মত-বিশ্লেষণ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার যৌক্তিকতা কোথায়!

মো. শফিউল্লাহ : আমার বড় ভাই মাঝেমধ্যে একটা গল্প বলতেন, কোনো এক গৃহস্থ অন্য এক ব্যক্তিকে বলছেন, তুমি যদি এই বিষয়টা আমাকে বুঝিয়ে দিতে পার তবে আমি তোমাকে হালের ডানপাশের বলদ গরুটা দিয়ে দেব। এ কথা শুনে গৃহস্থের স্ত্রী রেগে আগুন এবং গৃহস্থকে বকাবকি শুরু করেন। তারপর তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি যে বলদ গরুটা দিতে চাইলে, সে যদি তোমাকে সত্যি বুঝিয়ে দেয়, তখন কী করবে? তখন গৃহস্থ বললেন, আরে বউ আমি বুঝলে তো সে আমাকে বোঝাবে। আমি তো কোনোমতেই বুঝব না। তাহলে কীভাবে নেবে বলদ গরু? দেশে এখন সবকিছু স্বাভাবিক রয়েছে, কিন্তু শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন গৃহস্থের মতো নাছোড়বান্দা, বুঝেও বুঝবে না।

আগের মতো হাটবাজার, অফিস-আদালত, পরিবহন, শপিং মল ও পর্যটন কেন্দ্রগুলো চলছে দীর্ঘদিন আগে থেকেই। এছাড়া চলছে নিয়মিত সভা-সমাবেশ, নানা দিবস উদ্যাপন এবং নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা। এখন শুধু বন্ধ রয়েছে শিক্ষাঙ্গন। শিক্ষাঙ্গন খুলে দিতে সমস্যা কোথায়? যেহেতু সবকিছুই স্বাভাবিক নিয়মে চলছে, কাজেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বন্ধ রাখাটা একেবারে অযৌক্তিক। সেজন্য অনেকেই ব্যঙ্গ করে বলছেন, করোনা শুধু শিক্ষাঙ্গনে। তাদের কথায় যুক্তি আছে। যে কারণ দেখিয়ে শিক্ষাঙ্গন বন্ধ রাখা হয়েছে, সেটা অযৌক্তিক। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে কোথাও কোনো স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই। রবীন্দ্রনাথ যেমনটা বলেছেন, সারা অঙ্গকে বঞ্চিত করিয়া কেবল মুখমণ্ডলে রক্ত জমা হইলেই তাকে স্বাস্থ্য বলা যায় না। তেমনি সব কিছু খোলা রেখে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে, এটা বলা কতটা যুক্তিসংগত!

বাংলা একাডেমি কর্তৃক আয়োজিত অমর একুশে বইমেলা আগের মতো এবারও আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। লেখক ও প্রকাশকরা যুক্তি দেখিয়েছিলেন, পাবলিক পরিবহন, হাটবাজার, শপিং মল, সিনেমা হলÑসবকিছুই খোলা রয়েছে, তবে কেন বইমেলা আগের মতো আয়োজন করা যাবে না? শেষ পর্যন্ত লেখক ও প্রকাশকের কথামতোই এবারের বইমেলা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বইমেলা আয়োজন হবে, তবু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে না।

