প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

শিক্ষকের বেতন-মর্যাদা ও রাষ্ট্রের সুদৃষ্টি

গৌতম রায়: বেশ কিছুদিন আগে মন্ত্রিপরিষদের এক সভায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের ‘মর্যাদা’ তৃতীয় শ্রেণি থেকে উন্নীত করে দ্বিতীয় শ্রেণিতে আনা হয়। যদিও প্রধান শিক্ষকদের দাবি ছিল প্রথম শ্রেণির, কিন্তু নানা বিচারে সেটি করা হয়নি। জানা গেছে, এসব বিচার্যের একটি ছিল প্রধান শিক্ষকদের অবস্থান প্রথম শ্রেণিতে আনা হলে উপজেলা শিক্ষা অফিসারদের মর্যাদা ও প্রধান শিক্ষকের মর্যাদা একই হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে।

বাংলাদেশে শিক্ষকদের অবস্থান, মর্যাদা ও বেতন নিয়ে নতুন করে বর্ণনা দেওয়ার কিছু নেই। কারণ এগুলো প্রায় সবারই জানা। সামাজিক বিচারে শিক্ষকদের সম্মানের চোখে দেখা হয়; কিন্তু রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক মর্যাদার বিচারে শিক্ষকরা প্রথম সারিতে তো নেই-ই, বরং দ্বিতীয় শ্রেণির পরে তাদের অবস্থান। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা নানা কারণে তাও অনেকটা গুরুত্ব পান, কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সে তুলনায় অনেকটা উপেক্ষিত। অথচ একটি রাষ্ট্রের শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক ভিত গড়ে তোলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তারা সে কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন না করতে পারলে মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের ঠিকমতো গড়ে তুলতে পারবেন না। সুতরাং যে কোনো বিচারে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের গুরুত্ব ও মর্যাদা হওয়া উচিত সর্বাধিক। বলা প্রয়োজন, মাধ্যমিক বা কলেজ পর্যায়ের শিক্ষকদের অবস্থানও খুব একটা সুবিধার নয়।

বিশ্বে অনেক দেশ আছে, যেখানে শিক্ষকদের মর্যাদা সবার উপরে। জার্মানির উদাহরণই এখানে দেওয়া যেতে পারে। এ মর্যাদার বিষয়টি একদিকে যেমন সমাজ নির্ধারণ করে, তেমনি নির্ধারণ করে রাষ্ট্র। যারা শিক্ষা ও শিক্ষককে যত বেশি গুরুত্ব দেয়, তাদের উন্নতি তত দ্রুত হওয়ার সম্ভাবনা। তেমন প্রমাণও রয়েছে। এও সত্য, সমাজের কাছ থেকে মর্যাদা জোর করে বা বলেকয়ে আদায় করা যায় না; কাজের মাধ্যমেই তা আদায় করতে হয়। আমাদের দেশে একসময় শিক্ষকদের যে রকম শ্রদ্ধার আসনে দেখা হতোÑবর্তমান অবস্থা সে রকম নয়। এজন্য শিক্ষকরাও দায়ী। শ্রেণিকক্ষে না পড়ানো, ঠিকমতো ক্লাসে না আসা, প্রাইভেট পড়ানোর প্রতি অধিক মনোযোগী হওয়া, নানা ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িত হয়ে পড়া ইত্যাদি কারণে শিক্ষকরা তাদের আগের অবস্থান হারিয়েছেন। অধিকাংশ শিক্ষককে এ রকম অভিযোগে অভিযুক্ত করা যাবে না, তবে জনমানসে একবার খারাপ ইমেজ গড়ে উঠলে সেটি দূর করা কঠিন। তাছাড়া শিক্ষার্থীদের দরদ দিয়ে ও দক্ষতার সঙ্গে পড়ানোর বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। এখনকার শিক্ষকরা অনেক ধরনের প্রশিক্ষণ পান। সেসব প্রশিক্ষণ তাদের কতটুকু দক্ষ করতে পারছে, তাও প্রশ্নসাপেক্ষ। অথচ বিশ-ত্রিশ বছর আগের শিক্ষকরা এত প্রশিক্ষণ পেতেন না বা তারা হয়তো এতটা দক্ষও ছিলেন না; কিন্তু পড়ানোর প্রতি তাদের দরদ বা নিষ্ঠা নিয়ে খুব কমই প্রশ্ন তোলা যায়। সুতরাং শিক্ষকরা যে তাদের মর্যাদার অবস্থান হারিয়েছেন, এতে

