মত-বিশ্লেষণ

শহীদ কমরেড তাজুল ইসলাম: বীরের মৃত্যু নেই

শফি আহমেদ: সময়টা ১৯৮৪ সাল। ওই বছর লিপইয়ার ছিল ফেব্রুয়ারি মাস ছিল ২৯ দিনের। ওইদিন স্বৈরশাসকের কর্মীদের ছুরিকাঘাতে মারাত্মক আহত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তাজুল ইসলাম। ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ মার্চ নিহত হন তিনি। তাই ১ মার্চকেই ‘তাজুল দিবস’ হিসেবে পালন করেন তার সহযোদ্ধারা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর কালো বুটের পদপিষ্টে বাংলাদেশ। সামরিক শাসনের জাঁতাকলে আটকে যায় বাংলাদেশ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রতিবাদ হয়েছে, কিন্তু তীব্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। সামরিক শাসনের ধারাবাহিকতায় হত্যা ও ক্যুর মাধ্যমে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে সামরিক শাসন জারি করেন ও নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ঘোষণা করেন ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ। ১৯৮৩ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারিতে অপ্রতিরোধ্য ছাত্র আন্দোলনে শহীদ হন দীপালি সাহা, মোজাম্মেল, কাঞ্চন, আইয়ুবসহ অসংখ্য কর্মী। রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয় বুলেট ও বেয়নেটে। এরশাদ ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে উপজেলা পরিষদের কাঠামো তৈরি করে নির্বাচনের ঘোষণা দেন। তত দিনে দেশের রাজনীতির হাল ধরেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ১৫ দলীয় রাজনৈতিক জোট, ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ, শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) ও অন্যান্য পেশাজীবী ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে। স্কপের ধর্মঘটের সমর্থনে দেশের কলকারখানা ও শিল্পাঞ্চল প্রস্তুত ছিল। দেশের সর্ববৃহৎ পাটকল ‘আদমজী’তে ধর্মঘট প্রস্তুতির মিছিলে হামলা চালিয়ে এরশাদের মদদপুষ্ট ছায়াদুল্লাহ সাদুর গুণ্ডাবাহিনী ছুরিকাহত করে শ্রমিকনেতা তাজুল ইসলামকে।

একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধে তাজুল ন্যাপ, ছাত্র ইউনিয়ন ও কমিউনিস্ট পার্টির যৌথ গেরিলা বাহিনীতে যোগদান করেন। যুদ্ধ শেষে ৯ মাস পর তিনি দেশে ফিরে আসেন। মুশতারী শফীর বই ‘স্বাধীনতা আমার রক্তঝরা দিনগুলো’তে পড়েছি আগরতলায় ক্রাফটস হোস্টেলে কীভাবে তার ছেলেমেয়েদের প্রিয় মামা হয়ে উঠেছিলেন তাজুল।

জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ যেমন ‘শঙ্খনীল কারাগার’ নির্মাণ করে চমকে দিয়েছিলেন একদিন, তেমনি তাজুলও চমকে দিয়েছিলেন একদিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে লেখাপড়া করা, ছাত্র ইউনিয়নের অগ্রসর কেন্দ্রীয় নেতা তাজুল  আদমজীতে শ্রমিক  হয়েছিলেন শ্রমিক আন্দোলনের স্বার্থে।

তাজুলের শৈশবকে হত্যা করেছে আমাদের বৈষম্যপীড়িত সমাজ। কঠিন শ্রমের একধরনের দাসজীবন ছিল তার। তৃণমূলের সেই তাজুল ১৯৮৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি গগনে উদ্ভাসিত হলো। কঠিন প্রতিকূল অবস্থায় তাজুলের স্ত্রী নাসিমা ইসলাম ও তাজুলের দুটি সন্তান জীবনসংসারে নিয়ত যুদ্ধরত। তাজুলের হত্যাকারীর বিচার হয়নি। তাজুল হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত তদন্ত করা হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি হতে পারতেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। মানুষের জন্য এ ব্যক্তিগত ত্যাগের আর কয়টা উদাহরণ আছে? শহীদ কমরেড তাজুল ইসলামÑবীরের মৃত্যু হয় না।

লেখক: স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতা

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..