দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

শব্দদূষণ ও প্রতিকারে করণীয়

মো. রাকিবুল ইসলাম: মানুষের সুস্বাস্থ্য ও সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য নিরিবিলি পরিবেশকে একটি মৌলিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বব্যাপী শব্দদূষণ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় রকমের হুমকি। আমাদের স্বাস্থ্য চারপাশের পরিবেশ দ্বারা খুব প্রবলভাবে প্রভাবিত হয়ে থাকে, আর শব্দ আমাদের এই পরিবেশের অন্যতম প্রধান উপাদান।

সাম্প্রতিককালে গবেষণায় দেখা যায়, শব্দদূষণ নীরবে শিশুদের মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি, শ্রবণশক্তি হ্রাস, উচ্চরক্তচাপসহ মারাত্মক কিছু ক্ষতিকর রোগের প্রধান কারণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, শব্দদূষণ হচ্ছে শব্দের এমন একটি অবস্থা, যা সাধারণ শব্দের স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে অধিক মাত্রায় একটি নির্দিষ্ট সময়ব্যাপী মানুষ অথবা অন্য প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনকে খারাপভাবে প্রভাবিত করে। সংস্থাটির মতে, শব্দদূষণের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা হচ্ছে ৭০ ডেসিবেল (এটা নির্ভর করবে মানুষ অথবা অন্য প্রাণী ঠিক কতক্ষণ ওই শব্দের কাছে ছিল)। টানা আট ঘণ্টা প্রতিদিন ৮৫ ডেসিবেল শব্দের কাছাকাছি থাকা কারও জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর, যার মাধ্যমে সে ট্রাফিক শব্দদূষণের কবলে পড়বে।

একটি সরকারি জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরে শব্দদূষণের মাত্রা গ্রহণযোগ্য সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে, কোথাও কোথাও তা দ্বিগুণ বা তিনগুণ।

‘শব্দদূষণ ব্যাবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০৬’ অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় দিনে সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত শব্দের গ্রহণযোগ্য স্বাভাবিক মাত্রা ৫৫ ডেসিবেল ও রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত ৪৫ ডেসিবেল, নির্জন এলাকায় দিনের বেলা ৫০ ডেসিবেল ও রাতে ৪০ ডেসিবেল, কোলাহলপূর্ণ এলাকায় দিনে ৬০ ডেসিবেল ও রাতে ৫০ ডেসিবেল, বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ ডেসিবেল ও রাতে ৬০ ডেসিবেল এবং শিল্পকারখানা এলাকায় দিনে ৭৫ ডেসিবেল ও রাতে ৭০ ডেসিবেল।

শব্দদূষণের প্রধান কারণ

আবাসিক এলাকায় বিভিন্নভাবে শব্দদূষণ হয়। যেমনÑএক. রাস্তায় চলাচলরত বাস, ট্রাক, লড়ি, অ্যাম্বুলেন্স কর্তৃক উচ্চশব্দে বাজানো হর্ন থেকে সৃষ্ট শব্দ; দুই. নির্মাণকাজে ব্যবহƒত ভারী যন্ত্রপাতি থেকে সৃষ্ট উচ্চশব্দ; তিন. বিমানবন্দরে বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় সৃষ্ট উচ্চশব্দ; চার. কর্মস্থলে উচ্চশব্দ তৈরি হলে; পাঁচ. বিরতিহীনভাবে মাইক, বক্স, লাউড স্পিকারে উচ্চশব্দে গানবাজনা থেকে সৃষ্ট শব্দ; ছয়. শিল্পকারখানার জেনারেটর, ফ্যান, কম্প্রেসর ও ভারী যন্ত্রপাতি থেকে সৃষ্ট উচ্চশব্দ, সাত. রেলস্টেশনে সৃষ্ট উচ্চশব্দ; আট. বাসাবাড়ির টেলিভিশন ও কম্পিউটারে উচ্চশব্দে গান শোনা এবং ফ্যান, কুলার, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ও ওয়াশিং মেশিন থেকে সৃষ্ট শব্দ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শব্দদূষণ একটি নীরব ঘাতক। এটা শারীরিক ও মানসিক উভয় ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে থাকে। গুটেনবাগ হেলথ স্টাডি (জিএইচএস) ৩৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সি ১৫ হাজার মানুষের ভেতর শব্দদূষণের ওপর একটি গবেষণা করেছে। এই গবেষণাটি  ট্রাফিক, বিমানবন্দর, রেলওয়ে ও কলকারাখানার আশেপাশে বসবাসরত মানুষদের ভেতর রাতে ও দিনে করা হয়েছিল। এই গবেষণায় দেখা যায়, মানুষের ভেতর হতাশা ও দুশ্চিন্তা শব্দদূষণের দ্বারা প্রবলভাবে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। গবেষণায় আরও দেখা যায়, বিমানবন্দর এলাকায় বিমানের শব্দের কারণে ৬০ ভাগ মানুষ হতাশা ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। সর্বোপরি এটা বলা যায়, শব্দদূষণ মানুষের সুস্বাস্থ্য ও সুন্দর জীবনকে বাধাগ্রস্ত করে।

হƒদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে শব্দদূষণের খুব ভালো রকমের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া গেছে। ইন্ডিয়ান সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ডের (সিপিসিবি) তথ্যমতে (২০১৬) শব্দের উচ্চমাত্রা হƒদযন্ত্রের ক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে এবং রক্তচাপকে বৃদ্ধি করে।

নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, ট্রাফিক শব্দদূষণের ফলে ইউরোপে প্রতিবছর প্রায় দুই লাখ ১০ হাজার মানুষ মারা যায়।

সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্টের ২০০৭ সালের এক প্রকাশনায় বলা হয়েছে,  হƒদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত নারীদের ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে শব্দদূষণের কারণে। শব্দদূষণ হƒদরোগে আক্রান্ত মহিলাদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

ধ্বনিতত্ত্ব বিভাগের সহকারী প্রফেসর ড. ইয়ন কিংয়ের মতে, শিশুদের ওপর শব্দের প্রভাব বিবেচনা করে গবেষণায় দেখা গেছে, এটি তাদের পড়াশোনায় মনোযোগের ব্যাঘাত সৃষ্টি, বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ব্যর্থতা, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া প্রভৃতি সমস্যা সৃষ্টি করে।

স্মৃতিভ্রংশ রোগ মূলত শব্দদূষণ দ্বারা সৃষ্ট নয়, তবে এর সূচনার জন্য শব্দদূষণ একটি অনুকূল পরিবেশ প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

মানসিক ভারসাম্যহীনতা: শব্দদূষণ মানুষের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধার সৃষ্টি করে এবং এটা খুব দ্রুত মানুষকে ভারসাম্যহীন করে ফেলে।

শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার জন্য শব্দদূষণকে সরাসরি দায়ী করা হয়ে থাকে; যেমন হেডফোন লাগিয়ে উচ্চশব্দে গান শোনা বা কর্মস্থলে ড্রিলিংয়ের তীব্র শব্দ, শোরগোলের শব্দ, খুব ভারী বাতাস, অধিক যানজটপ্রবণ এলাকায় অবস্থান, অথবা অন্য যে কোনো কারণে শব্দের মাত্রা বিপদসীমায় পৌঁছানোর মতো কোনো ঘটনা প্রভৃতি। এর মাত্রা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১৪০ ডেসিবেল এবং শিশুদেরজন্য ১২০ ডেসিবেল।

সাধারণত আবাসিক এলাকা যদি যানবাহনের গমনাগমনস্থলে হয়ে থাকে, তাহলে রাতের বাতাসে শব্দের তীব্রতার মাত্রা গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি থাকায় ঘুমে ব্যাঘাত হয়।

ড. ইয়ন কিংয়ের মতে, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে এর উৎসকে নিয়ন্ত্রণ করা। আমরা যদি শব্দহীন ট্রেন, বাস ও বিমানে চলাচল করতে পারতাম, তবেই এই সমস্যার বেশিরভাগ সমাধান হয়ে যেত।

এই সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের জন্য এর উৎসমূলে যেতে হবে। শব্দদূষণের প্রধান উৎসগুলো থেকে শব্দের তীব্রতা কমাতে পারলেই অকাল মৃত্যু হ্রাস এবং শহরের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার উন্নতি ঘটবে।

বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত শহর হিসেবে বিবেচিত মুম্বাই তার রেকর্ড ১১০ ডেসিবেল শব্দের মাত্রা কমিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় গাড়িচালকদের টার্গেট করেছে। ২০১৬ সাল থেকে এ অবস্থার খুব দ্রতই উন্নতি ঘটছে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও জরিমানার মতো সরকারি ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে। এছাড়া ২০১৭ সাল থেকে মহারাষ্ট্র মোটর যানবাহন বিভাগের আঞ্চলিক পরিবহন অফিসগুলো শব্দদূষণের বিপদ সম্পর্কে সচেতেনতা বাড়াতে ১৫ দিনব্যাপী প্রচারভিযান করেছে।

