মত-বিশ্লেষণ

শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল

রেজাউল করিম সিদ্দিকী: ২০১৮ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সব যোগ্যতা অর্জন করেছে। বর্তমানে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় প্রায় দুই হাজার মার্কিন ডলার, যা ২০০৬ সালে ছিল মাত্র ৫১০ মার্কিন ডলার। শিক্ষার হার বৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশনসহ উন্নয়নের সব সূচকে সাম্প্রতিককালে দেশ এগিয়েছে অনেক দূর। সেইসঙ্গে বেড়েছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও আর্থিক সক্ষমতা। ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের ফলে দ্রুত ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা হয়ে পড়েছে অপরিহার্য। সড়কপথে যোগাযোগের জন্য রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, নতুন রাস্তা, ব্রিজ, কালভার্ট নির্মাণের ফলে যাতায়াত হয়েছে আগের তুলনায় অনেক সহজ ও দ্রুত। নগরে যানজটের ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে সংযোজন করা হচ্ছে মেট্রোরেল। ঢাকার চারদিকে বৃত্তাকার নৌপথ গড়ে তোলার পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে সরকার।

আধুনিক যোগাযোগের দ্রুততম মাধ্যম আকাশপথ। যথেষ্ট ব্যয়বহুল হওয়া সত্ত্বেও এ মাধ্যম সামর্থ্যবানদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়। উপরন্তু দেশের মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের ফলে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে আকাশপথে ভ্রমণকারী যাত্রীর সংখ্যা গত কয়েক বছরে বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ। কিন্তু চাহিদার তুলনায় বিমান ও বিমানবন্দরের সুযোগ-সুবিধা অপ্রতুল হওয়ায় এক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে ছিল দেশ। বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার ঢাকার অদূরে পদ্মা সেতু-সংলগ্ন স্থানে নতুন একটি আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর স্থাপনের পরিকল্পনা হাতে নেয়। নতুন বিমানবন্দর স্থাপনের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ, ভূমি উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণসহ পূর্তকর্ম যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ। আকাশপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে দ্রুত ও মানসম্মত সেবা প্রদানে তাই আশু পদক্ষেপ হিসেবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আধুনিকায়নে মনোনিবেশ করে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় বিমানবন্দরটিতে বিদ্যমান দুটি টার্মিনালের পাশাপাশি নির্মাণ করা হচ্ছে তৃতীয় টার্মিনাল এবং সেইসঙ্গে পদ্মা সেতুর কাছে প্রস্তাবিত বিমানবন্দরটিও যথাসময়ে নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার। যুগপৎভাবে দুটি কার্যক্রম যথাসময়ে বাস্তবায়িত হলে দেশে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সেবার মান যেমন বৃদ্ধি পাবে, একইভাবে বৃদ্ধি পাবে পরিবহনের সংখ্যা।

১৯৮০ সালে চালু হওয়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বর্তমানে বছরে প্রায় ৯০ হাজার উড়োজাহাজ ওঠানামা করে। বছরে ৮০ লাখ যাত্রী ধারণক্ষমতার দুটি টার্মিনাল দিচ্ছে সক্ষমতার অতিরিক্ত সেবা। প্রতি বছর আট শতাংশ হারে যাত্রী বাড়লেও সে অনুপাতে বাড়েনি সুবিধা। ২০১৩ সালে নেওয়া হয় তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের প্রকল্প। গত বছর ২৮ ডিসেম্বর শনিবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাশাপাশি ‘সোনার তরী ও অচিন পাখি’ নামে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দুটি নতুন ড্রিমলাইনার্স এয়ারক্রাফট বোয়িং ৭৮৭-৯ এবং বিমানের একটি নতুন মোবাইল অ্যাপও উদ্বোধন করেন শেখ হাসিনা।

তৃতীয় টার্মিনাল নির্মিত হওয়ার পর এটি হবে এ অঞ্চলের মধ্যে সর্বাধুনিক বিমানবন্দর। এটি নির্মিত হলে বছরে আরও অতিরিক্ত এক কোটি ২০ লাখ যাত্রী চলাচল করতে পারবে। তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণে ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এর মধ্যে সরকারি কোষাগার থেকে পাওয়া যাবে পাঁচ হাজার কোটি টাকা এবং বাকি অর্থ জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) থেকে পাওয়া যাবে। একটি একক নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরের মাধ্যমে নতুন টার্মিনালটির সব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা সম্ভব হবে। সরকার নতুন টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং টাস্কের জন্য একটি দক্ষ কোম্পানি মনোনীত করতে দরপত্র উম্মুক্ত করে দেবে। এ প্রকল্পে নতুন ভিআইপি টার্মিনাল নির্মাণেরও ব্যবস্থা রয়েছে। নতুন আন্তর্জাতিক যাত্রী টার্মিনালটি হবে ২২ দশমিক পাঁচ লাখ বর্গফুট। বর্তমানে দুটি টার্মিনালে স্পেস রয়েছে ১০ লাখ বর্গফুট। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিমানবন্দরের বর্তমান যাত্রী ধারণক্ষমতা ৮০ লাখ থেকে বেড়ে দুই কোটি এবং কার্গোর ধারণক্ষমতা বর্তমান দুই লাখ টন থেকে বেড়ে হবে পাঁচ লাখ টন হবে।

বর্তমান ভিভিআইপি টার্মিনালের পূর্ব পাশে দুই লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার জমির ওপর তৈরি হবে এটি। পদ্মফুলের আদলে এ টার্মিনালে থাকবে ১২টি বোর্ডিং ব্রিজ, ১৬টি লাগেজ বেল্ট, দুটি র‌্যাপিড এক্সিট ট্যাক্সিওয়ে, ৩৫টি উড়োজাহাজ রাখার পার্কিং বে, বহুতল কার পার্কিং, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাসহ আন্তর্জাতিক মানের সব সুবিধা; থাকবে আমদানি ও রপ্তানির পৃথক কার্গো ভিলেজ। আর পুরো টার্মিনাল পরিচালিত হবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। বিমানবন্দরটি সড়কের পাশাপাশি উড়াল সেতু ও ভূগর্ভস্থ সংযোগ সড়কের মাধ্যমে যুক্ত হবে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও মেট্রোরেলের সঙ্গে।

২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে নির্বাচনী ইশতেহারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন দিন বদলের সনদ ‘ভিশন-২০২১’। ভিশন-২০২১-এর লক্ষ্যমাত্রা, এসডিজি ও সর্বোপরি শতবর্ষব্যাপী বদ্বীপ পরিকল্পনা বা ডেলটা প্ল্যান-২১০০ বাস্তবায়নে সহজ, সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও দ্রুত যাতায়াতব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকার তাই বহুমুখী পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে নির্মাণ করা হচ্ছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল। টার্মিনালটির কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হলে দেশ-বিদেশের যাত্রীরা আন্তর্জাতিক মানের সেবা পাবেন। একই সঙ্গে জল, স্থল ও আকাশপথে সহজ, নিরাপদ, দ্রুত ও কার্যকর যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি হবে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে। সেইসঙ্গে দেশ অতিক্রম করবে উন্নয়নের আরও একটি মাইলফলক।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..