সম্পাদকীয়

শিক্ষকতার মর্যাদা রক্ষায়আত্ম-উপলব্ধি প্রয়োজন

কভিড মহামারির শুরুতে গত বছরের মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। তবে প্রশাসনিক কাজ কমলেও থেমে নেই দুর্নীতি। অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে খোদ রাজধানীর অন্তত ১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারি তদন্ত চলছে। এর মধ্যে নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে।

গতকাল একটি জাতীয় দৈনিকে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, দুর্নীতির অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ছুটির মধ্যে বিভিন্ন পদে নিয়োগে অনিয়ম, নিয়োগ পরীক্ষার খাতায় টেম্পারিং বা ঘষামাজা, আর্থিক অনিয়ম, জমি কেনায় অপচয় বা আত্মসাৎ, নিয়ম ভেঙে শিক্ষার্থী ভর্তি, প্রতিষ্ঠানের দোকান বরাদ্দে স্বার্থসিদ্ধি প্রভৃতি।

দুর্নীতি এখন সর্বগ্রাসী। কিছুটা হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়ম-দুর্নীতি অপেক্ষাকৃতভাবে কম থাকবে, এটিই প্রত্যাশিত। অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির দায়ে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত মূল ব্যক্তি অধ্যক্ষ অথবা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি।

বিভিন্নভাবে পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তদন্ত করছে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। এ প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, তদন্ত শেষ হওয়া একাধিক প্রতিষ্ঠানে গুরুতর কিছু অনিয়ম ধরা পড়েছে। তারা কেবল তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান। ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ার মন্ত্রণালয়ের।

এর আগে ২ মার্চ আরেকটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়Ñ‘১০ উপাচার্যের অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে ইউজিসি’। তাতে বলা হয়, ১৩টি স্বায়ত্তশাসিত এবং সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করছে ইউজিসি। এর মধ্যে ১০ জন বর্তমান ও সাবেক উপাচার্যের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। শিক্ষার্থীদের কাছে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হলেন শিক্ষকÑতা প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় হোক; যা-ই হোক না কেন। আগে শিক্ষকরা সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তি ছিলেন, এখন এটি আর দশটি পেশার মতো নিছক চাকরি। অভিযোগ উঠলেই তারা দোষী সাব্যস্ত হচ্ছেন, সেটি নয়; কিন্তু শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার বিষয়টি আমাদের নৈতিক দীনতাকেই তুলে ধরে। সবচেয়ে বড় কথাÑআখের গোছানোর প্রতিযোগিতায় তারাও অবতীর্ণ  হচ্ছেন সমানতালে। আমরা মনে করি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্নীতিরোধে সরকার কোনো ছাড় দেবে না। দুর্নীতি কঠোরহাতে দমন করতে হবে।

দুর্নীতিবাজরাই সমাজ ও দেশের উন্নয়নে বড় বাধা। শিক্ষায় দুর্নীতি হলে দেশ ও জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে। এখন শিক্ষকদের দুর্নীতি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের বাইরে কোচিং ও প্রাইভেট পড়ানো, নির্বাচনী পরীক্ষায় ফেল করলে আবার পরীক্ষা নিয়ে পাস দেখানো, পরীক্ষার ফরম পূরণে বোর্ড-নির্ধারিত ফি থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এসব এখন ছোটখাটো অপরাধে পরিণত হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সততা স্টোর, মানবতার দেয়াল প্রভৃতি দিয়ে শিশুদের দুর্নীতিরোধী মানসিকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। অথচ শিক্ষকরা নিজেরাই দুর্নীতি-অনিয়মে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করতে হলে শিক্ষকদেরই আগে ‘মানুষ’ হতে হবে। কেননা তারা নিজেদের মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে দাবি করেন। কতটা মনুষ্যত্ব তারা ধারণ করেন, সে আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। শিক্ষকদের বিচার করতে হবে, এটি বলতে আমরা সংকোচ বোধ করি। শিক্ষকতার মহান পেশার মর্যাদা রক্ষায় তারা তারা সচেতন হবেন, এটিই প্রত্যাশা।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..