প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

লাল-সবুজের অর্থনীতির এগিয়ে যাওয়ার গল্প

আফরোজা নাইচ রিমা: নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে জন্ম হয়েছিল স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ দেশপ্রেম ও মানবতার আর্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক  এবং রাজনৈতিক মুক্তি ছিল অনন্য অর্জন। তাই চতুর্থশিল্প বিপ্লবের যুগে এসেও কোনো মহামারিই নত করতে পারেনি। এ যেন সাহসের মাঝে বাংলাদেশের অর্থনীতির মাধুর্য বিশ্বের বুকে সমুজ্জ্বল।

৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ এ সর্বপ্রথম নভেল করোনা ভাইরাস বা কভিড-১৯ শনাক্ত হয় চীনের উহান প্রদেশে। পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১১ মার্চ ২০২০ এ করোনা ভাইরাসজনিত রোগকে (কভিড) ‘মহামারি’ হিসেবে ঘোষণা করে। আর বাংলাদেশেও এ মহামারির থাবায় পড়ে ২০১৯ সালের ৮ মার্চ। কভিডের প্রকোপের ফলে গোটা বিশ্বই স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সংকটে পড়েেেছ। বাংলাদেশের সব ক্ষেত্রেও এসেছে নানান বাধা। কিন্তু মহামারি প্রাদুর্ভাবের আগে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি স্থিতিশীল অবস্থায় ছিল, যা দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আনতে সাহায্য করেছে। ১৯৭৩-৭৪ সালে বাংলাদেশে গড় মাথাপিছু আয় ছিল ১০০-১৫০ ডলার, এখন ২০২২ সালে মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮২৪ ডলার।

এককথায়, লাল-সবুজের বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক ক্ষেত্রটিকে দৃঢ় ও চূড়ান্তভাবে পরিচালনা করে যাচ্ছে আপন গতিতে। বিশ্বব্যাংকের ২০২১ সালের এক রিপোর্টে জানা যায়, কৃষিক্ষেত্র, শিল্প এবং সেবা খাত ২০২০ সালে জিডিপিতে যথাক্রমে ১২ দশমিক ৭ শতাংশ, ২৯ দশমিক ৬ শতাংশ ও ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ অবদান রেখেছে এবং এই খাতগুলো মোট জনশক্তির ৩৮ শতাংশ, ২২ শতাংশ ও ৪১ শতাংশের কর্মসংস্থান ব্যবস্থা করেছে।

কভিড সময়কালীন বাংলাদেশের নেতৃত্ব অন্য সব দেশের মতো হুমকির সম্মুখীন হলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম এবং প্রধান প্যানিক-ডিফিউসারের ভূমিকা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডেন এবং বার্বাডোজের প্রধানমন্ত্রী মিয়া আমোর মোটলির সঙ্গে শীর্ষ তিন অনুপ্রেরণামূলক নারী নেতার মধ্যে মনোনীত করা হয়েছে, যারা কমনওয়েলেথ কভিড মহামারিতে অসাধারণ নেতৃত্ব প্রদর্শন করেছেন।

কভিড মহামারিতেও বাংলাদেশের অর্থনীতির বিশাল এ উত্থানকে বিশ্বব্যাংকের জুন ২০২১-এর ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস’ প্রতিবেদনে বিশ্বে ২০২০ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ করা হয়েছে মাইনাস ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে মাইনাস ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ধনাত্মক প্রবৃদ্ধি হার প্রাক্কলন করা হয়, যা ছিল ৩ দশমিক ৫১ শতাংশ। আইএমএফের এপ্রিল ২০২১ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি প্রক্ষেপণ করা হয়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।

‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট-রিকভারি অ্যান্ড রেজিলেন্স অ্যামিড গ্লোবাল আনসারটেইনিটি’ শীর্ষক একটি বিশ্ব ব্যাংকার প্রতিবেদনে  জানা যায়, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি সরকারি এবং বৈদিশিক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে কম ঝুঁঁকিতে রয়েছে।

প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক আরও বলেছে, কভিড-১৯ মহামারি থেকে বাংলাদেশ অর্থনীতি দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এদিকে বিশ্বব্যাংকের ‘সাউথ এশিয়া ইকোনমিক ফোকাস স্প্রিং-২০২২’ প্রতিবেদনে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি)  প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলছে, কভিডের কারণে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবে তৈরি পোশাক রপ্তানির ধারা এখনো শক্তিশালী।

কভিডকালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি অন্যতম কারণ ছিল সরকারের দূরদর্শী পরিকল্পনাভিত্তিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবায়ন। রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তি। এছাড়া কভিড মহামারিতে নতুন বাস্তবতায় প্রযুক্তি ব্যবহার বাংলাদেশের জন্য এক নতুন এবং অনন্য আশীর্বাদ। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ ফ্রিল্যান্সিংয়ে তরুণদের উৎসাহ প্রদান করছে। বাংলাদেশ অনলাইন শ্রমিক সরবরাহে বিশ্বে দ্বিতীয়। সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ১ হাজার ২০০-এর অধিক স্টার্টআপ সক্রিয় রয়েছে এবং প্রতি বছর নতুন করে ২০০-এর অধিক স্টার্টআপ যুক্ত হচ্ছে। এর মাধ্যমে ১৫ লাখের অধিক লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রশাসনের মতে, বাংলাদেশে ২০০০-এর অধিক ই-কমার্স ওয়েবসাইট এবং ফেসবুকে ৫০ হাজারের অধিক ই-কমার্স পেজ রয়েছে। এর বাজার দ্রুতগতিতে প্রসারিত হচ্ছে এবং ২০২১-এ এর পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় এসডিজি বাস্তবায়নে নানান সমস্যা থাকলেও বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে বিশেষ অবদান রেখে চলছে। কাউকে পেছনে রাখা যাবে না এ নীতিতে বিশ্বাসী বাংলাদেশ সুষম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করে চলছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘এসডিজি অগ্রগতি পুরস্কার’ পেয়েছেন। জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্ক (এসডিএসএন) পুরস্কারটি দেয়। দারিদ্র্য দূরীকরণ, বিশ্বের সুরক্ষা এবং সবার জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ গ্রহণের সর্বজনীন আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এ পুরস্কার দেয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলমের পর্যালোচনায় দেখা যায়, কভিড মহামারি মোকাবিলায় সরকার চার ধরনের প্রধান কৌশল ব্যবহার করে: (১) আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয় খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি; (২) ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে কর্মসংস্থান ধরে রাখতে এবং মাইক্রো, ক্ষুদ্র, মাঝারি শিল্পে অর্থনৈতিক গতি সঞ্চার করতে আর্থিক প্রণোদনা প্রদান; (৩) দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনগণ, দিনমজুর ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিকদের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে ব্যাপকভাবে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী জোরদার করা। সামাজিক নিরাপত্তার প্রধান প্রধান কর্মকাণ্ড হলো বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ, খোলাবাজারে বিক্রয় কার্যক্রমের মাধ্যমে ১০ টাকা ভর্তুকি মূল্যে চাল বিক্রয়, অরক্ষিত জনগণের মধ্যে নগদ হস্তান্তর, ১৫০টি দারিদ্র্যপীড়িত উপজেলাসহ অন্যান্য উপজেলায় ভাতা কার্যক্রমের সম্প্রসারণ, গৃহহীনদের জন্য গৃহ নির্মাণ; (৪) আর্থিক ধকল কাটিয়ে অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নগদ রিজার্ভ হার ও রেপো হার কমানোর মাধ্যমে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি করা।

একবিংশ শতাব্দীতে বৈশ্বিক সহযোগিতামূলক একটি যৌথ মানবতার এমন একটি বিশ্ব দরকার যেখানে সময় এসেছে বিশ্বের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের সরকার এবং সব স্টেকহোল্ডারের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের মুখোমুখি হওয়ার। সর্বোপরি এক-মনস্ক (single minded) উদ্দেশ্য নিয়ে একসঙ্গে কাজ করা, সংশ্লিষ্ট সবার দীর্ঘমেয়াদি পারস্পরিক সুবিধার জন্য সেই জাতির অর্থনীতির টিকে থাকা নিশ্চিত করা এই প্রতাশ্যা হোক সব দেশের সব কালের।

২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্যগুলো অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ক্ষুধা এবং দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রেক্ষিত পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নকল্পে বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের জন্য বিশ্ব ব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট-রিকভারি অ্যান্ড রেজিলেন্স অ্যামিড গ্লোবাল আনসারটেইনিটি’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি যেন লাল-সবুজের অর্থনীতির আবারও এগিয়ে যাওয়ার গল্প।

পিআইডি নিবন্ধ