মত-বিশ্লেষণ

লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি কোনো কল্যাণ বয়ে আনছে কি?

মোহাম্মদ আবু নোমান: কতটা কষ্ট দিয়ে ওরা আদরের সন্তান আবরারকে মেরেছে। প্রাণপ্রিয় মায়ের নিজ হাতে কোলেপিঠে নিয়ে তিল তিল করে গড়ে তোলা শরীর কতভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে মেরে মেরে রক্তাক্ত করেছে পাষণ্ডরা? একজন মা কীভাবে তার প্রাণপ্রিয় সন্তানের ক্ষতবিক্ষত থেঁতলানো শরীরের কথা মনে করে সুস্থ থাকতে পারবেন? আবরার কি বাঁচার জন্য চিৎকার করে আর্তনাদ করেনি? আবরারের মমতাময়ী মা শতভাগ নিশ্চিত, তার আদরের ধন নির্যাতনের কষ্টে-যন্ত্রণায় বারবার ‘মা-মা’ বলে ডেকেছে। মা এ কথা ভেবে কী করে সুস্থ থাকবেন, তার কলিজার টুকরো আবরার কি মৃত্যুর সময় পানি খেতে চায়নি?

পরীক্ষা বলে ঘুমন্ত আবরারকে ‘বাবা-বাবা’ বলে জাগিয়ে তুলে তার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পাঠিয়েছেন মা। নিজেও গিয়েছিলেন গাড়িতে

উঠিয়ে দেওয়ার জন্য। এখন সে মা আর কাকে ‘বাবা-বাবা’ বলে ডাকবেন! নাড়িছেঁড়া সন্তান আবরারের মুখেও আর কখনও ‘মা’ বলে ডাক শুনতে পাবেন কি? পৃথিবীর কোনো মা এটা মনে করে সুস্থ থাকতে পারবে কি?

যেভাবে মা পাখিটা রোদ-বৃষ্টি ও কাক-চিলের নাগাল থেকে রক্ষার জন্য পালক দিয়ে তার ছানাকে আগলে রাখে, ঠিক সেরকম প্রতিটি মা-বাবা সন্তানকে আগলে রাখেন। মায়ের কাছে সন্তান পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। প্রতিটি মা ভালোবাসা ও মমতার চাদরে জড়িয়ে সন্তানকে লালন করেন। আবরারের লাশ বাড়িতে আসার পর বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন শোকে পাগলপ্রায় মা রোকেয়া খাতুন, কারণ তিনি মা। তার মমতা ছিল অতুলনীয়। একমাত্র ভাই ফাইয়াজ যেন পাগল হয়ে গেছে। কোনো কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না ভাইয়ের এই নির্মম মৃত্যু। আমরা কোন সমাজে বাস করছি! তাহলে কি মানুষের কোনো মূল্য নেই? দেশে আইন-কানুন এবং এর প্রয়োগকারীরা কোথায়? আইনের কতটুকু প্রয়োগ হয়?

কোনো সন্তানকে বড় করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠানোর দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া এ দেশে কী বিরাট যুদ্ধ, সেটা শুধু ভুক্তভোগী মা-বাবাই জানেন। আর যে ছেলে দেশের সবচেয়ে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছে, তাকে ও তার মা-বাবাকে কতটা যুদ্ধ করতে হয়েছে আর সে যুদ্ধ যখন এভাবে শেষ হবে তা মানা যায় কি?

বুয়েট একটি অহংকারের নাম। বুয়েট হচ্ছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে বুয়েটকে সর্বোচ্চ স্ট্যান্ডার্ড ধরা হয়। সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের একটা অংশই বুয়েটে ভর্তি হয়ে থাকে। যেখানে সন্তানরা ভর্তির সুযোগ পেলে মা-বাবা গর্ব বোধ করেন, স্বপ্নের জাল বুনেন। কিন্তু এখন বুয়েটে অভিভাবকহীন অবস্থা বিরাজ করছে। যেখানে সন্তানের জীবনের সামান্যতম নিরাপত্তা নেই! যেকোনো ছুতায় সহজেই খুন হয়ে যাবে কষ্টের সন্তান! ভেঙেচুরে যাবে সব স্বপ্ন! এ কোন দেশে বাস করছি আমরা!

