প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

লালমনিরহাটে পশুখাদ্যের দাম বাড়ছেই, খামার বন্ধের শঙ্কা

ফারুক আলম, লালমনিরহাট: লালমনিরহাটে হু হু করে বাড়ছে গো-খাদ্যের দাম। বাজার নজরদারিতে আনতে না পারলে খামার বন্ধের আশঙ্কা করছেন মালিকরা। এ অঞ্চলে গো-খাদ্যের মধ্যে অন্যতম গমের ভুসি, ধানের খড়, চালের কুঁড়া ও রেডি ফিড। খামারিদের কাঁচা ঘাসের সংকট থাকায় তারা সম্পূর্ণরূপে এসব খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় অশনির প্রভাবে এ অঞ্চলে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়। ফলে চলতি বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এতে গরুর খাদ্য খড়কুটা নষ্ট হয়ে যায়। এ জন্য এসব গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার হাটবাজার ও দুধের বড় ক্রেতা রেস্টুরেন্ট আর মিষ্টির দোকান। খামারিরা এসব বিক্রেতার কাছে প্রতি কেজি দুধ ৪৫ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন। খামারিরা জানিয়েছেন প্রতি কেজি দুধ উৎপাদনে তাদের ৬০ থেকে ৭০ টাকা খরচ হচ্ছে। প্রতি কেজি দুধে তাদের ২৫ টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।

মাংসের জন্য মধ্যসত্বভোগীর মাধ্যমে হাটে গরু বিক্রি করতে হয়। এতে গরুর লাইভওয়েট ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গরুর লাইভওয়েট যদি ৪৫০ বা ৫০০ টাকা কিংবা খামারি পর্যায়ে প্রতি কেজি মাংস ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায় বিক্রি করলে তারা লাভবান হতে পারে। তাছাড়া এমন প্রতিকূল পরিস্থিতে খামার টিকিয়ে রাখা দুষ্কর।

এদিকে, পোলট্রি ফিডের দাম বাড়লেও ডিমের দাম কিছুটা বেড়েছে। ব্রয়লার মুরগির দামও বাড়তি। তবে দুগ্ধ খামারিদের দুধ সংরক্ষণের কোনো উপায় না থাকায় তাদের কম দামেই দুধ বিক্রি করতে হচ্ছে। বাজার পরিস্থিতে তারা অনেকটাই জিম্মি। তারা এমন পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান চান।

জানা যায়, গত এক মাস আগেও পাইকারি বাজারে গো-খাদ্যের অন্যতম উপাদান গমের মোটা ভুসির ৩৭ কেজির বস্তা ছিল ১৩০০ থেকে ১৪০০ টাকা। এখন সেই বস্তা কোম্পানি ভেদে ১৮০০ থেকে ২২০০ টাকা। চিকন ভুসির ৫০ কেজির বস্তা ২২০০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮০০ টাকা। খুচরা বাজারে যার বাজার মূল্য অনেক বেশি।

সূত্র মতে, জেলার মধ্যে গো-খাদ্যের বাজার ১০ কোটি টাকার ওপরে। জেলার পাইকারি বাজারে গো-খাদ্যের ভুসির দাম বেড়েছে আগের দামের চেয়ে ২০ লাখ টাকার বেশি। রেডি ফিড কোম্পানিগুলো তাদের সেলসের তথ্য সরাসরি দিতে চায়নি। রেডি ফিডের মধ্যে তীর ব্র্যান্ডের পাঁচ উপজেলার মধ্যে তিন উপজেলায় প্রতি মাসে দেড়শ টন ফিড বিক্রি হয় বলে তারা জানিয়েছে। আলো, আফতাব, নারিশ, সগুনা, এসিআই গোদেরেজের ফিডের বিক্রি বাজারের অন্যান্য ফিডের চেয়ে বেশি। এর বাইরে কোয়ালিটি ফিডসহ আরও প্রায় ৩০ থেকে ৩৫টি রেডি ফিড কোম্পানি তাদের ফিড বাজারে বিক্রয় করছে।

কৃষি খামার নিয়ে কাজ করা একটি কোম্পানির মাঠ সংগঠক আব্দুল আহাদ বলেন, বাজারে গো-খাদ্যের যে অবস্থা তাতে আগামী ৬ মাসের মধ্যে খামারিরা খামার বন্ধ করতে বাধ্য হবে। ১৫ বছর আগে যেমন মানুষ একটা দুইটা গরু পালত গ্রাম্য পদ্ধতিতে, তেমনভাবে পালন করবে। তাছাড়া পোষাতে পারবে না। তিনি বলেন, দুই কেজি দুধের জন্য এক কেজি খাবার খাওয়ানো লাগে। দুই কেজি খাবারের সঙ্গে, কুঁড়া, ভুসি, লেবার, পানি সব কিছুর খরচ যোগ করতে হবে। খড় বা কাঁচা ঘাসের ওপর নির্ভর করে একটা দুইটা পালন করা সম্ভব।

জেলার একমাত্র গমের মিল নয়নমনি ফ্লাওয়ার মিল। এ মিলের ব্যবস্থাপক অফজাল হোসেন বলেন, সব মিলে গমের চাহিদা বেশি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধপরিস্থিতিতে এমন সংকট হয়েছে। আমাদের ছোট মিল। আমরা প্রতিদিন ২০০ বস্তা ভূসি বিক্রি করি। আমাদের ভূসি পাইকারি এখন ১৬৫০ টাকা। অন্যদের বেশি। ভূসির দাম আরও বাড়তে পারে।

কয়েকটি কোম্পানির রেডি ফিড ও ভূসির পাইকারি বিক্রেতা লিটন বলেন, আমরা কয়েকটি কোম্পানির ভূসি বিক্রি করি। এভারেজে ৪০০ বস্তা বিক্রি হয়। আমরা ৩৭ কেজির মোটা ভূসি বিক্রি করছি না এক মাস থেকে। এত দাম দিয়ে কিনে বিক্রি করতে পারব না। তাই আমাদের মালিকের সিদ্ধান্ত মোটা ভূসি কেনাবেচা বন্ধ। প্রতিটা ভূসির মিলগেটেই প্রচুর দাম বেড়েছে।

আপাতত কম কম করে চিকন ভূসি বিক্রি করছি। ৫০ কেজির প্রতি বস্তা এক মাস আগে দাম ছিল ২২০০ টাকা, এখন ২৭৫০ টাকায় বিক্রি করছি। আমাদের  কোম্পানির ফিড প্রতি মাসে তিন উপজেলায় ১৫০ টন বিক্রি হয়।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সাইদুর রহমান বলেন, এই জেলায় যেহেতু ভুট্টা চাষ হয়, তাই খামারিরা ভুট্টা পাতার সাইলেজ খাওয়াবে। আমরা সাইলেজ খাওয়াতে বলছি। গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরসহ আমরা বাজার মনিটরিং করছি। এটা আমরা প্রতিনিয়ত করছি।