মত-বিশ্লেষণ

শিক্ষাব্যবস্থায় ভার্চুয়াল মাধ্যমে সবাই শিখতে পারছে তো!

কাব্য সাহা : কোনো শিক্ষার্থীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। শিক্ষার্থী বলতেই আমাদের কাছে স্কুল কিংবা কলেজের পরিচিতিই প্রাধান্য পায়। তবে শিক্ষার তো কোনো বয়স নেই যেকোনো বয়সের মানুষ নতুন যেকোনো বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বলাই যেতে পারে, আমরা সবাই প্রকৃতির কাছে শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত।

প্রাকৃতিক শিক্ষার্থী তো আমরা সবাই, তবুও আমাদের রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরুটা একেক জনের একেকভাবে হয়ে থাকে। যেমন কেউবা শুরু করে প্রাইমারি স্কুল দিয়ে, আবার কেউবা শুরু করে কিন্ডারগার্টেন স্কুল দিয়ে। আবার শহরের মানুষ শিশুদের শিক্ষার শুরুটা করে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল দিয়ে। শিশুদের স্কুলের যাত্রাটা একেক জনের একেক রকম হলেও উদ্দেশ্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করা। সেই লক্ষ্যেই আমাদের দেশে প্রচলিত রয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা তথা জ্ঞানচর্চার নানা প্রতিষ্ঠান। এরপর রয়েছে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা তথা অনুধাবন মাধ্যম। এরপর আসছে জ্ঞান ও অনুধাবনের যথাযথ প্রয়োগ তথা কলেজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, পরবর্তী ধাপে রয়েছে উচ্চতর দক্ষতা তথা নিজেকে যোগ্য করে তোলার মাধ্যম উচ্চতর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনো মানেই কোনো শিক্ষার্থীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পূর্ণতা আসা। এখন তিনি চাকরি করবেন বা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। শিক্ষার শেষ নেই, চাইলে আরও অনেক ডিগ্রি নেওয়া যেতে পারে। যাহোক প্রসঙ্গত বলতেই হয়, আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিকাশ হয়ে থাকে স্কুল-কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠগ্রহণের মাধ্যমে, যেখানে শিক্ষার কারিগর বা শিক্ষা গুরুরা তাদের জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেন সবার মাঝে, আর এভাবেই কোনো শিক্ষার্থী পরিণত হন দেশের সম্পদে। বর্তমান সময়ে স্বাভাবিক এই প্রক্রিয়াতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মহামারি কভিড-১৯।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম রোগী শনাক্ত হন তিন ব্যক্তি। তারিখটি ছিল ৮ মার্চ। আর আক্রান্ত হয়ে প্রথম একজন মারা যান ১৮ মার্চ। ৮ মার্চ বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়তে শুরু করলে ১৬ মার্চ ঘোষণা আসে একযোগে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার। ঘোষণা অনুযায়ী ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, যার সময়কাল এখনও চলমান রয়েছে। দীর্ঘ সাড়ে ছয় মাসের অধিক সময় কেটে গেছে, কিন্তু এক মাস বন্ধ থাকার পর একে একে অনেক প্রতিষ্ঠান সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে পাঠদান করতে। যে-ই চিন্তা সে-ই কাজÑএক এক করে শুরু হলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনলাইন পাঠদান কার্যক্রম।

করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, সেই ভাবনা থেকেই মূলত অনলাইন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাঠদান প্রক্রিয়া চলমান। কিন্তু এই অনলাইন কার্যক্রম থেকে আমরা কতটুকু শিখতে পারছি, শেখার সুযোগ পাচ্ছি কি না, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কার্যক্রম এবং অনলাইন শিক্ষার কার্যক্রমে মূলত কোনো ফারাক আছে কি নাÑসেসব বিষয়ে আলোচনা করা যাক।

