সুস্বাস্থ্য

শতায়ুর জন্য জিমই সব নয়

বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন সুন্দর স্বাস্থ্য। আর সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়ার জন্য যে জিমেই যেতে হবে, তা নয়। ট্রেডমিল কিংবা ওয়েট মেশিনের কাছে নিজেকে যে সঁপে দিতে হবে, তাও নয়। তথ্যসহ এ যুক্তির সপক্ষে উপযুক্ত অনেক প্রমাণাদি হাজির করা যাবে। এ লেখায় তাই বিশ্বে যারা দীর্ঘায়ু, অথচ জিমে যান না তাদের উদাহরণ দিয়ে লেখাটা শুরু করা হয়েছে।
‘ব্লু জোন’ শব্দ দুটির সঙ্গে নিশ্চয়ই পরিচয় রয়েছে পাঠকের। অপরিচিত হলেও অসুবিধা নেই। জানিয়ে দিচ্ছি, ব্লু জোনগুলো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের লোমা লিন্ডা, গ্রিসের ইকারিয়া, ইতালির সারদিনিয়ার ওগলিয়্যাস্ট্রা, জাপানের ওকিনাওয়া ও কোস্টারিকার নিকোয়া পেনিনসুলা। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের তুলনায় এখানকার মানুষ বেশিদিন বাঁচে। এসব স্থানের মানুষের গড় আয়ু ১০০ বছর। প্রকৃতিগতভাবেই তারা শতায়ু। তারা কি নিয়মিত জিম করেন? কয়েক ঘণ্টা ব্যায়ামের পেছনে ব্যয় করেন? না, তা নয়। তারা জিমে যাতায়াত করেন না, আয়রন পাম্প করেন না, এমনকি ম্যারাথনেও অংশ নেন না।
এসবের পরিবর্তে তারা প্রকৃতি ও পরিবেশের সান্নিধ্যে বেশি সময় কাটান। কোনো চিন্তা ছাড়াই তারা প্রকৃতির কাছে থাকার চেষ্টা করেন। অর্থাৎ বাগান করেন তারা। এর পরিচর্যা করেন। আমরা ছোটবেলায় পড়েছি, হোয়াট ইজ ইওর হবি? এর উত্তর দিয়েছি ও লিখেছি: গার্ডেনিং। কিন্তু এমন উত্তর শুধু পরীক্ষার খাতাতেই শোভা পেত। বাস্তবে এর প্রয়োগ ছিল কী? না, ছিল না। বিষয়টির প্রায়োগিক দিকটি সুচারুরূপে ফুটিয়ে তুলেছেন ব্লু জোনের অধিবাসীরা। পরিচর্যার পাশাপাশি সময় পেলেই তারা বাগানে পায়চারি করেন। যান্ত্রিকতা পরিহার করে তারা ঘর, বাড়ি, উঠোন প্রভৃতির পেছনে হাঁটাহাঁটি করে তুলনামূলক বেশি সময় পার করেন।
গবেষকরা জানিয়েছেন, নিয়মমাফিক প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটালে আয়ুষ্কাল বাড়ে। শুধু ব্লু জোনই নয়, বিশ্বের সব অঞ্চলের দীর্ঘায়ু মানুষের মধ্যে একই অভ্যাস বিরাজমান।
এ অভ্যাসের দাস হওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও আমাদের অনুকূলে নয়। তাই ইচ্ছা ও সংগতি থাকলেও প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। নগরায়ণের পাশাপাশি ডেস্কে আঠার মতো বসে থাকা, কম্পিউটারে একনাগাড়ে কাজ করা প্রভৃতি কারণে আমরা দূরে সরে যাচ্ছি প্রকৃতি থেকে। কাজেই এমন অভ্যাস অনুসরণ করা আমাদের পক্ষে বেশ দুরূহ।