শুধু রাষ্ট্রীয় বা শিক্ষাব্যবস্থার দায় দেখলে চলবে নাÑশিক্ষকদের নিজেদের ঘাটতিটুকুও বিচার্য।

সর্বশেষ পে-স্কেল ঘোষণার আগে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা তাদের মর্যাদা ও বেতন নিয়ে আন্দোলন করেছিলেন। সে সময় ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইন মিডিয়াতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে জনমানুষের যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, সেগুলো সুখকর ছিল না। মুষ্টিমেয় শিক্ষকের জন্য দায়ী হতে হয় সবাইকে; মুষ্টিমেয় শিক্ষকের কর্মকাণ্ডের দায়ভার নিতে হয় বাকি সবাইকে। এটা নির্মম সত্য।

শিক্ষকের মর্যাদা নিশ্চিত করতে তাই উদ্যোগ নিতে হতে হবে শিক্ষকদেরই। এটি অভ্যন্তরীণ চর্চার বিষয়। যেহেতু কোনো একটি সিস্টেম বা ব্যবস্থার পরিবর্তন হলে এর প্রভাব পড়ে অনেক দূর, তাই পরিবর্তনটুকু শিক্ষাব্যবস্থায় আনা হলে শিক্ষকের মর্যাদার বিষয়টি নিয়ে ত্বরিত কিছু কাজ করা সম্ভব হবে। উদাহরণস্বরূপ, রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষকদের মর্যাদার বিষয়টি নিশ্চিত করা। শিক্ষকদের রাষ্ট্র কোন অবস্থানে দেখতে চায়, তা রাষ্ট্রকেই পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করতে হবে। একজন শিক্ষককে যখন বেতন ও মর্যাদা নিয়ে চিন্তিত থাকতে হয়, তখন তার পক্ষে অর্পিত দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করা সম্ভব হয় না।

গত বছর সবার বেতন বেড়েছে। শিক্ষকদেরও। কিন্তু যেটুকু বেতন বেড়েছে, তা কি তাদের পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য যথেষ্ট? একজন শিক্ষককে যখন পরিবারের সদস্যদের রুটি-রুজির চিন্তা করতে হয়, তখন তিনি তো প্রাইভেট পড়ানোর কথা চিন্তা করবেনই। এ ধরনের অবস্থায় তাদের জোর করে প্রাইভেট পড়ানো থেকে বিরত রাখার উপায় বের করা হলে তারা অন্য কোনো উপায় বের করবেন। বিদ্যালয়ে পড়ানোর যাবতীয় ব্যবস্থা তখন পর্যন্ত পুরোপুরি কার্যকর হবে নাÑযতক্ষণ শিক্ষককে বেতনের দিক দিয়ে নির্ভার না করা যায়। সাম্প্রতিক পে-স্কেলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকরা বলার মতো বেতন পেলেও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন এখনও করুণ। সরকারের উচিত হবে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেওয়া। আমাদের শিক্ষকরা তাদের দাবিদাওয়া জানাতে গিয়ে ঢাকার রাজপথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নিগৃহীত হয়েছেন। এ রকম ঘটনায় শিক্ষকদের নিয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রকাশ পায়।

