মত-বিশ্লেষণ

লালন শাহ মানবতার সাধক

কাজী সালমা সুলতানা:

‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে/লালন কয়

সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে/লালন কয়

জাতির কি রূপ দেখলাম না এ নজরে।’

ফকির লালন সাঁই যাকে আমরা লালন শাহ, মহাত্মা লালন, বাউল সম্রাট, মরমি সাধকসহ একাধিক নামেও চিনি। তিনি তার শিষ্যদের কাছে ‘সাঁইজি’। লালন জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ, গোত্রের ঊর্ধ্বে গিয়ে মানুষ ও মানবতাকে বড় করে দেখেছেন।

বাংলা ভাষা, বাংলার সংস্কৃতি, বাউল সম্প্রদায়, বাউল গান সবই বাঙালির গৌরবের বিষয়। সেই গৌরবের ইতিহাসের গোড়াপত্তন করেছেন লালন সাঁই। লালন ছিলেন একজন দার্শনিকও। তার গান ও দর্শনের দ্বারা অনেক বিশ্বখ্যাত কবি, সাহিত্যিকরাও প্রভাবিত হয়েছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালনের মৃত্যুর দুই বছর পর তার আখড়াবাড়িতে যান এবং লালনের দর্শনে প্রভাবিত হয়ে ১৫০টি গান রচনা করেন। লালনকে বিশ্বকবি বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। লালনের মানবতাবাদী দর্শনে প্রভাবিত হয়েছেন আমাদের জাতীয় কবি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আমেরিকান কবি এলেন গিন্সবার্গও লালনের দর্শনে প্রভাবিত হন। তার রচনাবলিতেও লালনের রচনাশৈলীর অনুকরণ দেখা যায়। লালন সংগীত ও দর্শন নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে।

বাউল সাধক লালন শাহ ১১৭৯ বঙ্গাব্দের ১ কার্তিক (১৭৭২) ঝিনাইদহ জেলার হরিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। অন্য মতে, কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ভাঁড়রা গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। লালন শাহ যৌবনকালে তীর্থ ভ্রমণে বের হলে পথিমধ্যে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। তখন সঙ্গীরা তাকে ছেড়ে চলে যান। সিরাজ সাঁই নামে একজন ফকির তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় বাড়িতে নিয়ে সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। লালন তার কাছে বাউলধর্মে দীক্ষিত হন এবং ছেঁউড়িয়ায় একটি আখড়া নির্মাণ করে স্ত্রী ও শিষ্যসহ বসবাস করেন। লালনের আখড়াতে আজও তার জন্মও তিরোধান দিবসে স্মরণোৎসব আয়োজিত হয়। যেখানে এখনও এসব আয়োজনে প্রচুর লোকের সমাগমে আখড়া ভরে ওঠে। তৎকালীন সময়ের উৎসবে শিষ্য ও সম্প্রদায়ের লোক একত্র হয়ে সংগীত ও আলোচনায় মিলিত হতো। লালনকে বাউল মত এবং বাউল গানের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাউল সম্প্রদায়ের ধর্মমত লৌকিক। বাউলরা আধ্যাত্ম সাধনা, পরমাত্মার অন্বেষণ করেন। তারা মানবতার মর্মবাণী প্রচার করেই জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি মনে করতেন মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বের বিষয় আত্মা। তারা বিশ্বাস করেন আত্মাকে জানলেই পরমাত্মা বা সৃষ্টিকর্তাকে জানা সম্ভব। আত্মার বাস দেহে, তাই বাউলরা দেহকে পবিত্র মনে করেন।

লালন শাহের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। নিজ সাধনাবলে তিনি হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্ম সম্পর্কে গভীর জ্ঞান লাভ করেন। লালন সমাজে প্রচলিত ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, জাত-পাতের বিরুদ্ধে তিনি তার মানবধর্মের মতবাদ প্রচার করেন গানের মাধ্যমে। তার গান ও তার অহিংসবাদী মতবাদ ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশে। প্রায় সব ধর্মেও মানুষ শিষ্যত্ব নেয় লালনের। ফকির লালন সাঁই তার গানের মাধ্যমে শুরু হয় নতুন এক মানবধর্মের চর্চা। তিনি কোনো জাতিভেদ মানতেন না। ধর্ম-বর্ণহীন সমাজের কথাগুলো গানের মূলকথা হওয়ায় মানুষ তার গানের মাধ্যমে মানবমুক্তির আশ্রয় খুঁজে পায়।

সাম্প্র্রদায়িক ভেদবুদ্ধিমুক্ত সার্বজনীন ভাবরসে সিক্ত বলে লালনের গান হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কাছে সমান জনপ্রিয়। লালন সাঁইজি ধর্ম, বর্ণ, গোত্রসহ সব ধরনের জাতিগত বিভেদ থেকে সরে এসে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছেন। তিনি বলেন,

‘এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে।

যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিষ্টান

জাতি গোত্র নাহি রবে।’

