডেইলি  স্টার-ডিএইচ এল কর্তৃক বিশেষ অ্যাওয়ার্ড পান; ২০১৭ সালে সার্ক আউটস্ট্যান্ডিং লিডার অ্যাওয়ার্ড এবং যুক্তরাজ্য বাংলাদেশ ক্যাটালিস্টস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি কর্তৃক লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড পান।

লতিফুর রহমান বিশ্বাস করতেন, পরের দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং বাংলাদেশি সংস্থাগুলো কেবল দেশে নয়, এর বাইরেও ভূমিকা পালন করবে। কেবল আমাদের একত্র হতে হবে এবং আমাদের পরিচালনার অনুশীলনগুলো ঠিকঠাক করতে হবেÑএটা ছিল তার দৃষ্টিভঙ্গি।

আইসিসি ত্রৈমাসিক বুলেটিনের সম্পাদকীয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..