রামিসা রহমান : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চ টিউশন ফি বা প্রশাসনিক দুর্বলতা নিয়ে অভিযোগ অনেক পুরোনো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক (ইউএপি)-এ ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে শিক্ষার্থীর অধিকার, শিক্ষাগত ন্যায়বিচার ও অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক স্বচ্ছতার বিষয়ে। পরীক্ষার ফল মূল্যায়নের আবেদন প্রত্যাহার করতে শিক্ষার্থীর ওপর অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছেÑএমন অভিযোগ সামনে আসতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ও বাইরে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
চলতি সেমিস্টারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কোর্সের ফল প্রকাশের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী পরীক্ষার নম্বর নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী তিনি ফল মূল্যায়নের জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দেন। আবেদন গৃহীত হওয়ার পর সাধারণত শিক্ষক বা বিভাগীয় কমিটি বিষয়টি যাচাই করেন এবং প্রয়োজন মনে করলে নম্বর সংশোধন করেন। কিন্তু শিক্ষার্থীর দাবি, আবেদন করার কয়েকদিন পরই তাকে কর্মকর্তার মাধ্যমে জানানো হয় যে এই আবেদন প্রত্যাহার করা ভালো হবে। মৌখিকভাবে বোঝানো হয় অভিযোগ বা পুনর্মূল্যায়নের আবেদন করলে সংশ্লিষ্ট কোর্স শিক্ষক ‘ক্ষুব্ধ’ হতে পারেন, ভবিষ্যতে অন্যান্য কোর্সে এর প্রভাব পড়তে পারে, এবং পরে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থীর শেয়ার বিজকে বলেন, আমি নিয়ম মেনেই আবেদন করেছিলাম। কোথাও কোনো ভুল করিনি। কিন্তু হঠাৎ করে আমাকে বলা হলো-এটা আপাতত তুলে নিতে, না হলে ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে। এটা আমাকে ভয় পাইয়ে দেয়। আমি বুঝতে পারছিলাম না, ফল মূল্যায়ন কি তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধ?
তিনি আরও বলেন, তাকে দুই দফায় আলাদা কর্মকর্তার পক্ষ থেকে বিবেচনার কথা বলা হয়। তাকে বোঝানো হয়-কোর্সটি যেহেতু একজন সিনিয়র শিক্ষক নিয়েছেন, তাই তার নম্বর নিয়ে প্রশ্ন তোলা ভালো দেখায় না এবং স্ক্রুটিনির আবেদন করলে এটি ‘নেগেটিভ ইমপ্রেশন’ তৈরি করবে। শিক্ষার্থীর কথায়, যে শিক্ষক পড়িয়েছেন, তাকে আমি সম্মান করি। কিন্তু নম্বর তো শিক্ষক নয়, পরীক্ষার পারফরম্যান্স যাচাই করার বিষয়। সেখানে ভয় দেখানো বা চাপ দেওয়ার কিছু নেই। তবু আমাকে যেভাবে বারবার বলা হলো, তাতে মনে হয়েছে, ফল মূল্যায়ন যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো নিষিদ্ধ শব্দ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ও পরীক্ষা পরিচালনাসংক্রান্ত নীতিমালা অনুযায়ী, ফল মূল্যায়ন শিক্ষার্থীর অধিকার এবং শিক্ষার্থী চাইলে কোনো ধরনের ট্রিটমেন্ট ছাড়াই এটি করার সুযোগ থাকে। কিন্তু অভিযোগের বিষয় হলো-এই অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে শিক্ষার্থী হয়রানি ও মানসিক চাপের মুখে পড়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেয়ার বিজকে বলেন, সম্পূর্ণ বিষয়টি ভুলভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে। আমরা কখনোই শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ দেই না। তবে কখনো কখনো ভুল বোঝাবুঝি হয়। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা স্ক্রুটিনিকে রি-এভ্যালুয়েশনের মতো ধরে নেয়। অথচ ফল মূল্যায়ন মূলত যোগবিয়োগ বা পৃষ্ঠা বাদ পড়েছে কি না, তা যাচাই করা। এজন্য অনেক সময় আমরা শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে বলিÑএতে ফল উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নাও আসতে পারে। এটিকে চাপ বলা ঠিক নয়।