২০১৫ সালে প্যারিসেও শব্দদূষণের বিরুদ্ধে কড়াকড়ি আরোপ করা হয় এবং একটি গাড়ি-মুক্তদিবস কার্যকর করা হয়। রাজধানী শহরের ৩০ শতাংশ গাড়ি চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় দেখা যায়, বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। এটি মেয়র অফিসকে আরও যানবাহনমুক্ত দিবস পরিকল্পনা তৈরি করতে উৎসাহিত করেছিল, যা কেবল শব্দদূষণকেই কমায়নি, সেইসঙ্গে বায়ুদূষণও কমিয়ে দেয়।

২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার রাজধানীতে সচিবালয় এলাকাকে নো হর্ন জোন ঘোষণা করেছে। এতে ওই এলাকায় প্রথম দিনে ড্রাইভারদের অসচেতনতার কারণে সুফল না এলেও কর্তৃপক্ষ আশাবাদী।

প্রচলিত যানবাহনের চলাচল সীমিত করার জন্য পরিবহনের বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে হালকা রেল ব্যবস্থা এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি ও কম মাত্রার শব্দদূষণের বাস সার্ভিস চালু করলে এ অবস্থার উন্নতি হবে। গাড়ির গতিসীমা কমালেও ভালো ফল পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগে মাঝেমধ্যেই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বিচারের ব্যবস্থা নিতে হবে। 

গবেষণায় প্রমাণিত যে, শহরগুলোয় গাছ লাগিয়ে সবুজায়নের ফলে বায়ুস্তরের উন্নতি ঘটে এবং মানসিক স্বাস্থ্যেরও উন্নতি ঘটে। ব্যস্ত শহরগুলোয় শব্দদূষণের বিরুদ্ধে এটি একটি কার্যকর উপায়, কারণ গাছগুলো শব্দ শোষণ করে এবং রাস্তা ও আবাসিক অঞ্চলের মধ্যে বাফার অঞ্চল তৈরি করতে পারে।

শব্দদূষণ প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকারের ২০০৬ সালের প্রণীত আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি যদি গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি শব্দদূষণ সৃষ্টি করে, তাহলে তাকে প্রথমবার অপরাধের জন্য সর্বনি¤œ অনধিক এক মাস কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত এবং পরবর্তী অপরাধের জন্য সর্বনি¤œ অনধিক ছয় মাস কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার আইনটি যুগোপযোগী করে প্রয়োগ করতে পারলে আশা করা যায় সুফল পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশে প্রতিটি শহরের নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আবাসিক অঞ্চল ও শিল্পাঞ্চলকে আলাদা করে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে, তারপরও সবাই মাস্টার প্ল্যান মানছে না। ফলে আবাসিক এলাকায় শিল্পকারখানা নির্মিত হওয়ায় সাধারণ বাসিন্দাদের শান্তি বিঘিœত হচ্ছে। এসব অনিয়ম পরিবর্তনের জন্য নীতিনির্ধারকদের মাস্টার প্ল্যান অনুসরণ করতে উৎসাহিত করতে এবং প্রয়োজনে বাধ্য করতে হবে। আবাসিক এলাকার শিল্পকারখানার জন্য শব্দনিরোধক ব্যবস্থা বিকল্প সমাধান হতে পারে।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে করণীয়

ক. শব্দমাত্রা অধিক যেখানে, সেখানে ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার করা। খ. রাতে শোবার ঘরে শব্দের তীব্রতা প্রায় ৩৫ ডেসিবেল এবং দিনের বেলা তা ৪০ ডেসিবেলে বজায় রাখা। গ. আবাসিক এলাকা যতটা সম্ভব শিল্প, ট্রাফিক ও বিমানবন্দর এলাকা থেকে দূরে নির্মাণ করা। ঘ. এয়ারফোনগুলোর দীর্ঘায়িত ব্যবহার এড়িয়ে চলা এবং সবসময় উচ্চশব্দ পরিত্যাগ করা। ঙ. উচ্চশব্দযুক্ত এলাকা এড়িয়ে চলা।

শিক্ষার্থী

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..