নিজস্ব প্রতিবেদক : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কাস্টমসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী, সিঅ্যান্ডএফ (ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোওয়ার্ডিং) এজেন্ট ও বিমানের কিছু অসাধু কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ যোগসাজশে আমদানিকৃত পণ্য খালাসে বিপুল অঙ্কের শুল্ক ফাঁকি, চোরাচালান ও মূল্যবান পণ্য চুরির একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থার পর্যবেক্ষণে সম্প্রতি এসব তথ্য সামনে আসে। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে অবিলম্বে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চক্রের সদস্যরা শুল্ক ফাঁকি দিতে জাল কাগজপত্র তৈরি করে কৌশলে পণ্য খালাস করছে। মিথ্যা ঘোষণায় আনা পণ্য শনাক্ত হলেও আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে ঘুষের বিনিময়ে পণ্য ছাড়ের বিকল্প পথ বাতলে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
গত বছরের ডিসেম্বর ও চলতি বছরের জানুয়ারিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো পৃথক দুটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বিমানবন্দরে পণ্য চুরি ও শুল্ক ফাঁকির তিনটি সুনির্দিষ্ট ঘটনা উল্লেখ করা হয়। আমদানি-সংক্রান্ত কাগজপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে কীভাবে পণ্য খালাস নেওয়া হয়েছে এবং এতে কোন পর্যায়ের কর্মকর্তা জড়িতÑতার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদন বলছে, গত বছরের ১৭, ২৩ ও ২৪ নভেম্বর চীন থেকে তিয়ানজিন এয়ার কার্গো ও এসএফ এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে ৪ হাজার ২৩৭ কেজি কাপড় আমদানি করে এইচবিএস অ্যাপারেলস নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এসব পণ্য যথাক্রমে ২৭ নভেম্বর ও ৭ ডিসেম্বর খালাস করা হয়। অথচ এক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী কোনো বিল অব এন্ট্রি দাখিল ও কাস্টমস শুল্কায়ন করা হয়নি।
নিয়মানুযায়ী আমদানি কার্গোর ডেলিভারি গেটে সংরক্ষিত রেজিস্টারে ছাড়কৃত পণ্যের এয়ার ওয়েবিল নম্বর ও বিল অব এন্ট্রি নম্বর উল্লেখ থাকার কথা। কিন্তু আলোচ্য ঘটনায় এয়ার ওয়েবিল নম্বর থাকলেও বিল অব এন্ট্রির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বিমানের এয়ার ওয়েবিল শাখায় অনুসন্ধানে জানা যায়, ৫ ও ২৭ ডিসেম্বর বারি এন্টারপ্রাইজ ও আল ইতিহাদ নামের দুই সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের চার কর্মচারীÑআবু তালেব, রাকিবুল, জুনায়েদ ও আসিফÑওয়েবিল উত্তোলন করেন। তবে আল ইতিহাদ নামে কোনো বৈধ সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব মেলেনি।
গোয়েন্দা সংস্থা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, উল্লিখিত পণ্য তারা আমদানি করেনি। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে পণ্য আমদানি ও খালাস করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আমদানি কার্গো ও কাস্টমসের শুল্কায়ন প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই পণ্য খালাস হওয়া থেকে প্রতীয়মান হয়Ñকোনো নথি ও শুল্কায়ন ছাড়াই বিদেশ থেকে পণ্য দেশে প্রবেশ করানো সম্ভব। এতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। পণ্যের আড়ালে বিস্ফোরক, অস্ত্র, মাদক বা নিষিদ্ধদ্রব্য দেশে প্রবেশের আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
