মত-বিশ্লেষণ

লবণ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ

 

এএইচএম মাসুম বিল্লাহ: লবণ উৎপাদনে দেশের লবণচাষিরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছেন। লবণচাষিরা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অধিক লবণ উৎপাদনে সক্ষম হয়েছেন। লবণ উৎপাদন বৃদ্ধির আরও সম্ভাবনা আমাদের রয়েছে। এ লক্ষ্যে দেশের সব লবণচাষির কাছে আধুনিক লবণচাষ পদ্ধতি পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন পদ্ধতিতে সমপরিমাণ জমি ব্যবহার করে দ্বিগুণ পরিমাণ লবণ উৎপাদন সম্ভব হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এতে দেশে লবণের চাহিদা মিটিয়ে প্রচুর পরিমাণে লবণ বিদেশেও রফতানি করার সম্ভাবনার নতুন দ্বার উšে§াচিত হবে। সেই সঙ্গে দেশের প্রান্তিক লবণচাষিদের আগামী পাঁচ বছর বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া হবে। এজন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দফতরের সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে লবণ আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
শ্রমনিবিড় লবণশিল্প আমাদের অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় খাত। লবণ উৎপাদন থেকে মিল পর্যায়ে প্যাকেটজাত হওয়া পর্যন্ত এই শিল্পের সঙ্গে প্রায় পাঁচ লাখ লোক জড়িত এবং প্রায় ২৫ লাখ লোক নির্ভরশীল। জাতীয় অর্থনীতিতে এ শিল্প প্রতিবছর ১২০০-১৫০০ কোটি টাকার অবদান রাখে, যা ফিনিশড গুডস হিসেবে প্রক্রিয়াজাত হয়ে ৩০০০-৩৫০০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। খাবারের অনুষঙ্গ হিসেবে ছাড়াও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পসহ অন্যান্য শিল্প-কারখানায় প্রচুর পরিমাণে লবণ ব্যবহƒত হয়। তাই অন্যান্য দেশীয় শিল্পের ন্যায় লবণ শিল্পকেও সুরক্ষা দিতে সরকার তৎপর রয়েছে। লবণচাষিদের রক্ষা করা হলে লবণ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে, ধানের মতো লবণচাষিদের কাছ থেকে সরকার কর্তৃক সরাসরি লবণ ক্রয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে লবণচাষিরা বিশেষভাবে উপকৃত হবেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
তবে দেশে লবণের উৎপাদন বাড়াতে লবণচাষিদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করাও একান্ত প্রয়োজন। এজন্য লবণ চাষবিষয়ক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ল্যাবরেটরি স্থাপন করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের লবণ উৎপাদন কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলাকেন্দ্রিক। কক্সবাজার জেলার কক্সবাজার সদর, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, চকরিয়া, পেকুয়া, রামু ও টেকনাফ উপজেলা এবং চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী ও আনোয়ারা উপজেলায় লবণ চাষ করা হয়। লবণ চাষ একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমিত থাকায় যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সব লবণচাষির দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ল্যাবরেটরি স্থাপনের মাধ্যমে লবণের মান বজায় রাখা সহজেই সম্ভব হবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক) ষাটের দশক থেকে লবণ উৎপাদনে চাষিদের সহায়তা দিয়ে আসছে। লবণচাষিদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সরকারের সার্বিক সহায়তায় লবণ উৎপাদনে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। ২০১৮-১৯ মৌসুমে ৪০ হাজার লবণচাষি ৬০ হাজার ৫৯৬ একর জমিতে লবণ উৎপাদন করেন। লবণ চাষের মৌসুমের ব্যাপ্তিকাল ১৫ নভেম্বর থেকে ১৫ মে পর্যন্ত। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে লবণের চাহিদা ছিল ১৬ দশমিক ৫৭ লাখ টন এবং লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮ লাখ টন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি রেকর্ড পরিমাণ লবণ উৎপাদন হয়েছে ১৮ দশমিক ২৪ লাখ টন। এছাড়া গত বছরের উদ্বৃত্ত রয়েছে এক দশমিক ৬০ লাখ টন লবণ। মোট ১৯ দশমিক ২৪ লাখ টন লবণ বর্তমানে চাষি, লবণ মিল, পরিবহন চ্যানেল এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে রয়েছে। অর্থাৎ দেশের লবণের কোনো ঘাটতি বা সংকট নেই এবং ঈদুল আজহায় চামড়াশিল্পসহ সারা বছর লবণ ব্যবহারের পরও দেশে লবণ উদ্বৃত্ত থাকবে।