শিক্ষকতা পেশার মর্যাদার সঙ্গে জড়িত এ পেশায় কারা আসবেন, সে বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একসময় শোনা যেত, যারা কোনো কাজ পায় না তারা শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতা পেশায় যায়। সাংবাদিকতা পেশা এখন আধুনিক হয়েছে; বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীরা দক্ষ হয়ে সাংবাদিকতায় যাচ্ছেন। শিক্ষকতা পেশায় কি জোর দিয়ে সে কথা বলা যাবে? বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষকতা পেশা নিয়ে? অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ-যুবক ক্যারিয়ার শুরু করেন শিক্ষকতা দিয়ে, কিন্তু উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখতে না পেয়ে সেটি ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যান। দেশের বড় অংশ শিক্ষকদের ক্যারিয়ার শেষ হয় সহকারী শিক্ষক হিসেবে। ঠাট্টাচ্ছলে এক শিক্ষক একবার বলছিলেন, ‘আমি তো কোনোদিন শিক্ষকই হতে পারলাম না! সারা জীবন সহকারী থেকে গেলাম!’ এ কথায় কি শিক্ষকের বেদনা প্রকাশ পায় না? শিক্ষকদের তারা পেশার প্রতি নিষ্ঠাবান হিসেবে দেখতে হলে তাদের সেভাবেই গুরুত্ব দিতে হবে। পেটের ক্ষুধা নিবৃত্ত হলে মনের ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে হয়। বেতন-ভাতাদি বৃদ্ধির পাশাপাশি তাই সম্মান-মর্যাদার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বেতনের সঙ্গে যেহেতু অনেক বিষয় সম্পৃক্ত, তাই শিক্ষকদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদার সঙ্গে বেতনের বিষয়টিকে আলাদা করা প্রয়োজন। বেতন স্কেল কখনও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া উচিত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহকারী অধ্যাপক ষাট হাজার টাকার বেশি বেতন পান, অন্যদিকে অনেক এনজিও বা ব্যাংকে ছয় অঙ্কের বেশি বেতন পান এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। তাদের পারস্পরিক মর্যাদা কি বেতন দিয়ে নির্ধারণ করা উচিত? একেকজনের দক্ষতা একেক রকম, একেক সেক্টরে। যে যার সেক্টরে মর্যাদাবান। কিন্তু শিক্ষকদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদার বিষয়টি একটু ভিন্নভাবে দেখা প্রয়োজন। কারণ তারা দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলেন, মানুষের মধ্যকার মনুষ্যত্ব জাগিয়ে তুলতে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেন। অন্তত সে হিসেবে বিবেচনা করলেও শিক্ষকদের বেতন স্কেল হওয়া উচিত ভিন্ন বা আলাদা। আর সেখানে যোগ্যতার ভিত্তিতেই বেতন নির্ধারণ করা উচিত। এক্ষেত্রে প্রাথমিক, মাধ্যমিক বা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতনক্রম আলাদা করার প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ মাস্টার্স পাস একজন শিক্ষক প্রাথমিকে যে বেতন পাবেনÑবিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও সমমানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতার শিক্ষক একই বেতন পাবেন। শুধু তাই নয়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের উচ্চতর পর্যায়ে কাজ করার, নেতৃত্ব দেওয়ার, পড়াশোনার সব সুযোগ উš§ুক্ত থাকা উচিত। এ কাজগুলোর মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে; কারণ রাষ্ট্রের এক উদ্যোগ দ্রুত পরিবর্তন আনতে সক্ষম।

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়ও শিক্ষকদের সামনের সারিতে রাখা প্রয়োজন। যারা রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তারা শিক্ষকদের হাতে তৈরি। শিক্ষককে সম্মান ও মর্যাদা দিলে রাষ্ট্র কিছু হারাবে না, বরং তাদের সম্মান দিয়ে রাষ্ট্র সম্মানিত হবে। দুঃখের কথা, শিক্ষকদের মর্যাদা দেওয়া বা না-দেওয়া নিয়ে আজকাল কথা বলতে হয়, লিখতে হয়। যেটি একটি স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূূর্ত বিষয় হওয়ার কথা ছিল, সেটি যখন বলেকয়ে আদায় করে নেওয়ার প্রচেষ্টা নিতে হয়, তখন তা স্বভাবতই মনঃপীড়ার কারণ হয়ে ওঠে। অনেক শিক্ষক সেদিকে সহজে যেতে চান না, বরং অভিমানে নিজেকে গুটিয়ে রাখেন। একেকজন শিক্ষক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাদের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রের পরিবর্তন যত দ্রুত ঘটানো সম্ভব, তেমনটি অন্য কোনোভাবে সম্ভব নয়। শিক্ষকরা নিজেরা যেমন নিজের সীমাবদ্ধতা কাটাতে চেষ্টা করবেন; তেমনি রাষ্ট্রও শিক্ষকদের সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদার আসনে নিয়ে যাবেÑএ প্রত্যাশাটুকু শিক্ষক হিসেবে করতে চাই।

 

সহকারী অধ্যাপক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট,

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষা গবেষক

gtmroyÑgmail.com