দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

শিক্ষানবিশ ডাক্তার সংকটে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ

বৈশ্বিক মহামারি কভিড-১৯ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নতুন করে ঢেলে সাজানো এখন প্রধান কাজ। ঠিক এ অবস্থায় সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ, যেমন কল-কারখানা, অফিস-আদালত খুলে দেওয়া এবং সীমিত পরিসরে যানবাহন চলাচলের অনুমতি প্রদানের কিছুদিন পর যানবাহনের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী যাত্রী বহনের অনুমতি অর্থনৈতিক দিক থেকে যুক্তিযুক্ত হলেও সর্বোপরি দেশের জন্যে ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশে জনসংখ্যার হিসাব অনুযায়ী প্রয়োজনের তুলনায় ডাক্তারের সংখ্যা বহু আগে থেকেই অপ্রতুল। তার সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে। কভিডকালে সম্মুখ যোদ্ধা হিসেবে নিয়োজিত থেকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বহু ডাক্তারের কর্মক্ষেত্রে যোগদান ক্রমান্বয়ে ব্যাহত হওয়া, চলমান পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশে প্রয়োজনীয় ডাক্তারস্বল্পতা মেটানো এবং বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসাসেবায় নতুন ডাক্তার প্রয়োজন। এ বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বসহ বিবেচনা করা উচিত।

প্রতিবছর মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষা দুটি কারিকুলামে অনুষ্ঠিত হয় যথাক্রমে জানুয়ারি ও জুলাই এবং আরেকটি মে ও নভেম্বরে। অর্থাৎ সাপ্লিমেন্ট পরীক্ষাসহ প্রতিবছর চারটি সময় স্বাস্থ্যসেবায় বেশ কিছু ইন্টার্ন ডাক্তার হিসেবে নিজেদের দেশসেবায় নিয়োজিত করতে পারেন। এ বছরে মোট দুই হাজার ৪০০ শিক্ষার্থী শুধু ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষার সাপ্লিমেন্টের জন্য অপেক্ষমাণ এবং রয়েছে আরও ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষার শিক্ষার্থীরা। কভিডকালে বাস্তবতার জন্য প্রফেশনাল ও সাপ্লিমেন্ট এই দুই পরীক্ষাই স্থগিত রয়েছে। একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, হোক তা সরকারি কিংবা বেসরকারি, ইন্টার্ন (শিক্ষানবিশ) ডাক্তাররা স্বাস্থ্যসেবায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকেন। রোগী এলে তার প্রাথমিক চিকিৎসা থেকে শুরু করে প্রয়োজনে ভর্তি করা এবং রোগী হাসপাতাল থেকে বিদায় নেওয়ার আগ পর্যন্ত রোগীকে ডাক্তারের সহযোগিতা করা, হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা ডিউটি করা, ভর্তি হওয়া কোনো রোগী গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে গেলে মেডিকেল অফিসারকে জানানো এবং ডাক্তার কল করাসহ খুঁটিনাটি দৃশ্যমান নয়, এমন বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তারা পালন করে থাকেন। আপাতদৃষ্টিতে এসব কাজের গুরত্ব না বোঝা গেলেও তাদের অবর্তমানে স্বাস্থ্যসেবার ওপর একটি পরোক্ষ প্রভাব পড়বে।

দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি প্রায় ১২৮টি মেডিকেল কলেজে ফাইনাল প্রফেশনাল এবং সাপ্লিমেন্ট পরীক্ষা আটকে রয়েছে, যার ফলে শিক্ষানবিশ ডাক্তারের সংকট দেখা দেবে। কেননা গত বছর দুটি সেশনে যারা দেশব্যাপী শিক্ষানবিশ ডাক্তার হিসাবে যোগদান করেছিলেন, তাদের একাডেমিক কার্যক্রমের মেয়াদ শেষ হওয়ায় তারা এ বছরের শেষদিকে এবং আগামী বছরে হাসপাতালে যোগদান থেকে বিরত থাকবেন। প্রতিবছর শিক্ষানবিশ ডাক্তার যোগদানের যে বার্ষিক ক্রম রয়েছে, ফাইনাল প্রফেশনাল ও সাপ্লিমেন্ট পরীক্ষা না হওয়ায় সহজেই অনুমান করা যায় যে সেই ক্রম বিনষ্ট হবে। যার ফলে ঠিক আগামী বছরের শুরুতেই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলো লোকবল সংকটে পড়তে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি দেশের জন্য কোনো সুখকর সংবাদ নয়। 

বর্তমানে বিশ্ব একটি নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ঘন জনবসতিপূর্ণ হওয়ায় সংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকি এখানে আরও বেশি। এখন আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট হচ্ছে, আমরা দেশের সব জনস্বাস্থ্য নিশ্চিন্তকরণের লক্ষ্যে আমাদের অন্যান্য অনেক অধিকার ও বাহুল্য বর্জন করছি। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত ক্ষুদ্র কিন্তু ভয়াবহ বিষয়টি গুরত্বসহ নেওয়া। অর্থাৎ সামাজিক দূরত্ব কিংবা অন্য কোনো পন্থায় মেডিকেল কলেজগুলোর এ বছরের ফাইনাল প্রফেশনাল ও সাপ্লিমেন্ট পরীক্ষা অনতিবিলম্বে নিয়ে নেওয়া উচিত।

শেখ নোমান পারভেজ

ঢাকা

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..