আমাদের দেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য দল এবং সংগঠন রয়েছে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের পক্ষ নিয়ে কথা বলবে, শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে তৎপর থাকবে, এমন কোনো দল হাজার খুঁজেও পাওয়া যায় না। খুঁজে না পাওয়ার কারণ হতে পারে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের সংগঠন করে আর্থিক কোনো সুবিধা পাওয়া যাবে না। সবকিছু তথাকথিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে খুলে দেয়া হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে এত দ্বিধা কেন? করোনাকালে যত দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ তত দিন শিক্ষক, কর্মকর্তাসহ শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সবার বেতন বন্ধ করে দেয়া হলে তবে কি তারা চুপ থাকতেন! আহমদ ছফার ‘গাভী বৃত্তান্ত’বইয়ে পড়েছিলাম, এদেশে শিক্ষকসমাজ বলে কিছু নেই, যা আছে তা হলো হলুদ, ডোরাকাটা ও বেগুনি দল। বর্তমানে কথাটি চরম সত্য। আমি প্রায়ই একটা কথা বলি, এদেশে সেবা বলে আর কিছু নেই, যা আছে সবই এখন ব্যবসাÑসেটা হোক শিক্ষকতা বা ডাক্তারি। সবাই এখন নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি নিয়েই ব্যস্ত। প্রায় এক বছর হতে চলল সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে আছে। এ নিয়ে ওপরমহলের কারও বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই, যেমন নেই শিক্ষকদের। তাদের মাথাব্যথা থাকবেই বা কেন! তারা তো বেশ আরামেই আছেন। আহমদ ছফা যথার্থই বলেছেন, শিক্ষকসমাজ থাকলে তারা চুপ করে আরাম-আয়েশে দিন কাটাতেন না। আজ শিক্ষকসমাজ নেই বলেই শিক্ষার্থীদের নিয়ে কেউ ভাবেন না, আর কথাও বলেন না। শিক্ষার্থীরা মার খায়, তবু কারও বিবেক জাগ্রত হয় না। আমাদের শিক্ষকরা ড. জোহা দিবস পালন করেন, কিন্তু নিজেদের মাঝে ড. জোহাকে ধারণ করা তো দূরে থাক, লালনও করেন না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তাদের তো কোনো ক্ষতি হচ্ছে না, বরং তারা আরাম-আয়েশে বসে থেকে বেতন নিচ্ছেন, পরিবারের সঙ্গে আনন্দঘন সময় পার করছেন, কেউ আবার নিজেদের যে ব্যবসা আছে সেগুলোর মুনাফা বাড়ানোর জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করছেন।

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের চোখে তাদের শিক্ষার্থীরা যেন আজও শিশু। শিক্ষার্থীরা নিজেদের যতœ নিতে পারবে কি না, ঠিকমতো সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাচল করতে পারবে কি না, এসব নিয়ে তাদের সংশয় রয়েছে। তারা কি এমন আশঙ্কা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিতে ভয় পাচ্ছেন! একটি শিক্ষার্থীর জীবন তাদের কাছে খুবই মূল্যবান। এখন পর্যন্ত কত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার খবর পেয়েছেন? কিন্তু এই বন্ধের সময়ে শিক্ষার্থীরা হতাশায়, মানসিক চাপে আত্মহত্যা করেছে, সেদিকে তাদের ভ্রুক্ষেপ নেই।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সে দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে শুধু স্থগিত পরীক্ষাগুলো নেয়ার ব্যবস্থা করার মাধ্যমে। করোনা মহামারিতে অনেকের চলতি পরীক্ষা স্থগিত হয়ে যায়; আবার কারও পাঠ্যক্রম শেষ পর্যায়ে ছিল, এমন শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তারা পরীক্ষা নেয়ার ব্যবস্থা করেছেন, তবে হল বন্ধ রেখে। এটা কোন যুক্তিতে করেছেন, সেটা আমার অল্প জ্ঞানে বোধগম্য নয়। হল বন্ধ রেখে পরীক্ষা নেয়ার ফল আমরা এরই মধ্যে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় দেখতে পেয়েছি। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রাতের আঁধারে পিটিয়েছেন পরিবহন শ্রমিকরা, আর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এলাকাবাসী মাইকিং করে এসে হামলা করেছে শিক্ষার্থীদের ওপর। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বহিরাগত সন্ত্রাসীরা এসে পেটাচ্ছে, এটা কি জাতির জন্য খুবই সম্মানের! যাদের দেশের সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং যাদের জাতির কর্ণধার ভাবা হয়, তারা আজ মার খাচ্ছে আর কর্তৃপক্ষ নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে। শিক্ষকরা যখন কোনো কারণে বিপদে পড়েন, এই শিক্ষার্থীরাই তাদের শিক্ষকদের রক্ষা করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয়, শিক্ষার্থীদের কিছু হলে হাতেগোনা কয়েকজন শিক্ষকের সমর্থন ছাড়া কাউকে পাশে পাওয়া যায় না। শিক্ষার্থীরা এভাবে মার খেলে, নিষ্পেষিত হলে, অবহেলিত হলে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা কারা গড়বেন!

শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভাবার মানুষের বড্ড অভাব। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত যারা অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন, আজ সেই শিক্ষার্থীরাই অবহেলিত। শিক্ষার্থীদের বাদ দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়া সম্ভবপর নয়। অনতিবিলম্বে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ খুলে দেয়া হোক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো। একইসঙ্গে বোধোদয় হোক এদেশের শিক্ষকদের, লেখক সমাজের এবং শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ওপরমহলের।

শিক্ষার্থী, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..