দুরে কোথাও

লোকায়ন জীবনবৈচিত্র্য জাদুঘর

প্রচলিত ধারণায় জাদুঘর বললে আমাদের মনে যে চিত্রটি ভেসে ওঠে, ঠিক তেমন নয় এ জাদুঘরটি। গতানুগতিক আদল থেকে ভিন্নধারায় সাজানো এ জাদুঘরে প্রাধান্য পেয়েছে বাংলাদেশের লোকজ বিষয়গুলো। দেশের সব জেলা ও নদীর মাটিসহ আরও অনেক কিছুর সংগ্রহ রয়েছে এখানে। বলছি উত্তরের জনপদ ঠাকুরগাঁওয়ের ‘লোকায়ন জীবনবৈচিত্র্য জাদুঘর’-এর কথা।

কৃষক, কামার, জেলে, তাঁতি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ ছিলেন বাংলাদেশের উত্তর জনপদের প্রধান চালিকাশক্তি। তাদের কাজকর্ম, জীবনযাপন, বিনোদন ও লোকজ ঐতিহ্যের মহিমায় উজ্জ্বল এ অঞ্চল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা তাদের জীবনযাপন, উপকরণ ও বৈচিত্র্য ফুটে উঠেছে ঠাকুরগাঁও শহরতলির পূর্ব আকচা গ্রামে অবস্থিত লোকায়ন জীবনবৈচিত্র্য জাদুঘরে।

ভিন্নধর্মী এ জাদুঘরের যাত্রা ২০০৬ সালে। ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) নামে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে গোড়াপত্তন এর। ২০০৮ সালের এপ্রিলে জাদুঘরের উদ্বোধন করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হাফিজ উদ্দিন খান। এরপর সমৃদ্ধ হতে থাকে সংগ্রহের পরিমাণ। সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয়রাই জাদুঘরের উপাদানগুলোর সংগ্রাহক।

তৃণমূল লোকজ গ্যালারি দিয়ে এ জাদুঘরের যাত্রা হলেও পরে আরও তিনটি গ্যালারি সংযোজন করা হয়। ভবিষ্যতে আরও আটটি গ্যালারি তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে এ জাদুঘরের গ্যালারিগুলো হলো: তৃণমূল লোকজ গ্যালারি, সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী গ্যালারি, নদী গ্যালারি ও মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারি।

মেজো ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের জনপদ পঞ্চগড়ে। সে সুবাদে পঞ্চগড়ের পাশের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে পা রাখা। সাংবাদিক শরীফুল ইসলাম ঘুরে দেখালেন জেলার দর্শনীয় স্থানগুলো। এ তালিকায় সবার আগে ছিল জাদুঘরটি।

ব্যতিক্রমী জাদুঘর ঘুরে দেখা যায়, প্রত্যেকটি গ্যালারিই আলাদা বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে সাজানো। শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা, হাসি-কান্না ও বিনোদনের বিচিত্র উপকরণ দিয়ে সাজানো হয়েছে ‘তৃণমূল লোকজ গ্যালারি’। এখানে প্রদর্শিত উপকরণের মধ্যে রয়েছে: কৃষিজ উপকরণ, ভেষজ চিকিৎসা উপকরণ, বিভিন্ন সময়ের মুদ্রা, কাগুজে নোট, অলংকার, গৃহস্থালি উপকরণ, বৈবাহিক উপকরণ ও মৃৎশিল্প।

বাংলাদেশের প্রায় সবকটি নদ-নদীর পানি সংরক্ষিত রয়েছে ‘নদী গ্যালারি’তে। গ্যালারিটি ২০১৬ সালে দর্শনার্থীর জন্য উম্মুক্ত করা হয়। এখানে রয়েছে হারিয়ে যাওয়া বেশ কয়েকটি নদীর পানি। এখানে আরও রয়েছে আরব সাগর, নীল সাগর ও বঙ্গোপসাগরের পানি। নদীর পানি ছাড়া এ গ্যালারিতে রয়েছে নদীভিত্তিক নানা পেশাজীবীর নানা উপকরণ, বাংলাদেশের নদ-নদীর তালিকা, নানা ধরনের নৌকা, নদীভিত্তিক উৎসব, মৎস্য, জলজ উদ্ভিদসহ আরও অনেক বিষয়।

