দিনের খবর পত্রিকা প্রথম পাতা

লাইসেন্সধারী ৬৬২৬ প্রতিষ্ঠানের ‘অর্ধেকই’ বন্ড অনিয়মে জড়িত

ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট

রহমত রহমান: রপ্তানিকে উৎসাহ আর ব্যবসার উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ড লাইসেন্স দেয় সরকার। কিন্তু বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে আসছে। বিশেষ করে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য তৈরি না করে সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করে দেয়। অনেক প্রতিষ্ঠান শুল্ককর ফাঁকি দিতে পণ্য রপ্তানি করে, কিন্তু টাকা দেশে আসে না। বন্ধ ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে কাঁচামাল আমদানির মাধ্যমেও বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করা হয়।

এনবিআরের হিসাবে, প্রতিবছর বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি হয়, তা দিয়ে কমপক্ষে দুটি পদ্মা সেতু করা সম্ভব। কঠিন শর্ত ও যাচাই শেষে লাইসেন্স প্রদান, নিরীক্ষা, বিআইএন লক, ব্যাংক হিসাব জব্দ, লাইসেন্স সাময়িক ও চূড়ান্তভাবে বাতিল করার পরও অপব্যবহার রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের তালিকা অনুযায়ী, বন্ড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬ হাজার ৬২৬টি, যার মধ্যে অর্ধেক প্রতিষ্ঠানই কোনো না কোনোভাবে অনিয়মে জড়িত।

এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, অনিয়ম পাওয়ার পরপরই বিআইএন লক করা হয়। নিরীক্ষা করা হয়। প্রিভেন্টিভ টিম পরিদর্শন, মামলা, জরিমানা ও অর্থদণ্ড দেয়া হয়। অনিয়ম গুরুতর হলে ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়। অনিয়মের ধরন অনুযায়ী লাইসেন্স সাময়িক বাতিল করা হয়। অপরাধ প্রমাণিত হলে চূড়ান্তভাবে লাইসেন্স বাতিল করা হয়। আবার কোনো প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ প্রমাণিত না হলে বিআইএন আনলক, ব্যাংক হিসাব খুলে দেয়া হয়।

ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের তালিকা অনুযায়ী, এ কমিশনারেটের আওতাধীন মোট বন্ড লাইসেন্সের সংখ্যা ৬ হাজার ৬২৬টি। এর মধ্যে সচল রয়েছে ৩ হাজার ১৩৯টি। সচল থাকা লাইসেন্সের মধ্যে এক হাজার ৭৬৮টি প্রতিষ্ঠান সরাসরি রপ্তানিকারক, রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এক হাজার ৪৮টি, ইপিজেডের প্রতিষ্ঠান ১৮৫টি, সুপারভাইজ বন্ডেড প্রতিষ্ঠান ৯৩টি, হোম কমজাম্পশন বন্ড ১৫টি, ডিপ্লোম্যাটিক বন্ড ৭টি, হাইটেক পার্ক একটি, ডিউটি ফ্রি শপ ১৪টি, বেজার প্রতিষ্ঠান ৮টি।

অন্যদিকে সচল নেই ৩ হাজার ৪৮৭টি। সচল না থাকা লাইসেন্সের মধ্যে কিছু বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ, বিআইএন লক ও কিছু লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। যার মধ্যে সরাসরি রপ্তানিকারক ২ হাজার ৬২৫টি, রপ্তানিকারক ৭৬৯টি, ইপিজেডে ১৬টি, সুপারভাইজড বন্ডেড ৪৫টি, হোম কনজাম্পশন বন্ড ২৯টি, ডিপ্লোম্যাটিক বন্ড একটি, ডিউটি ফ্রি শপ দুটি বন্ডেড লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, সম্পূর্ণ রপ্তানিমুখী ২ হাজার ৩৮৯টি বন্ড প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত, ৮৮টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ, ২৩৮টি লাইসেন্স বাতিল, দুই হাজার ৬২৫টি প্রতিষ্ঠানের বিআইএন লক করা হয়েছে। এছাড়া ৬৯৮টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স মেয়াদ বাড়ানো হয়নি, ৪২৯টি প্রতিষ্ঠানের ইউডি স্থগিত করা হয়েছে। প্রচ্ছন্ন রপ্তানিমুখী ৬৫৫টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত, ৪৫টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ, ১৩১টি লাইসেন্স বাতিল, ৭৬৯টি প্রতিষ্ঠানের বিআইএন লক, ১৬১টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স মেয়াদ বাড়ানো হয়নি, ১৭৩টি প্রতিষ্ঠানের ইউডি স্থগিত করা হয়েছে। সম্পূর্ণ ও প্রচ্ছন্ন রপ্তানীমুখী (ইপিজেড) ১০টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত, তিনটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ, ৮টি বাতিল, ১৬টি প্রতিষ্ঠানের বিআইএন লক, ৮টি লাইসেন্সের মেয়াদ বাড়ানো হয়নি ও ৩টি প্রতিষ্ঠানের ইউডি স্থগিত করা হয়েছে।