সম্প্রতি মানুষের প্রতি মানুষের হিংস্রতা এত বেশি প্রকট আকার ধারণ করছে, যার জন্য মানুষ আর পশুতে কোনো ভেদাভেদ থাকছে না। তাদের ভেতরে কি একটুও মায়া হলো না! তারাও তো কোনো মায়েরই সন্তান। পশুর মধ্যেও এত হিংস্রতা নেই, যতটা মানুষের মধ্যে দেখা যায়। এ ধরনের সংবাদ শোনার পর বিশ্বাস হয় না যে আমরা মানুষ। মানুষের মধ্যে পশুর মতো এমন হিংস্রতা সত্যি মেনে নেওয়া যায় না। মানুষ আর পশু এক নয়। মানুষের বোধশক্তি আছে, যেটা কিনা একটা পশুর নেই। কোন কাজটা করলে ভালো হবে, আর কোনটা করলে খারাপ হবে, এ বোধটুকু প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই থাকে, যেটা কিনা একটা পশুর মধ্যে থাকে না। কিন্তু বর্তমানে মানুষ এত বেশি হিংস্র আর বর্বর হয়ে গেছে যে তার মধ্যে বিচার-বিবেচনা বোধটুকুও লোপ পেয়েছে। ওইসব মানুষকে পশুর সঙ্গে তুলনা করা ছাড়া আর কী বলা যায়?

আজকে যদি সব খুনিদের ফাঁসিও হয়, তাতে আবরারের কী লাভ হবে? ওর মা-বাবা কি তাদের ছেলেকে ফিরে পাবেন? বলার, লেখার বা প্রতিবাদের ভাষা নেই! ২০-২২ বছরে কতিপয় শিক্ষার্থী কী করে একই প্রতিষ্ঠানের সহশিক্ষার্থীদের এভাবে মারতে পারে! প্রকৃত মানুষ হলে তো একটা কুকুরের গায়েও আঘাত করতে হাত কেঁপে ওঠার কথা। বুয়েটের বেদনাদায়ক খবরে সবারই নির্বাক হওয়ার মতো অবস্থা। আমরা কি অন্ধকারের দিকে যাচ্ছি? এ কেমন বর্বরতা, মানবতা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে আজ!

আবরারকে যারা নিজের হাতে পিটিয়েছে। তারা কেউ খুনি বা ক্রিমিনাল ছিল না। তাদের বাবা-মাও খুনি নন; খুন করতে বা খুনি হতে সন্তানকে বুয়েটে পাঠাননি। সন্তানকে নিয়ে তারাও অনেক বড় স্বপ্নের জাল বুনেছেন। আবরারের মা-বাবার আজকে কষ্টের যে অবস্থান, খুনিদের বাবা-মায়ের অবস্থানও প্রায় একই রকম। আবরারের খুনিদের বড় পরিচয় তারা একটি দলের; একটি দেশের ও প্রতিষ্ঠানের নেতাকর্মীদের দ্বারা গঠিত সে দল। এরই মধ্যে আবরার হত্যাকাণ্ডের আসামি হিসেবে পুলিশ যাদের চিহ্নিত করেছে, তারা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী।

ছাত্রলীগ যে শুধু ভিন্নমতের সমর্থকদের হত্যা করেছে তা নয়, তাদের নিজ সংগঠনের বন্ধুদের মধ্যেও কোন্দলে প্রাণ গেছে অনেকের। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ে ছাত্রলীগের নিজেদের কোন্দলে নিহত হন ৩৯ জন। আর এ সময়ে ছাত্রলীগের হাতে প্রাণ হারান অন্য সংগঠনের ১৫ জন। দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাদের খুনি বানিয়েছে। সুতরাং এ হত্যাকাণ্ডের জন্য আমরা কাকে দায়ী করব?

লেখার জবাব লেখা দিয়ে দেওয়া যায়; যুক্তির জবাব পাল্টাযুক্তি দিয়ে। পড়াশোনা, খেলাধুলা, গবেষণা, মুক্তচিন্তা, বিতর্কÑএসবই তো বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ। আমাদের অসহিষ্ণুতার পর্যায় কোথায় নেমে গেছে যে, একটা ফেসবুক স্ট্যাটাসের জন্য মেরেই ফেলা হলো! যে ছেলেরা একটা ফেসবুক স্ট্যাটাসকে মেনে নিতে পারে না, সে ছেলেরা দেশ পরিচালনা করবে কীভাবে? আমরা তবে কাদের পড়াই, কাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখি, কাদের হাতে ভবিষ্যৎ? যাকে মারল সে যুবক, যারা মারল তারাও যুবক। এই বয়সিদের মনে এমন হিংস্র মনোভাব কীভাবে তৈরি হলো! এর জন্য আমাদের সমাজ, সামাজিক সংস্কৃতি ও রাজনীতি দায়ী নয় কি?