বাংলাদেশের উত্তর জনপদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনযাপন, সংস্কৃতি, বাসস্থান, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, পেশা, উৎসব ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের নানা উপকরণে সমৃদ্ধ ‘সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী গ্যালারি’। নৃগোষ্ঠীর মানুষের শিল্পকলা, ধর্ম, পেশা, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন সংক্রান্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদর্শন করা হয়েছে এ গ্যালারিতে।

এখানে রয়েছে একটি সমৃদ্ধ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গ্যালারি। ২০১৭ সালে দর্শনার্থীর জন্য উš§ুক্ত করা হয় গ্যালারিটি। এখানে প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, আলোকচিত্র ও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত নানা সংবাদ প্রদর্শন করা হয়েছে। রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত নানা উপকরণ, রণাঙ্গনের ইতিহাস ও দেশের বিভিন্ন বধ্যভূমির মাটি।

জাদুঘরের ব্যাপারে কথা হয় ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ড. মুহম্মদ শহিদ-উজ-জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, খেটে খাওয়া মানুষের রক্ত ও ঘামে প্রতিষ্ঠিত আজকের এ সভ্যতা। আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের শিকড় নতুন প্রজন্মকে জানানোর প্রয়াসে জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বছরের নানা বিশেষ দিনে লোকায়নকে ঘিরে আয়োজন করা হয় নানা অনুষ্ঠান। পয়লা বৈশাখ, বসন্তবরণ, জ্যৈষ্ঠের ফল উৎসব, বর্ষা-মঙ্গল উৎসব, মঙ্গা মোকাবিলায় আশ্বিন মাসে মঙ্গাকাল, অগ্রহায়ণে নবান্ন উৎসব, মাঘে পিঠা উৎসব ও চৈত্রে অনুষ্ঠিত হয় লোকজ মেলা এবং কবিগানের উৎসব। শ্রাবণের শেষে এখানে অনুষ্ঠিত হয় বর্ষা-মঙ্গল উৎসব। উৎসবে শিল্পীরা নানা গান পরিবেশন করেন। আবৃত্তিতে অংশ নেন স্থানীয় ও জাতীয় কবি-সাহিত্যিকরা। দিবসগুলো বর্ণিলভাবে পালন করা হয় এখানে। এ উপলক্ষে এখানে সমাগম হয় অনেক দর্শনার্থীর।

ঠাকুরগাঁও শহর থেকে চার কিলোমিটার উত্তরে গ্রামীণ নৈসর্গিক পরিবেশে গড়ে ওঠা জাদুঘরটির পুরো প্রাঙ্গণজুড়ে রয়েছে নানা প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ। নানা প্রজাতির ফুলের গাছ শোভা বাড়িয়েছে

প্রাঙ্গণের। স্থানীয়রা বলেন, এখানে দেখা মেলে দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির পাখিরও।

সময়সূচি

সোম থেকে শনিবার সকা-সন্ধ্যা পর্যন্ত খোলা থাকে এ জাদুঘর। রোববার বন্ধ। শিক্ষার্থীদের স্টাডি ট্যুর সম্পূর্ণ ফ্রি। অন্য দর্শনার্থীদের প্রবেশ মূল্য ২০ টাকা।

যেভাবে যাবেন

বাংলাদেশের যে কোনো জয়গা থেকে বাস, ট্রেন বা নিজস্ব পরিবহনে প্রথমে ঠাকুরগাঁওয়ে যেতে হবে। কর্ণফুলী পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, নাবিল পরিবহন, বাবলু এন্টারপ্রাইজ, কেয়া পরিবহন ও সোহাগ পরিবহনের বাসসহ আরও অনেক পরিবহনের বাস ঢাকা-ঠাকুরগাঁও রুটে চলাচল করে। এছাড়া রাজধানীর কমলাপুর কিংবা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন হতে লালমনিরহাট বা ঠাকুরগাঁও রুটে চলাচলকারী যে কোনো ট্রেনে চড়ে ঠাকুরগাঁওয়ে আসতে পারেন। বাসভেদে ভাড়া পড়বে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা। ট্রেনের ভাড়া ৪০০ থেকে ৯০০ টাকা। রিকশা বা অটোরিকশায় ডায়াবেটিস হাসপাতালের পাশের রাস্তা দিয়ে চার কিলোমিটার দূরে আকচা গ্রামে অবস্থিত লোকায়ন জাদুঘরে যাওয়া যাবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..