প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

শিক্ষক সংকটে রাঙামাটির সর্বোচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠান

আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস

কাইমুল ইসলাম ছোটন, রাঙামাটি : ‘পিতামাতা আমাদের জীবনদান করেন ঠিকই, শিক্ষকরা সেই জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেন।’ বিশ্ববিখ্যাত গ্রিক বিজ্ঞানী ও দার্শনিক এ্যারিস্টটল আড়াই হাজার আগে এমন মন্তব্য করে গিয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার জন্য, সোনার মানুষ তৈরির কারিগর সংকটে আছেন পাহাড়ের সর্বোচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠান রাঙামাটি সরকারি কলেজ। ১২ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য স্বল্প শিক্ষক দিয়ে চলেছে শ্রেণী কার্যক্রম। শিক্ষক সংকটের ফলে নিয়মিত ক্লাস না হওয়ার কারণে শ্রেণী কার্যক্রম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। এতে হতাশ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকরাও। তবে পর্যাপ্ত পরিমাণ শিক্ষকের চাহিদার কথা মন্ত্রণালয়ে জানিয়েছেন বলে জানান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।

তথ্যমতে, রাঙামাটি সরকারি কলেজে অনার্স রয়েছে ১৩ টি এবং মাস্টার্স রয়েছে ৮ টি বিষয়ে। এর সাথে রয়েছে উচ্চ মাধ্যমিক ও (ডিগ্রি) পাসকোর্স। কলেজের ১২ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক পদ সৃষ্টি হয়েছে ৬০ টি। তারমধ্যেও শূন্য রয়েছে ১২ টি শিক্ষকের পদ এবং ৩টি বিভাগের প্রদর্শক পদ। বর্তমানে সংযুক্তসহ শিক্ষক রয়েছেন ৪৮ জন। সে অনুযায়ী শিক্ষক শিক্ষার্থীর অনুপাত ১ঃ২৫০।

কলেজ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, কলেজের বাংলা, হিসাববিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে রয়েছে মাত্র একজন করে শিক্ষক। ৩ বিভাগে শিক্ষার্থী রয়েছেন দুই হাজার। অন্যদিকে গণিত, প্রাণিবিদ্যা বিভাগে রয়েছে ২ জন এবং বাকি বিভাগ গুলোতে রয়েছে ৩-৪ জন করে শিক্ষক। শূন্য রয়েছে সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং প্রভাষকের পদ। অনেক বিভাগে অতিথি শিক্ষক দিয়ে চালাতে হচ্ছে কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম, তা পর্যাপ্ত নই।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ১২ হাজার শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে শিক্ষকদের। শিক্ষার্থীদের প্রাণ হলো শিক্ষক কিন্তু সেই প্রাণের সংকট কলেজে। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট ও কোচিং মুখী হচ্ছে। তাছাড়া বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্র হওয়ার কারণে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা।

বিভিন্ন বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, শিক্ষক সংকটের কারণে নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে অনেক শিক্ষার্থী কলেজে এসে ক্লাস না করে বাড়ি ফিরে যায়। তাছাড়া সিলেবাস শেষ না করেও অনেকে পরীক্ষা দিচ্ছেন। তারা শিক্ষক সংকট নিরসনের দাবি জানান।

কলেজের শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সহযোগী অধ্যাপক রনজিদ বিশ্বাস বলেন, শিক্ষক সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শ্রেনী পাঠদান কার্যক্রম। ফলে ক্লাসে শিক্ষার্থী বেশি হওয়ার ফলে ভালো কোন সাপোর্ট শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে না। শিক্ষক সংকটের কারণে যথাসময়ে সিলেবাস শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া শিক্ষকদের আরও অনেক অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। চাপের কারণে গুণগত শিক্ষা প্রতিটি শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলেন, যেসব কলেজে অতিরিক্ত শিক্ষক রয়েছে তা যদি পার্বত্য চট্টগ্রাম কলেজগুলোতে পদায়ন করা যায় তাহলে এ সংকট কিছুটা কমবে। অধিক সংখ্যক শিক্ষক থাকলে তারা তাদের মেধা দিয়ে ভালো মান সম্পন্ন শিক্ষার্থী তৈরি করতে পারব এবং তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারবেন।শূন্য পদ পূরণসহ শিক্ষকদের পদের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি তোলেন তিনি।

এ বিষয়ে রাঙামাটি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ তুষার কান্তি বড়ুয়া বলেন, শিক্ষক সংকটের কারণে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একসাথে সবার ক্লাস নেওয়া সম্ভব হয়না। তাছাড়া পরীক্ষার সময় শিক্ষক সংকটের কারণে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষক আনতে হয়। একই শিক্ষকের মাধ্যমে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। তবে দ্রুত এ সংকট কেটে যাবে।

তিনি আরও বলেন, কলেজের নিজস্ব পরিবহন নেই, ভালো অডিটোরিয়াম নেই, খেলার মাঠ অগোছালো। তাছাড়াও যথাসময়ে শিক্ষকদের প্রমোশন হচ্ছে না, বেতন বাড়তেছে না।

শিক্ষক সংকট নিরসনের বিষয়ে তিনি জানান, আমরা শিক্ষকদের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য বারবার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রতিবেদন দেওয়া হলেও সুরাহা মিলছে না। এমন সংকটের মাঝে স্বস্তির কথা হিসেবে তুষার কান্তি বড়ুয়া বলেন, কলেজে কনফারেন্স রুম, মাল্টিমিডিয়া ক্লাস রুম হচ্ছে, লাইব্রেরীতে বইয়ের পরিমাণ বাড়ছে। নির্মাণাধীন ছাত্রী হোস্টেল সম্পূর্ণ হলে ছাত্রীদের আবাসন সমস্যা দূর হবে ও দ্রুত একটি দৃষ্টিনন্দন কলেজ গেইট হবে এবং জাতীয় ও জেলা পর্যায়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন পুরস্কার অর্জন করেছেন বলে তিনি জানান।

এ ব্যাপারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মশিউর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীর অনুপাতে শিক্ষক ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের সংকট রয়েছে। এখানে আমাদের কোন হাত নেই, এটা মাউশি থেকে দেওয়া হয়। তবে বিভিন্ন সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় সভায় এটা (শিক্ষক সংকট, পদ সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়) তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ শিক্ষক পেতে সময় লাগবে।