আবরার, বিশ্বজিৎ, রিফাতÑসবাই তো প্রকাশ্য হত্যার শিকার। বিশ্বজিৎকে কোপাতে, আবরারকে পেটাতে তাদের হাত-বুক কিছুই কাঁপেনি। তারা এভাবেই দলের কাছে তাদের ক্রিয়াশীলতার প্রমাণ রাখে মাত্র! বাংলাদেশের ইতিহাসে সব সরকারের আমলেই সর্বদা ভিন্ন মতাবলম্বী রাজনৈতিক সংগঠনের সভা-সমাবেশ হলে বাধা দেওয়া বা ভিন্ন মতাবলম্বী সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রহার কিংবা লাঞ্ছিত করাই যেন সরকার-সমর্থক ছাত্রসংগঠনগুলোর অবশ্যকরণীয় কাজ!

স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী অধ্যায় ছাড়া ভালো কাজের জন্য ছাত্ররাজনীতি গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে, এমন নজির আছে কি? ছাত্ররাজনীতির নামে মেধাবী ও নিরপরাধ যত ছাত্র ও সাধারণ মানুষ মারা গেছেন, গোটা পৃথিবীর ছাত্রসংগঠনগুলোর সে রেকর্ড আছে কি? শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই কেনÑগ্রামেগঞ্জে, পাড়ামহল্লায়ও তাদের উৎপাতের কারণে শান্তিপ্রিয় মানুষের থাকাই দায়! ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল ও আশাবাদী মা-বাবার বুক খালি করা ছাড়া শিক্ষাঙ্গনের ছাত্র-শিক্ষকদের সংগঠন সাধারণ ছাত্র-শিক্ষকের কোনো কাজে আসে কি?

দেশ যখন পরাধীন ছিল তখন ছাত্ররাজনীতি ছিল সময়ের দাবি। একটি স্বাধীন দেশে ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজনীয়তা কতটুকু তা ভেবে দেখা দরকার। ‘ছাত্র’ ও ‘রাজনীতি’ শব্দ দুটো একসঙ্গে চলতে পারে না। ধর্ষণে সেঞ্চুরি উদ্যাপন, চাঁদাবাজি, ভিন্ন মত রুখতে হত্যা, ধর্ষণ করে ধামাচাপা দেওয়া, জনমানুষের মাঝে ত্রাস সৃষ্টিÑছাত্ররাজনীতির এসব রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি বন্ধের এখনই সময়।

জাবি ছাত্রলীগের ঈদের বখশিশ ছিল দুই কোটি টাকা, যেটা আন্তঃকোন্দলের কারণে প্রকাশ পায়। এমনি হাজারো অপ্রকাশিত বখশিশ আদায়ের খবর দেশে নেই কি? যে দেশে লাখো মানুষ ফুটপাতে, রাস্তায়, রেলস্টেশনে রাত কাটায়; অর্ধাহার-অনাহারের যন্ত্রণায় নিজের সন্তানকে বিক্রি করে, হত্যা করেÑসে দেশে ছাত্রদের চাঁদার দাবি দুই কোটি টাকা, চিন্তা করা যায়?

আমরা তো বলে থাকি দেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে এগোচ্ছে। বাংলাদেশ সারা বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। আমরা কি এই উন্নয়নের সঙ্গে মানবিকতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছি? উন্নয়নের সঙ্গে সভ্যতাকে তাল মিলিয়ে চালাতে পারছি?

তাহলে আমরা উন্নয়ন বলতে কী বোঝাতে চাচ্ছি?

শুধু কি রাস্তাঘাট, ইমারত ও ব্রিজ তৈরি? একজন ভিন্নমত পোষণ করতেই পারেন, তার বিশ্লেষণের সঙ্গে আমরা একমত না হতেই পারিÑতাই বলে পিটিয়ে মেরে ফেলা! এমন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে যদি আমরা বাস করি, তাহলে

প্রশ্ন আসতেই পারেÑনিজেদের সভ্য বলে, উন্নত বলে দাবি করছি কীভাবে?

ফাঁসি দিয়ে অপরাধীকে মুছে ফেলা যায়, অপরাধকে মুছে ফেলা যায় না। অপরাধকে মুছে ফেলতে হয় মানবিক মূল্যবোধ দিয়ে, যা পরিবারে সৃষ্টি করেন পরিবারের অভিভাবক, সমাজে সমাজপতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, রাজনীতিতে রাজনীতিবিদ, সরকারে সরকারপ্রধান। এর সঙ্গে এ কথাও মানতে হবে, শুধু ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ শিক্ষাই যথেষ্ট নয়। কঠোরভাবে আইনের শাসন বাস্তবায়নও জরুরি।

দেশে দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা সময়ের দাবি। সময় এসেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতির ধরন-ধারণ পাল্টানোর। নয়তো এ ধরনের সহিংসতা অদূর ভবিষ্যতে আরও ঘটবে। আমরা আর কোনো মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ শুনতে চাই না। আর একজন আবরারকেও যেন অকালে হারিয়ে যেতে না হয়।

ফ্রিল্যান্স লেখক

[email protected]

সর্বশেষ..