মত-বিশ্লেষণ

শিক্ষাক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে সাক্ষরতা

মুহাম্মদ ফয়সুল আলম: আলোকিত জনগোষ্ঠী গড়তে বাংলাদেশে শিক্ষার গুণগত মান উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী পুরুষের ক্ষমতায়ন এবং তাদের মর্যাদা সমুন্নত রাখার মাধ্যমে টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করাই সাক্ষরতার মূলমন্ত্র। প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক, যে কোনো শিক্ষা গ্রহণের প্রস্তুতি হিসেবে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে অবশ্যই সাক্ষরতা অর্জন করতে হয়। গত এক দশকে শিক্ষার সর্বস্তরেই চোখে পড়ার মতো অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। শিক্ষার এই ব্যাপক অগ্রগতি ও সক্ষমতা অর্জন দেশকে বিশ্বের বুকে দিয়েছে পৃথক পরিচিতি। শিক্ষার আবশ্যিক শর্ত সাক্ষরতা অর্জনে জাতিসংঘ এবং ইউনেস্কোর সিদ্ধান্তে ৮ সেপ্টেম্বর উদ্যাপিত হয় আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। এ বছর এ দিবসের প্রতিপাদ্য খরঃবৎধপু ধহফ গঁষঃরষরহমঁধষরংস, যার বাংলা করা হয়েছে, ‘বহু ভাষায় সাক্ষরতা, উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা’।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শিক্ষা মানুষের জন্মগত ও মৌলিক অধিকার। সাক্ষরতাই শিক্ষার প্রথম সোপান এবং উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সূচক। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে নিরক্ষরতা দূরীকরণের মাধ্যমে সমাজে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা জরুরি। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য দক্ষ ও আধা দক্ষ কর্মী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সাক্ষরতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইউনেস্কো সাক্ষরতা বা শিক্ষিতের ন্যূনতম যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে কোনো ব্যক্তি নিজ ভাষায় পড়তে, চিঠি লিখে মনের ভাব প্রকাশ করতে এবং সাধারণ হিসাব করতে জানাকে চিহ্নিত করেছে। সরকার এ মানদণ্ডকে সামনে রেখেই উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা, বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা ও মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি সর্বোপরি সবার জন্য শিক্ষা কর্মসূচিকে গতিশীল করার লক্ষ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
একসময় বিপুলসংখ্যক কোমলমতি শিশু স্কুলে যাওয়ারই সুযোগ পেত না। অনেকে আবার স্কুলে গেলেও প্রাথমিক পর্যায় থেকে ঝরে পড়ত। পাবলিক পরীক্ষায় ছিল নকলের ছড়াছড়ি। ফল প্রকাশে যেমন দেরি হতো আবার তা প্রকাশের পর দেখা যেত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরীক্ষার্থীই অকৃতকার্য। স্কুলে যথাসময়ে পাঠ্যবই পেত না শিশু-কিশোররা। শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে অসংখ্য তরুণীকে বাল্যবিয়ের শিকার হয়ে নির্মম জীবন বেছে নিতে হতো। গত কয়েক বছরে বদলে গেছে শিক্ষাক্ষেত্র, পাল্টে গেছে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। শিক্ষার বিষয়ে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের ব্যাপক মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন হয়েছে। এখন প্রত্যেক মা-বাবার লক্ষ্যই থাকে তার সন্তানকে লেখাপড়া করানো। বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা ব্যক্ত করে ইউনেস্কো ইতোমধ্যেই বলেছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যাগত সমতা, বছরের প্রথমদিনেই শিক্ষার্থীকে বিনা মূল্যে বই দেওয়া এবং শিক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে উদাহরণযোগ্য দেশে পরিণত করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনার সরকারের সাফল্যের তালিকায় শীর্ষে নিঃসন্দেহে শিক্ষা। বিগত যে কোনো সময়ের তুলনায় শিক্ষাবিস্তারে অসামান্য সাফল্য দেখিয়েছে বর্তমান সরকার। শিক্ষার আলোয় এখন আলোকিত পুরো বাংলাদেশ।
শিক্ষায় নারী-পুরুষের সমতা অর্জনে বাংলাদেশ ছুঁয়েছে নতুন মাইলফলক। বাংলাদেশে শিক্ষায় ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে নারী শিক্ষার হার বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কম ছিল। সে সময় ৮০ শতাংশ নারী ছিল শিক্ষাবঞ্চিত। এক সময় নারীশিক্ষা শুধু উচ্চবিত্ত ও শহরের কিছু পরিবারে সীমাবদ্ধ ছিল। সেই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছে। বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে সবার প্রশংসা অর্জন করেছে।
১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে প্রতিটি নাগরিকের শিক্ষার সুযোগ প্রদানসহ দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূরীকরণের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চৎরসধৎু ঝপযড়ড়ষং (ঞধশরহম ঙাবৎ) অপঃ, ১৯৭৪ পাস করেন এবং ৩৬ হাজার ৬১৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার ২০১২ সালে আরও ২৬ হাজার ১৯২টি বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেছে।
