প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

শঙ্কিত হও যখন সবাই আশাবাদী সাহসী হও সবাই যখন ভীত

 

মোহাম্মদ হাসান শাহারিয়ার: সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে এক রকম সুবাতাস বইছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া ঊর্ধ্বমুখী বাজার বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে মাত্র চার মাসে চার হাজার ৬৪৯ থেকে পাঁচ হাজার পয়েন্টে পৌঁছায়, যা গত দুবছরের মধ্যে ইনডেক্সের সর্বোচ্চ অবস্থান। প্রান্তিক থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সরকারের নীতিনির্ধারক মহল সবাই আশাবাদী হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ ছয় বছরের খরা কাটিয়ে বাজার হƒত জৌলুস ফিরে পাবেÑএ প্রত্যাশা সবার।

ছোট-বড় সবাই নতুন স্বপ্ন বুনছেন। ২০১০-এর তিক্ত অভিজ্ঞতার পর আবারও আলোর ঝলকানি দেখছে সবাই। গত ছয় বছরে বহুবার এমন ঝলকানি দেখা গেলেও তা মিলিয়ে যেতে সময় লাগেনি। তবে এবারের অবস্থা নানা দিক থেকে ব্যতিক্রম। অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই বহুদিন থেকে ঊর্ধ্বমুখী, শুধু পুঁজিবাজার ছাড়া। ফলে ব্যক্তিশ্রেণি/প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, বাজার বিশ্লেষক বা নীতিনির্ধারণী মহল সবাই এক সুর-তাল-লয়ে বলছেন ,পুঁজিবাজারে সুদিন আসন্ন।

পতন শেষে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে, এতে নতুন কোনো চমক নেই। বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাজারে উত্থান-পতন নিয়মিত ঘটনা, যা চক্রাকারে চলে আসছে। বরং সবশেষ পতনের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে ছয় বছর সময় নেওয়াই কিছুটা অপ্রত্যাশিত। দেরিতে হলেও আমাদের পুঁজিবাজার আবার ঘুরে দাঁড়ানোর পূর্বাভাস দিচ্ছে, যাতে বাজার-সংশ্লিষ্ট সবাই হতাশা ঝেড়ে নতুন উদ্যমে পথ চলার স্বপ্ন দেখছেন।

প্রতিটি পতন থেকেই পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টরা কিছু না কিছু শিক্ষা গ্রহণ করেন। আমাদের অবস্থাও ব্যতিক্রম নয়। নিয়ম-নীতি, আইন-কানুন, ম্যানেজমেন্ট অনেক কিছুই আমূল পাল্টে ফেলা হয়েছে। তবে বিনিয়োগকারী হিসেবে আমাদের মানসিকতা ও বিনিয়োগ-চিন্তায় ব্যাপক পরিবর্তন না এলে শুধু আইন-কানুন দিয়ে পুঁজির পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান সম্ভব নয়।

বিনিয়োগকারী হিসেবে আমাদের পরিপক্ব বিনিয়োগ মানসিকতা ও সুবিবেচনাবোধের পরিচয় দেওয়ার সময় এসেছে। আগ্রাসী না হয়ে বিনিয়োগে শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক মুনাফা অর্জনের চেষ্টা পুঁজিবাজারে সুসময় ফিরিয়ে আনতে এবং তা দীর্ঘস্থায়ী করতে সহায়ক। বিনিয়োগকারী হিসেবে নিজের স্বার্থেই প্রত্যেকের উচিত বাজারকে ন্যূনতম সহায়তা করা।

বিনিয়োগ গুরু ওয়ারেন বাফেট বলেন, ‘শঙ্কিত হও সবাই যখন আশাবাদী, সাহসী হও সবাই যখন ভীত।’ বাজার নিয়ে সবাই এখন আশাবাদী। চারপাশের উচ্ছ্বাসের জোয়ারে ভেসে না গিয়ে বুদ্ধিমান বিনিয়োগকারীর জন্য সময় এখন সাবধানি হওয়ার। মন্দাবাজারে ভালো স্টক ন্যায্য দামে বা অবমূল্যায়িত অবস্থায় কেনার অনেক বেশি সুযোগ পাওয়া যায়। ঠিক বিপরীত অবস্থা হয় উঠতি বাজারে। ন্যায্য দামে কেনার সুযোগ যেমন কমে আসে, তেমনি উচ্চ দামে মানহীন শেয়ার কেনার আশঙ্কা বাড়তে থাকে।