নিয়ম-বহির্ভূতভাবে পণ্য খালাস ও ভুয়া কাগজপত্র তৈরিতে বিমানের কমার্শিয়াল সুপারভাইজার কাজী মোহাম্মদ শাহজালাল ও মন্তাছার রহমানের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন একই সেকশনে কর্মরত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে ডিউটি রোস্টার বাণিজ্য, আধিপত্য বিস্তার ও নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে পণ্য খালাসে জড়িত হিসেবে আরও যাদের নাম এসেছে তারা হলেনÑজুনিয়র কমার্শিয়াল অফিসার আবুল কালাম (এয়ার ওয়েবিল প্রদান), অ্যাসিস্ট্যান্ট কমার্শিয়াল ম্যানেজার রফিকুল আলম (ভুল এক্সিট নম্বর প্রদান), অ্যাসিস্ট্যান্ট কমার্শিয়াল ম্যানেজার এবাদত হোসেন (মালামাল চেকিং দায়িত্বে), জুনিয়র সিকিউরিটি অফিসার বেনজীর আহম্মেদ (৮ আলফা গেটে দায়িত্বরত), কার্গো হেলপার শাহাদাত হোসেন, নিরাপত্তা তত্ত্বাবধায়ক ফিরোজ ইফতেখার, কার্গো হেলপার শাহীন শেখ, শাওন আহম্মেদ রাজু এবং কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শামীম আহম্মেদ ও রাগিব হোসাইন।প্রতিবেদনে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেÑবিল অব এন্ট্রি ছাড়া কোনো অবস্থাতেই ক্লিয়ারিং রিসিপ্ট (সিআর) প্রদান না করা, সিআর ম্যানুয়ালি না দিয়ে সেন্ট্রাল সার্ভারের মাধ্যমে প্রদান এবং পণ্য খালাসে বারকোড বা কিউআর কোডভিত্তিক অটোমেটেড সিস্টেম চালু করা।
অন্যদিকে কাস্টমসকে ম্যানেজ করে শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই গ্রিন চ্যানেল অতিক্রমের পৃথক তিনটি ঘটনার কথাও আরেক গোয়েন্দা সংস্থা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও এনবিআরকে জানিয়েছে।
গত ১০ নভেম্বর ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে কাতার থেকে আগত এক যাত্রী ৯৫ কেজি মালামাল নিয়ে আসেন। প্রথম দফায় ২৩ কেজি পণ্যের বিপরীতে ১০ হাজার ৭৮৫ টাকা শুল্ক আদায় করে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে গোয়েন্দা সংস্থার হস্তক্ষেপে পুনরায় ইনভেন্ট্রিতে পাঠানো হলে আরও ২৫ কেজির বিপরীতে ১৫ হাজার ৮০৯ টাকা শুল্ক আদায় করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মিথুন ভৌমিক এ কাজে সহযোগিতা করেন।
একই দিনে দুবাই থেকে আসা নূর হোসেন ও আকবর হোসেন নামের দুই যাত্রী গ্রিন চ্যানেল অতিক্রমের সময় আটক হন। সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন নূর হোসেনের ১২ কেজি পারফিউমের জন্য ৩৩ হাজার ৪৪০ টাকা এবং আকবর হোসেনের ১০ কেজি পারফিউমের জন্য ১৮ হাজার ৫৭৯ টাকা শুল্ক ধার্য করেন। একই পণ্যে ব্যক্তিভেদে শুল্কের বড় ধরনের তারতম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত বছরের ৩০ নভেম্বর দুবাই থেকে আগত আবু সুফিয়ান ও রায়হান আহমেদের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। প্রথমে অল্প কিছু সিগারেট জব্দ করে ছেড়ে দেওয়া হলেও পুনরায় তল্লাশিতে বিপুল পরিমাণ সিগারেট, কসমেটিকস ও আমদানি নিষিদ্ধ গৌরি ক্রিম উদ্ধার হয়। পরে নিষিদ্ধ পণ্য জব্দ করে বাকি পণ্যে শুল্ক আদায় করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা কাস্টমস কমিশনার মশিউর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করে অপরাধীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি ও নিয়মিত ডিউটি রোস্টার পরিবর্তন করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post