দেশের প্রায় ৯৬ শতাংশ শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। নিরক্ষরতা দূরীকরণেও অর্জিত হয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য। ১০ বছর আগে যেখানে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী ভর্তির হার ছিল ৬১ শতাংশ। বর্তমানে সেখানে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের সংখ্যা শতভাগ। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তির হার ৫১ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬২ শতাংশ, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে ভর্তির হার ৩৩ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৪ শতাংশ এবং কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশ। বাংলাদেশে বয়স্ক শিক্ষার হার উন্নীত হয়েছে ৫৯ শতাংশে।
জাতিসংঘের অঙ্গ সংগঠন ইউনেস্কোর এডুকেশন ফর অল গ্লোবাল মনিটরিং কর্মসূচির আওতায় প্রণীত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নি¤œ আয় সত্ত্বেও অল্প যে কয়েকটি দেশ জাতীয় বাজেটে শিক্ষার গুরুত্ব দিয়েছে, বাংলাদেশ সেসব দেশের একটি। প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারলে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি আরও জোরদার হবে বলেও তারা উল্লেখ করেছে। সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গ্রাম-শহর উভয় অঞ্চলেই বেড়েছে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার হার। মানের দিক থেকেও এগিয়েছে এ পর্যায়ের শিক্ষা। উপবৃত্তির কারণে স্কুলগামী মেয়েশিশুর হার বেড়েছে। স্কুলে খাবার কর্মসূচিও এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। এসব কর্মসূচির ফলে ঝরে পড়া শিশুর হার কমেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের সেকেন্ড চান্স হিসেবে ১০ লাখ শিশুকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া শেখানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘রিপোর্ট অন বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি সহজ সাধারণ চিঠি লেখার সক্ষমতা থাকলেই কোনো ব্যক্তিকে স্বাক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন বলা যায়। এ শর্ত পূরণসাপেক্ষে দেশে ১৫ বছরের বেশি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বর্তমান সাক্ষরতার হার ৭৩ দশমিক ৯ শতাংশ। প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতির প্রভাবেই সাক্ষরতার হার প্রতিবছরই বাড়ছে। ২০০৮ সালেও দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ৫৬ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০১৬ সালে এসে সাক্ষরতার হার বেড়ে দাঁড়ায় ৭২ দশমিক তিন শতাংশে, যেখানে আগের বছর এ হার ছিল ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশ। সর্বশেষ ২০১৮ সালে এ হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩ দশমিক ৯ শতাংশে।
সরকার উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন ২০১৪ প্রণয়ন করেছে। সরকারের সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর আওতায় ‘মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প (৬৪ জেলা)’ নামে একটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় ১৫-৪৫ বছর বয়সী ৫০ লাখ নিরক্ষর নারী-পুরুষকে মৌলিক সাক্ষরতা প্রদান করা হবে। সরকার সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আলোকে ২০২০ সালের মধ্যে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর আওতায় স্থায়িত্বশীল উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম সৃষ্টির লক্ষ্যে জীবনব্যাপী শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। দেশের ৬৪টি জেলায় প্রতিটি ইউনিয়নে কমপক্ষে একটি করে ও কিছু শহর এলাকায় আইসিটি বেজড মোট পাঁচ হাজার ২৫টি একই রকমের দৃষ্টিনন্দন ভবনে স্থায়ী কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার (ঈখঈ) স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে স্থায়ী বৃত্তিমূলক দক্ষতা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।
বর্তমানে আমাদের দেশে সাক্ষরতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বয়স্ক শিক্ষা, খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, উপবৃত্তি প্রথা চালু করা অন্যতম। বিভিন্ন ধরনের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা এক্ষেত্রে অনেক কার্যকরী প্রভাব ফেলে। এক্ষেত্রে মধ্যাহ্নকালীন টিফিন কর্মসূচি, ব্র্যাক আনন্দ স্কুল, হাওর এলাকার ভাসমান স্কুল, মসজিদভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম, বস্তিভিত্তিক স্কুল, নৈশবিদ্যালয়, শিক্ষার্থীদের স্বীয় উদ্যোগে চালিত বিভিন্ন প্রচেষ্টা, পথশিশুদের জন্য প্রতিদিন স্কুল ইত্যাদি কার্যক্রম সাক্ষরতা কর্মসূচিকে আরও বেগবান করে তুলেছে।
সরকারের এই উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যক্তিকে তার প্রতিদিনের সমস্যা সমাধানের উপযোগী করার জন্য এবং তার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও দক্ষতা বিকাশে সাহায্য করবে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি অনেক সংস্থাও বেশ তৎপর হয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে তৃণমূল পর্যায়ে সাক্ষরতার গুরুত্ব পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি সমাজের বিবেকবান ও বিত্তবানদের সমর্থন ও সাহায্য এ ব্যাপারে অন্যতম ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিশেষে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পর বাংলাদেশে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা ও পেশাভিত্তিক কারিগরি শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। আর তাই জাতীয় পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

পিআইডি প্রবন্ধ

সর্বশেষ..