দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

লাগামহীন ভোজ্যতেলের বাজার দফায় দফায় বাড়ছে দাম

আয়নাল হোসেন: রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজারে লাগামহীনভাবে বাড়ছে ভোজ্যতেলের দাম। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে ১৩ টাকা এবং বোতলজাত সয়াবিন তেলে লিটারে ১০ টাকা বেড়েছে।

রাজধানীর পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারের খুচরা ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গত এক সপ্তাহ আগে প্রতি কেজি খোলা সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১০৮ থেকে ১১০ টাকা। গতকাল তা বিক্রি হয়েছে ১২৫ টাকায়। অর্থাৎ কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে ১৩ টাকা। একইভাবে ১০১ থেকে ১০২ টাকার সুপার পাম তেল ১১২ থেকে ১১৩ টাকা এবং ৯৭ থেকে ৯৮ টাকার পাম তেল ১০৮ থেকে ১০৯ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

গত এক সপ্তাহ আগে বাংলাদেশ এডিবল অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের (বিইওএল) মালিকানাধীন রূপচাঁদা ব্র্যান্ডের প্রতি পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ছিল ৫৮০ টাকা, যা গতকাল ৬৩৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সরবরাহ না থাকায় লিটারপ্রতি দাম আরও ১৫ টাকা বাড়ানো হবে বলে পরিবেশকরা মৌলভীবাজারের খুচরা ব্যবসায়ীদের জানিয়েছেন। আর আগে সিটি গ্রুপের মালিকানাধীন তীর ও বসুন্ধরা গ্রুপের পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ছিল ৫৫০ টাকা, যা গতকাল ৬২৫ টাকায় বিক্রি হযেছে। দাম আরও বাড়বে বলে বোতলজাত সয়াবিন তেল উৎপাদনকারীরা ব্যবসায়ীদের জানিয়েছেন।

এ বাজারের মেসার্স শুভ এন্টারপ্রাইজের মালিক সাইফুল ইসলাম জানান, বাজারে ভোজ্যতেলের দাম লাগামহীন। সরবরাহ সংকটের অজুহাতে দাম বেড়েই চলেছে। বোতলের গায়ের মূল্যের সঙ্গে বাজারের মূল্য ঠিক থাকছে না। খোলা তেলের দামও দফায় দফায় বেড়ে চলেছে। এতে মনে হয় বাজারের কোনো মা-বাবা নেই।

রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব অনুযায়ী, গতকাল প্রতি পাঁচ লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ৫৫০ থেকে ৫৮০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগে বিক্রি হয়েছিল ৫৪০ থেকে ৫৮০ টাকায়। প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল গতকাল বিক্রি হয়েছে ১১২ থেকে ১১৫ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ১০৭ থেকে ১১০ টাকা। পাম বিক্রি হয়েছে ১০০ থেকে ১০২ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৯৫ থেকে ৯৭ টাকা এবং ৯৮ থেকে ১০২ টাকার সুপার পাম তেল গতকাল বিক্রি হয়েছে ১০২ থেকে ১০৫ টাকায়।

সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা জানান, ভোজ্যতেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়েই চলেছে। এ কারণে বাংলাদেশেও পণ্যটির দাম বাড়ছে। ভোজ্যতেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল। কাজেই ইচ্ছা থাকলেও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশ্বের জনসংখ্যাবহুল দেশ চীন ও ভারত ভোজ্যতেলের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা। চীনে করোনাভাইরাস শনাক্তের পর কয়েক মাস সে দেশে ভোজ্যতেল কেনা বন্ধ ছিল। কিন্তু চীনে করোনার সংখ্যা কমে যাওয়ায় তারা ভোজ্যতেল সংগ্রহ শুরু করে। বিশ্ববাজার থেকে বিপুল পরিমাণ ভোজ্যতেল মজুত করেছে চীন। সংকটের কারণে বেড়েই চলেছে দাম।

আন্তর্জাতিক নিউজ পোর্টাল ইনডেক্স মুন্ডি ডটকম সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে গত মে মাসে প্রতিটন সয়াবিন তেলের দাম ছিল ৬৮৪ ডলার, জুন মাসে তা বেড়ে হয় ৭৫৫ ডলার, জুলাইতে আরও বেড়ে হয় ৮২১ ডলার, আগস্টে বেড়ে হয় ৮৬৬ ডলার এবং সেপ্টেম্বরে দাম আরও বেড়ে হয় ৯০৬ ডলার। মে মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিটন পাম তেলের দাম ছিল ৫৭৬ ডলার, জুনে বেড়ে হয় ৬৫৬ ডলার, জুলাইতে আরও বেড়ে হয় ৬৯৪ ডলার, আগস্টে দাম বেড়ে হয় ৭৬০ ডলার, সেপ্টেম্বরে দাম আরও বেড়ে বিক্রি হয় ৭৯৮ ডলারে, অক্টোবরে দাম বেড়ে বিক্রি হয়েছে ৯১৪ ডলারে এবং নভেম্বরে তা আরও বেড়ে বিক্রি হয়েছে ৯৭৪ ডলারে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে ১৮ লাখ টন। এর মধ্যে শুধু রমজান মাসেই ব্যবহার হয় চার লাখ টন। দেশে করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর সারা দেশে অঘোষিত লকডাউন শুরু হয়। তখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বায়ার চীনে ভোজ্যতেল সরবরাহ বন্ধ থাকে। তবে দেশে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করায় বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে যায়। চীন বিশ্ববাজার থেকে বিপুল পরিমাণ সংগ্রহ করায় ভোজ্যতেলের মূল্য বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..