তাই উঠতি বাজারে বুদ্ধিমান বিনিয়োগকারীরা কেনার ক্ষেত্রে অধিক সাবধানতা অবলম্বন করেন। কারণ কেনার সময়ই মুনাফা নিশ্চিত করতে হয়; বিক্রি করে তা সম্ভব নয়। মূল্য ছাড়ে (অবমূল্যায়িত স্টক) অথবা ন্যায্য দামে কিনতে পারলেই শুধু মুনাফাসহ বিক্রির সুযোগ পাওয়া যায়। উচ্চ দামে কিনে অতি উচ্চ দামে বিক্রির সম্ভাবনা তুলনামূলক অনেক কম।

সবাই যেহেতু বাজার নিয়ে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি আশাবাদী, সেহেতু ভয়ে গুটিয়ে যাওয়া অনাবশ্যক। শুধু কেনার সময় একটু অতিরিক্ত সাবধানি হলেই বড় ক্ষতির ফাঁদ থেকে বাঁচা সম্ভব। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী হিসেবে পুঁজির নিরাপত্তা সর্বাগ্রে; তারপর মুনাফার চেষ্টা। গত দু’তিন মাসে বাজারের সব শেয়ারই কম-বেশি বেড়েছে। যা-ই কিনেছেন, তাতেই মুনাফা পেয়েছেন অনেকে। কারণ বেশিরভাগ স্টক ছিল অবমূল্যায়িত।

এমন অবস্থা ক্ষণস্থায়ী। ঊর্ধ্বমুখী বাজারে দ্রুতই বহু স্টক ন্যায্য দামে চলে যাবে। কোনো কোনোটি অতিমূল্যায়িত হয়ে পড়বে। তাই আজ যা অল্প মুনাফায় বিক্রি করছেন, তা আগের মূল্য স্তরে কেনার সুযোগ নাও পেতে পারেন। ওয়ারেন বাফেটের ভাষায়, ‘পুঁজিবাজার এমন এক স্থান, যা ধৈর্যহীনদের পুঁজি ধৈর্যশীলদের পকেটে স্থানান্তর করে।’ আর তার সহযোগী চার্লস মঙ্গার বলেন, ‘কেনাবেচায় (ট্রেডিং) বড় মুনাফা সম্ভব নয়, যা অপেক্ষায় (বিনিয়োগ) মেলে।’”

তাই পোর্টফোলিওতে থাকা ভালো শেয়ারকে সময় দিন, যেন ন্যায্য দাম ফিরে পায়। শুধু সেই স্টকগুলো বিক্রি করুন, যা আপনার বিবেচনায় অতিমূল্যায়িত হয়ে যাচ্ছে। এতে আপনি একদিকে মুনাফা নগদায়ন করতে পারছেন; অন্যদিকে পোর্টফোলিওকে রাখতে পারছেন ঝুঁকিমুক্ত।

তাই হুটহাট স্টক পরিবর্তন না করে ভালো যা আছে, তাতেই থাকুন। ভালো দাম পেলে অল্প করে ধাপে ধাপে বিক্রি করুন। যদি নতুন কিছু কিনতেই হয়, তবে কৃপণতার পরিচয় দিন। যাচাই-বাছাই করে দামাদামি চূড়ান্ত করে কিনুন। ঠিক যেভাবে কাঁচাবাজারে শাকসবজি কেনেন, সেভাবে। হট টিপস আর বেড়ে যাওয়া হট স্টকের পিছু ধাওয়া না করে ভালো স্টক কম বা ন্যায্য দামে কেনার চেষ্টা করুন। কারণ কিনেই মুনাফা নিশ্চিত করতে হয়; বিক্রিতে নয়।

 

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ

[email protected]