প্রকৃতির বশে টিকে থাকার মধ্যে আনন্দ রয়েছে। রয়েছে রোমান্টিকতা। জানেন কি, আজ থেকে ১০০ বছর আগে আজকের মতো বসে কাজ করার প্রবণতা ছিল না। তখনকার দিনে মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ ডেস্ক জব বা সিটে বসে কাজ করতেন। প্রকৃতির সঙ্গে ছিল তাদের মিতালি। বর্তমানে বসে কাজ করা মানুষের হার প্রায় ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ৯০ জনকে ডেস্ক জব করতে হয়। ফলে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। এ অভ্যাস চর্চা করে দীর্ঘায়ু হওয়ার চিন্তা করা যায় না। আশার কথা, এ জীবনধারায় পরিবর্তন আনা সম্ভব, সচল থাকা সম্ভব।
কীভাবে? এক শব্দে এর উত্তর হচ্ছে, স্থানান্তর। যাকে বলে, এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাওয়া। অর্থাৎ হাঁটাহাঁটির পরিমাণ বাড়াতে হবে। প্রয়োজনীয় কাজ করে হাঁটাহাঁটি করা যায়। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি ভাঙুন। অল্প দূরত্বে যাবেন? গাড়ির পরিবর্তে হেঁটে যান সেখানে। কাজ সেরে হেঁটেই ফিরুন বাড়িতে। সন্তানকে নিয়ে স্কুলে যান, হেঁটে। বাজারে যান হেঁটে, কেনাকাটা করুন হেঁটে হেঁটে। বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে যাবেন হেঁটে। তাছাড়া সাইকেল চালাতে পারেন। মোদ্দাকথা, সক্রিয় থাকতে হবে।
তবে চাইলেই যে হাঁটা যায় না, তা আগেই জেনেছেন। এ কারণে ঘরের কাজের মধ্যে হাঁটাহাঁটির উপায় খুঁজে বের করুন। ঘরের কাজ যতটুকু সম্ভব নিজেই করুন। হাঁটার জন্য দল গঠন করুন। দল বেঁধে হাঁটুন। দলগতভাবে হাঁটলে দেহ-মন ভালো থাকে। এতে মনোবল বাড়ে, কমে হতাশা। সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নিত্যদিনের হাঁটাহাঁটির অভ্যাস ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ডিমেনশিয়া হ্রাস করে।
শুধু হেঁটেই উচ্চ রক্তচাপ, মেদভুঁড়ি, রক্তে শর্করার পরিমাণ কমানো যায়। ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের ঝুঁকি এড়ানো যায়, ফুসফুস ও হৃৎযন্ত্র ভালো রাখা যায়। ডায়াবেটিস এড়ানো যায়, নিয়ন্ত্রণেও রাখা যায়। ওবিসি দূরে রাখা যায়। এড়ানো যায় পারকিনসন ডিজিজ। সপ্তাহে মাত্র দুই ঘণ্টা হেঁটেই কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ, রেসপিরেটরি ডিজিজ ও ক্যানসারের মতো রোগ দূরে সরিয়ে রাখা যায়।
এ লেখাটা শুরু করেছিলাম ব্লু জোন দিয়ে। শেষও করব তা দিয়ে। উল্লিখিত পাঁচটি জোনের অধিবাসীরা হেঁটেই ১০০ বছর পার করছেন। একইসঙ্গে ওইসব শহরের পরিবেশ বেশ নির্মল। বিদ্যালয়ে ক্লাস শুরুর আগে শিশুদের ব্যায়াম করতে উৎসাহ দেওয়া হয়। সড়কে হাঁটাহাঁটি ও সাইকেল চালানোর সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। দুপুরের খাবারের পর কর্মীরা যেন হাঁটতে পারেন, সে নিয়ম চালু করা হয়েছে। এ নিয়ম যারা মেনে চলেন, তাদের জন্য প্রতিষ্ঠানের তরফ থকে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। রেস্টুরেন্টগুলোয় তুলনামূলক বেশি শাকসবজি ও ফল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে নাগরিকরা অসুস্থতায় কম ভুগেন। আর একজন নিরোগ ব্যক্তিই তো শতায়ু হবেন।

রতন কুমার দাস

 

 

 

সর্বশেষ..