৩৯টি সুপারভাইজড বন্ড প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স সাময়িক স্থগিত, দুটির ব্যাংক হিসাব জব্দ, ১০টি বাতিল, ৪৫টি বিআইএন লক, ১০টির মেয়াদ বাড়ানো হয়নি এবং তিনটির ইউডি স্থগিত করা হয়েছে। ২৬টি হোম কনজাম্পশন বন্ড প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স সাময়িক স্থগিত, ৯টি বাতিল, ২৯টি বিআইএন লক, ৭টির মেয়াদ বাড়ানো হয়নি, ৩টি ইউডি স্থগিত। একটি ডিপ্লোম্যাটিক বন্ড প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স সাময়িক স্থগিত, একটি বাতিল, একটির বিআইএন লক, তিনটির ইউডি স্থগিত। হাইটেক পার্ক, ডিউটি ফ্রি শপ ও বেজার তিনটি করে প্রতিষ্ঠানের ইউডি স্থগিত করা হয়েছে।

বন্ড কমিশনারেট সূত্রমতে, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগে ১৩৮টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের বিআইএন লক ও মামলা রয়েছে। অন্যদিকে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত নতুন ২৭টি লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনার মো. শওকত হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান অডিট, বিন লক, আনলক, ব্যাংক ফ্রিজ-একটি চলমান প্রক্রিয়া। যখন দেখি প্রতিষ্ঠান তিন বছরের মধ্যে অডিট হয়নি তখন আমরা বিন লক করে দিই। তখন প্রতিষ্ঠান এসে বলে আমরা আমদানি-রপ্তানি করিনি, আবার তা খুলে দেয়া হয়। অনেক সময় ব্যবসা না থাকলে আমদানি-রপ্তানি করে না।’

তিনি বলেন, ‘আমি আসার পর অডিট ও যাচাই শেষে শতাধিক লাইসেন্স চূড়ান্তভাবে বাতিল করেছি। যেখানে গত ১০ বছরে বাতিল হয়েছে প্রায় তিন শতাধিক। আমরা আরও যাচাই-বাছাই করছি। হয়তো আরও ৫০-১০০টি বাতিল হতে পারে। যাদের কোনো কার্যক্রম নেই, তাদের তালিকায় রেখে তো লাভ নেই। তবে অপব্যবহার করলে শাস্তি তো পাবেই।’

এনবিআর সূত্রমতে, রপ্তানি কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে ব্যবসায়ীদের দাবির প্রেক্ষিতে ২০০০ সালের ১ নভেম্বর বন্ড কমিশনারেট গঠন করা হয়। শুরুতে শুধু ঢাকায়ই বন্ডের অফিস ছিল। ২০১০ সালের ১০ নভেম্বর চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত রপ্তানিকারকদের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতেই এ দুটি বন্ড কমিশনারেট গঠিত হয়। এখন কমিশনারেট দুটিতে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বন্ড লাইসেন্স, বার্ষিক অডিট, আমদানি প্রাপ্যতা, ইউপি ইস্যু করা হয়। এর বাইরে বিদেশি কূটনীতিকদের জন্য পাসবই ইস্যু ও ডিপ্লোমেটিক বন্ডের অডিট, সুপারভাইজড বন্ডের কার্যক্রম মনিটরিং করা হয়।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..