প্রচ্ছদ সাক্ষাৎকার

‘লুকাস এনেছে বিশ্বসেরা নিউ জেনারেশন ব্লকচেইন’

স্যাং উন লি বিশ্বের অন্যতম কম্পিউটার গেম প্রোগ্রামার। ব্লকচেইন প্রযুক্তির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রোগ্রামার। কিংডম আন্ডার ফায়ার ও ক্রুসেডার-খ্যাত গেমের স্রষ্টা স্যাং উন লি এখন মনোনিবেশ করেছেন চতুর্থ প্রজন্মের প্রযুক্তি ব্লকচেইন উন্নয়নে। প্রতিষ্ঠা করেছেন লুকাস চেইন ফাউন্ডেশন। তিনি এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী। ব্লকচেইনের মাধ্যমে স্যাং উন লি নতুন এক বিশ্ব তৈরি করতে চান, যেখানে আর্থিক লেনদেন হবে ব্যয়হীন ও দ্রুত। থাকবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। যেখানে থাকবে না কোনো আর্থিক অনিয়ম। ব্লকচেইনের মাধ্যমে পরিচালিত হবে আর্থিক খাত, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, উন্নয়নসহ সামাজিক উন্নয়নের নানা কর্মকাণ্ড। সম্প্রতি লুকাস চেইনের সিঙ্গাপুর কার্যালয়ে ব্লকচেইনের নানা বিষয় নিয়ে তিনি শেয়ার বিজের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেন। তার আলোচনার চৌম্বক অংশ পাঠকের সামনে তুলে ধরা হলো।

শেয়ার বিজ: আর্থিক সেবায় ব্লকচেইন নতুন ধরনের প্রযুক্তি। বর্তমান বিশ্বে আলোচিত একটি বিষয়। এ প্রযুক্তি নিয়ে একটু বলুন।

স্যাং উন লি: ব্লকচেইন ডিজিটাল প্রযুক্তি। যোগাযোগের জন্য যেমন ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, তেমনি লেনদেনের জন্য প্রয়োজন ব্লকচেইন। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে যাবতীয় আর্থিক লেনদেন, ব্যাংক, বিমা, শেয়ারবাজারের বেচাকেনা, আবাসন খাতের লেনদেন, চিকিৎসা, উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়নসহ চ্যারিটির অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়। এটি বিকেন্দ্রীকরণ এক পদ্ধতি। এ পদ্ধতি সারা বিশ্ব থেকে দুর্নীতি ও অনিয়ম মূলোৎপাটন করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবে।

শেয়ার বিজ: মানুষ কেন এ প্রযুক্তি ব্যবহার করবে?

স্যাং উন লি: বর্তমান প্রচলিত পদ্ধতির লেনদেন ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ, ঝুঁকিপূর্ণ এবং শতভাগ নিরাপদ নয়। কিন্তু ব্লকচেইন পদ্ধতিতে লেনদেনে কোনো ব্যয় নেই। এটা শতভাগ নিরাপদ এবংও এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম হওয়ার সুযোগ নেই। নেই কোনো মিডলম্যান। এ কারণে এটি মানুষের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করেছে। তাই ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে ব্লকচেইন। কোরিয়াতে আগামী পাঁচ বছরে ২০ শতাংশ লেনদেন হবে ব্লকচেইনের মাধ্যমে। ১০ বছর পর দেশটিতে কাগজের মুদ্রা টিকে থাকা চ্যালেঞ্জ হবে। ১০ বছর পর সারা বিশ্ব এ প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়বে।

শেয়ার বিজ: বর্তমানে বিটকয়েন ও ইথেরিয়াম বাজারে প্রচলিত আছে, কিন্তু এটি তেমন জনপ্রিয় হতে পারেনি। এর কারণ কী?

স্যাং উন লি: বাজারে দুই ধরনের ব্লকচেইন রয়েছে। প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত ও প্রযুক্তিগতভাবে দুর্বল ব্লকচেইন। বিটকয়েন ও ইথেরিয়াম দুর্বল প্রযুক্তির ব্লকচেইন। বিটকয়েন প্রথম জেনারেশনের ব্লকচেইন। ইথেরিয়াম দ্বিতীয় জেনারেশনের। এ দুটি ব্লকচেইনের মূল সমস্যা হলো এগুলো খুবই ধীরগতির ব্লকচেইন। প্রচলিত মাধ্যমের (নগদ, ব্যাংক ও ক্রেডিট কার্ড) চেয়ে সময় বেশি লাগে। বিটকয়েনের মাধ্যমে কোনো লেনদেন করতে গেলে সময় লাগে প্রায় ৩০ মিনিট। এ কারণে এটি প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে রয়েছে। তাই এটি জনপ্রিয়তা পায়নি।

শেয়ার বিজ: উন্নত প্রযুক্তির ব্লকচেইন সম্পর্কে বলুন?