দেশে চাষি পর্যায়ে লবণের বিক্রয় মূল্য খুবই কম। লবণচাষিদের রক্ষার্থে এই দাম বাড়ানো প্রয়োজন। এজন্য লবণ আমদানি না করে দেশীয় লবণ ব্যবহারের পরিমাণ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে বড় বড় শিল্প-কারখানাগুলোকে দেশীয় লবণ ব্যবহারে এগিয়ে আসা একান্ত প্রয়োজন। এতে দেশীয় লবণচাষিরা তথা দেশ লাভবান হবে এবং মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।
লবণের উৎপাদন বাড়াতে লবণচাষের আধুনিক প্রযুক্তি দেশের সব লবণচাষির কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পাইলট আকারে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখা গেছে, এতে লবণ উৎপাদনের পরিমাণ বর্তমানের দ্বিগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব। এ প্রসঙ্গে বিসিকের চেয়ারম্যান মো. মোশ্তাক হাসান বলেন, ইউনিসেফের কারিগরি সহায়তায় লবণচাষের নতুন প্রযুক্তি সব লবণচাষির মাঝে পৌঁছে দেওয়া হবে। এতে লবণের উৎপাদন দ্বিগুণ হলে লবণ রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার কারণে লবণচাষিরা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হতে পারছেন না। সরকার লবণচাষিদের দাদন ব্যবসায়ীদের হাত থেকে রক্ষা করতে চায়। এ লক্ষ্যে লবণচাষিদের রক্ষার জন্য স্বল্পসুদে ঋণ প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিসিকে লবণ নিয়ে একজন পরিচালকের নেতৃত্বে পৃথক একটি বিভাগ খোলার একটি প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে তিনি জানান।
সবার জন্য মানসম্মত খাবার লবণ নিশ্চিত করতে লবণে আয়োডিনযুক্তকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আয়োডিন মানবদেহের জন্য অতি প্রয়োজনীয়। শিশু মাতৃগর্ভে থাকাকালীন মস্তিষ্কের বিকাশের প্রয়োজনসহ শারীরিক, মানসিক সুস্থতার জন্য একজন মানুষের সারাজীবন আয়োডিন গ্রহণ করতে হয়। তাই সবার জন্য আয়োডিনযুক্ত লবণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। গুণগত মানসম্পন্ন আয়োডিনযুক্ত লবণ উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য লবণচাষি ও মিলমালিকদের মাঝে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। লবণে আয়োডিন মিশ্রণের সিস্টেম লস কমাতে মিলশ্রমিকদের দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং আয়োডিনযুক্ত লবণের গুণগতমান ও আয়োডিনের যথাযথ পরিমাণ নিশ্চিত করতে হবে। সবার জন্য খাবার লবণে আয়োডিন নিশ্চিত করতে বাজারে ভোজ্য লবণ হিসেবে খোলা লবণ বন্ধ করতে হবে।
লবণ উৎপাদনের পাশাপাশি বিসিক ৯০ দশক থেকে সর্বজনীন আয়োডিনযুক্ত লবণ উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ইতোমধ্যে আয়োডিন ঘাটতিজনিত সমস্যা অনেকাংশে লাঘব হয়েছে। ওই কার্যক্রম পরিচালনার ফলে দেশে বর্তমানে দৃশ্যমান গলগণ্ড নেই বললেই চলে। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারের বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে লবণচাষি, লবণমিল মালিক, স্থানীয় রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, সিভিল সোসাইটির সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অংশগ্রহণে নিয়মিতভাবে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপ আয়োজন করা হচ্ছে। এছাড়া সরকারিভাবে আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারের বিষয়ে জনসচেতনতামূলক অন্যান্য উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আয়োডিন ঘাটতি দূর করে একটি মেধাবী জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে আমরা সক্ষম হবো, এটাই সবার প্রত্যাশা।

পিআইডি নিবন্ধ

ট্যাগ »

সর্বশেষ..