লালন সাঁই মনে করতেন, মানুষই সর্বোচ্চ আসনের আসীন। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই যে মানুষের মাঝেই এক মনের মানুষের বাস। তার বহু গানে এই মনের মানুষের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তিনি মনে করতেন, সব মানুষের মাঝেই ঈশ্বর বাস করেন। আত্মা তাদের গুরুত্বের বিষয়। লালন ভক্ত বাউলরা মানেন দেহের মধ্যে স্থিত রয়েছে বিশ্বের সবকিছু। লালনের গান লালনগীতি বা লালন সংগীত হিসেবে পরিচিত। লালন মুখে মুখে গান রচনা করতেন এবং সুর করে পরিবেশন করতেন। এভাবেই তার বিশাল গান রচনার ভাণ্ডার গড়ে ওঠে। লালন তার গানে সমকালীন সমাজের নানা কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, সামাজিক বিভেদ, বৈষম্য ইত্যাদির বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। এছাড়া তার অনেক গানে তিনি রূপকের আড়ালেও তার নানা দর্শন ও প্রশ্নের উত্তর উপস্থাপন করেছেন।

লালনের জীবদ্দশায় তাকে তেমন কোনো ধরনের ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করতে দেখা যায়নি। লালন ফকির তার সাধনাবলে তিনি হিন্দুধর্ম এবং ইসলামধর্ম উভয় শাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। সব ধর্মের লোকের সঙ্গেই তার সুসম্পর্ক ছিল। প্রকৃতপক্ষে লালন ছিলেন মানবতাবাদী এবং তিনি মানুষের মাঝে কোনো ভেদাভেদ বিশ্বাস করতেন না। বাউলদের ধর্ম-সাধনায় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচ্য ‘সহজিয়া’ পন্থা বা ‘সহজপন্থা’। ‘সহজিয়া সাধনা’র মূল কথা হলো ‘উজান-সাধনা’। রূপ থেকে অরূপে পৌঁছার নিরন্তর সাধনা, যা লালনের মধ্যে প্রত্যক্ষ করা যায়। আধ্যাত্মিক ভাবধারায় তিনি প্রায় দুই হাজার গান রচনা করেন। লালনের গানে মানুষ ও সমাজ প্রাধান্য পেয়েছে। আত্মতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব, সাধনতত্ত্ব, সৃষ্টিতত্ত্ব, পরমতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয় নিয়ে অসংখ্য গান রচনা করেছেন ও নিজেই গেয়েছেন। লালন সাঁই তার গানের মাধ্যমে কখনোই কোনো ধর্মকে কটাক্ষ করেননি। তিনি মনে করতেন, তৎকালীন ধর্মভিত্তিক সমাজব্যবস্থার অচলাবস্থা ও তা থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে সবার আগে মানবধর্মকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। লালন মনে করতেন মানুষের মাঝেই এক ‘মনের মানুষ’র বসবাস যার প্রকৃত রূপ সৃষ্টিকর্তা। নিজেকে জানার প্রবল আগ্রহ থেকেই লালন সাঁই তার বিভিন্ন গানে মনের মানুষের বিভিন্ন রূপ তুলে ধরেছেন। লালন তার গানে মানবতাবাদের জয়গান গেয়েছেন। তার লালনের গানগুলোয় তার ব্যক্তিজীবনের বাস্তব প্রভাব দেখা যায়। যে সময় লালন তার গানগুলো রচনা করেন ওই সময়টিতে ভারতীয় উপমহাদেশ একের পর এক আগ্রাসনে জর্জড়িত ছিল। ফকির লালন সাঁই সবসময় চেয়েছেন যেন মানুষ নিজের সত্তাকে চেনে ধর্মান্ধতা, ধর্মীয় বাড়াবাড়িকে উপেক্ষা করে মানবধর্মের পথে চলা সহজ করতে। তাই তিনি বলেনÑ

জাত গেল জাত গেল বলে এ কী আজব কারখানা/সত্য পথে কেউ নয় রাজি সবই দেখি তা না না না ।

লালন শাহ শুধু আধ্যাত্মিক সাধক ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাস্তববাদী, সমাজদরদি, মানব কল্যাণকারী। কেউ বলে ফকির লালন, কেউ লালন সাঁই, কেউ আবার মহাত্মা লালন বিভিন্ন নামেই পরিচিত তিনি। তার তুলনা তিনি নিজেই। তিনি একজন আধ্যাত্মিক বাউল সাধক, মানবতাবাদী, সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক। তার বাউল গান ও বাউলতত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে বহু বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। তথাপিও মানবধর্মের প্রতি অকৃত্রিম মমত্ববোধ তাকে বারবার প্রেরণা জুগিয়েছে। লালনের সেই বাউল গানগুলো এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০০৫ সালে ইউনেস্কো বিশ্বের মৌখিক এবং দৃশ্যমান ঐতিহ্যগুলোর মধ্যে বাউল গানকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে।

১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর লালন ১১৬ বছর বয়সে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় নিজ আখড়ায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর দিন ভোর ৫টা পর্যন্ত তিনি গান-বাজনা করেন এবং এক সময় তার শিষ্যদের বলেন, ‘আমি চলিলাম’ এবং এর কিছু সময় পরই তার মৃত্যু হয়। তারই ইচ্ছা অনুসারে ছেঁউড়িয়ায় তার আখড়ার মধ্যে তাকে সমাধি করা হয়।

বর্তমানে পৃথিবীর অনেক দেশে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। নানা দেশে চলছে যুদ্ধ। হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। লালন ফকিরও প্রতিবাদ করতেন, তবে অহিংসভাবে। মানবাধিকার রক্ষায় আমরা আজ সোচ্চার। মানুষের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে পদে পদে, জগতের সর্বত্র। ফকির লালন শাহ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করায় ছিলেন সচেষ্ট। মানবাধিকারের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো, সাঁইজির সেই বিখ্যাত কথা ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।’

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..