স্যাং উন লি: লুকাস চেইন চতুর্থ প্রজন্মের ব্লকচেইন। এটি বিশ্বের সর্বোচ্চ প্রযুক্তির ব্লকচেইন। লুকাস চেইনের মাধ্যমে লেনদেন সম্পন্ন করতে কয়েক সেকেন্ড লাগে। এটি শতভাগ নিরাপদ, স্বচ্ছ ও সর্বোচ্চ গতিসম্পন্ন। বর্তমান বিশ্বে উন্নত প্রযুক্তির চারটি ব্লকচেইন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কোরিয়ান-জাপান প্রযুক্তির লুকাস চেইন। সিঙ্গাপুরের জিলিকা, ব্রিটেনের রোডেক্সন আর চীনা প্রযুক্তির অনতোলোজি। লুকাস এদের মধ্যে সবার সেরা। কারণ লুকাস প্রযুক্তিগতভাবে অনেক এগিয়ে।

শেয়ার বিজ: অনেকেই আশঙ্কা করছেন ব্লকচেইন প্রযুক্তি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রচলিত পদ্ধতির ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক খাতের সব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে আসবে। চাকরি হারাবে কোটি কোটি মানুষ। আপনি কী মনে করেন?

স্যাং উন লি: এটি সঠিক নয়। ব্লকচেইন একটি প্রযুক্তি। এটি একটি মাধ্যম। ব্যাংক, বিমা, লজিস্টিক, স্টক মার্কেটের জায়গা দখল করতে পারবে না ব্লকচেইন। তবে ভবিষ্যতে এসব প্রতিষ্ঠানে ব্লকচেইন ব্যবহার করা হবে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

শেয়ার বিজ: আপনি বলছেন, ব্লকচেইন প্রযুক্তিতে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। এটি শতাভাগ নিরাপদ ও স্বচ্ছ। কিন্তু নতুন এ প্রযুক্তি রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণ না করলে কীভাবে এটি জনপ্রিয় হবে?

স্যাং উন লি: প্রযুক্তি খুবই শক্তিশালী বিষয়। সঠিক প্রযুক্তি নিজেই তার অবস্থান করে নেয়। ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন প্রযুক্তি প্রথমে বিভিন্ন দেশে বাধার সম্মুখীন হলেও দ্রুত সে বাধা অতিক্রম করেছে। এখন এটি ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্রের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। রেগুলেটররা শুরুতে ব্লকচেইন প্রযুক্তিকে সেভাবে অভিনন্দন না জানালেও এটি তার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। লুকাস চেইন কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই, কঙ্গোসহ আটটি দেশের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছে। নতুন নতুন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।

শেয়ার বিজ: ব্লকচেইন প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে বলুন।

স্যাং উন লি: আগামী ১০ বছরের মধ্যে ব্লকচেইন প্রযুক্তি সারা বিশ্বে প্রসার লাভ করবে। এরপর এটি খুব দ্রুত প্রসার লাভ করবে। বিশ্বে গুগল, ফেসবুক, অ্যাপল, মাইক্রোসফট, আমাজনের মতো ব্লকচেইনের বড় কোম্পানি হবে। সেক্ষেত্রে লুকাস চেইন এশিয়ায় গুগলের মতো বড় প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

শেয়ার বিজ: বিভিন্ন দেশে ব্লকচেইন নিয়ে আলোচনায় আপনি প্রায়ই বলে থাকেন ব্লকচেইন তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নে বড় ধরনের অবদান রাখবে। সেটি কীভাবে?

স্যাং উন লি: তৃতীয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা দুর্নীতি ও অনিয়ম। আর এ দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করতে প্রয়োজন ব্লকচেইন। তৃতীয় বিশ্বের সরকার এ প্রযুক্তি ব্যবহার করলে অনিয়মের কোনো সুযোগ থাকবে না। রাষ্ট্রের প্রতিটি টাকা কীভাবে কোথায় ব্যবহার করা হলো, তার সঠিক হিসাব থাকবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

শেয়ার বিজ: ব্লকচেইন প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

স্যাং উন লি: আমাদের এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো পলিসি ইস্যু। এ প্রযুক্তিকে বিভিন্ন দেশে চালু করা। বিভিন্ন দেশের সরকার, স্টক এক্সচেঞ্জ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রযুক্তি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করা। তাদের বোঝানো। তবে খুশির খবর হলো বিশ্বের কয়েকটি বড় কোম্পানি ব্লকচেইনের ব্যবহার শুরু করেছে। শিকাগো স্টক এক্সচেঞ্জ বিটকয়েনে টেডিং করার ঘোষণা দিয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে এটি চালু হবে। একটি দুর্নীতিমুক্ত বিশ্ব গড়তে ব্লকচেইন সব বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাবে। আমি এ ব্যাপারে ভীষণভাবে আশাবাদী।

শেয়ার বিজ: আপনাকে ধন্যবাদ।

স্যাং উন লি: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার: এমএম জামান

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..