তবে তার বক্তব্যের সঙ্গেই মিল পাওয়া যায় না শিক্ষার্থীর বয়ানের। শিক্ষার্থীর দাবি, তাকে বোঝানো হয়নি বরং ভয় দেখানো হয়েছে। ভবিষ্যৎ কোর্স শিক্ষাদান, শিক্ষক শিক্ষার্থীর সম্পর্ক এবং বিভাগের দৃষ্টিভঙ্গির কথা উল্লেখ করে তাকে আবেদন প্রত্যাহারে উৎসাহিত করা হয়।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সিনিয়র অধ্যাপক শেয়ার বিজকে বলেন, এটা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে খুবই দুঃখজনক। ফল মূল্যায়ন শিক্ষার্থীর স্বীকৃত অধিকার। এখানে ভয় দেখানো বা চাপ প্রয়োগের কোনো স্থান নেই। শিক্ষকতা এমন পেশা, যেখানে প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়াটা স্বাভাবিক। নম্বর গণনায় ভুল হওয়াটা মানবিক, আর তা সংশোধন করা দায়িত্ব। এতে শিক্ষার্থীকে ভয় দেখানোর সংস্কৃতি থাকলে তা শিক্ষার মানের জন্য ক্ষতিকর।
তিনি আরও বলেন, অনেক সময় বিভাগীয় কর্মকর্তারা ইমেজের কথা বলে শিক্ষার্থীদের ভাবিয়ে তুলেন। কিন্তু এটা শিক্ষার পরিবেশের সঙ্গে যায় না। ছাত্র এখানে ভোক্তা নয়, বরং জ্ঞানার্জনের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। তার অধিকার ক্ষুণ্ন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামই ক্ষুণ্ন হয়।
ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা যায়। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। ছাত্রদের একটি অংশের মতে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফল চ্যালেঞ্জ খুবই সংবেদনশীল এবং শিক্ষকদের একটি অংশ সমালোচনাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে না দেখে ব্যক্তিগত আক্রমণ মনে করেন। এই সংস্কৃতি বদলানো জরুরি।
অন্যদিকে প্রশাসন মনে করে, শিক্ষার্থীর অভিযোগ অতিরঞ্জিত। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় খারাপ করলে ফল মূল্যায়নকে শেষ ভরসা হিসেবে দেখে, যদিও এতে ফল পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুব কম। ফলে কর্মকর্তারা মাঝে মাঝে শিক্ষার্থীদের অবস্থাটি বুঝিয়ে দিতে চাইলেই পরে তা চাপ হিসেবে ব্যাখ্যা হয়।
কিন্তু শিক্ষার্থীর বক্তব্য একেবারেই স্পষ্ট তিনি কাউকে অভিযুক্ত করতে চান না, কিন্তু তিনি ভয় বা মানসিক চাপ চান না। তার কথায়, আমার শুধু জানার অধিকার ছিল, আমি কত নম্বর পেলাম এবং কোথায় ভুল হলো। এটা কোনো শাস্তিযোগ্য বিষয় নয়।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী অ্যাকাডেমিক গ্রিভেন্স সেল গঠন করা প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষক-প্রশাসন-শিক্ষার্থী সবাই সমান গুরুত্ব পাবে এবং অভিযোগ তদন্ত হবে নিরপেক্ষভাবে। বিশ্বব্যাপী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফল মূল্যায়ন ও রি-এভ্যালুয়েশনকে অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়ে গণ্য করা হয়। এ নিয়ে শিক্ষার্থীকে ভয় দেখানো বা লজ্জা দেওয়া পেশাগতভাবে অগ্রহণযোগ্য।
অন্যদিকে, ইউনিভার্সিটি অফ এশিয়া প্যাসিফিকের এই ঘটনাটি সামনে আসার পর শিক্ষার্থীরা আবারও প্রশ্ন তুলছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা পদ্ধতি কতটা ন্যায়সংগত? বিভাগীয় শিক্ষকরা কি নম্বর প্রদানে জবাবদিহির কাঠামোর মধ্যে আছেন? শিক্ষার্থীরা কি ভয়মুক্ত পরিবেশে নিজেদের অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন?
তবে শিক্ষার্থীদের মতে, ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভুল করলে, ভুল সংশোধনের পদক্ষেপ নিলে নয়। তারা দাবি করছে যেন স্ক্রুটিনি আবেদনকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীর ওপর কোনো ধরনের চাপ সৃষ্টি না হয় এবং ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষার্থী যেন এই ধরনের অভিজ্ঞতার শিকার না হন।
শিক্ষার্থী যে মানসিক চাপে পড়েছেন, সেটি তার কথাতেই স্পষ্ট। তিনি বলেন, আমি চাই না কেউ সমস্যায় পড়ুক। কিন্তু আমি চাই না আমাকে অন্যায়ভাবে ভয় দেখানো হোক। আমি শুধু আমার নম্বর জানতে চেয়েছিলাম এই চাওয়াটা কেন ভয় পাওয়ার কারণ হবে, বুঝি না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, স্বাধীন মত প্রকাশ ও শিক্ষার্থীর অধিকার এসব বিষয় আজ বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষার অপরিহার্য অংশ। ফল মূল্যায়নের মতো একটি মৌলিক একাডেমিক অধিকার নিয়ে যদি শিক্ষার্থী ভয়ের মধ্যে পড়ে, তাহলে সেটি শুধুই একটি ব্যক্তিগত ঘটনা নয়, বরং একটি সংকটের প্রতিফলন-যা সমগ্র শিক্ষাঙ্গনকে ভাবিয়ে তুলতে বাধ্য।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post