করোনাকালে অনলাইন কার্যক্রমে প্রথমেই বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অনিশ্চিত ইন্টারনেট সংযোগ। ধরা যাক, কোনো শিক্ষার্থী ঢাকায় বসে ক্লাস করছে, অন্যজন কোনো মফস্বলে থেকে ক্লাস করছেÑএখন দুজনেই সমান সেবা পাবে কি? তাদের শেখাটা একই রকম হবে কি? নিশ্চয়ই তা নয়। এখানেই তাদের মূল ফারাক রয়েছে। আমাদের দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত শ্রেণির, আর তাদের বড় একটি অংশ আসছে দেশের শেষ সীমান্ত থেকে। এখনও দেশের অনেক স্থানেই ইন্টারনেট সেবা স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, অনেক জায়গায় ইন্টারনেট সেবা চিন্তাই করা যায় না। মূলত বড় শহর ও মফস্বলের মধ্যে অনলাইন ক্লাসের ফারাকটা তৈরি হচ্ছে।

অনলাইন ক্লাসের জন্য অত্যাবশ্যক ডিভাইস, যেমন ল্যাপটপ, স্মার্টফোন বা ট্যাব প্রয়োজন। যেহেতু অধিকাংশ মানুষ আমরা মধ্যবিত্ত, সুতরাং অনেকের কাছেই সে-ই ডিভাইস সাপোর্ট নেই, যা দিয়ে অনলাইনের সুযোগ গ্রহণ করে শিক্ষাগ্রহণ করা যেতে পারে। অনেকের কাছে স্মার্টফোন থাকলেও সেই ডিভাইসটিও অনলাইন ক্লাসের জন্য ব্যবহার-উপযোগী তেমন নয়। এখানে বড় একটি বাধা তৈরি হচ্ছে।

ওপরের দুটি সাপোর্টই অনেকের আছে, কিন্তু অনলাইন ক্লাসের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে কোনো ডেটা প্যাক নেই, যা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় রকমের সমস্যা তৈরি করছে। শিক্ষার্থীদের জন্য বা অনলাইন ক্লাসের জন্য বিশেষ কোনো প্যাকেজ অপারেটররা দেয়নি। এখানে শিক্ষার্থীরা বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।

করোনাজনিত পরিস্থিতিতে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম হলেও অনলাইন ক্লাসের জন্য দীর্ঘ সময় একনাগারে ডিভাইসে কানেক্টেড থাকতে হচ্ছে। একভাবে ডিভাইসনির্ভর হওয়ায় বাড়ছে শারীরিক নানা জটিলতা। ডিভাইস থেকে সৃষ্ট রেডিয়েশন তৈরি করছে নানা রকমের বন্ধকতা, যেমনÑচোখে ঝাপসা দেখা, মাথাব্যথা বা মাথা ঘোরা, অনিদ্রা প্রভৃতি। এখানে ডিভাইসনির্ভরতায় সৃষ্টি হচ্ছে নানা জটিলতা। মানসিক বিকাশের বদলে তৈরি হচ্ছে মানসিক অবসাদ। তাছাড়া শিশুদের জন্য তৈরি হচ্ছে বিভ্রান্তি। অনলাইন ক্লাসের সুবাদে তাদের হাতে ডিভাইস তুলে দিতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ডিভাইসের সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় কৌতূহলবশত বা হঠাৎ কোনো বিরূপ সাইট দেখে শিকার হতে পারে ভিন্ন মনোভাবের, যা একটি শিশুর মানসিক অবক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

এমন অনেক কিছু রয়েছে, যা আমাদের প্রতি মুহূর্তে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

করোনাকালে শিক্ষাব্যবস্থায় সুবিধাগুলো হচ্ছেÑসেশনজট হওয়ার শঙ্কা কমে যাচ্ছে। বাসায় থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সংকটকালেও পড়াশোনার সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত থাকা যাচ্ছে, এর ফলে চর্চা হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থায় আমাদের করণীয় কিছু রয়েছে। করোনাকালে আমাদের পাঠগ্রহণ প্রক্রিয়ার গুরুত্ব রয়েছে, তবে পদ্ধতি ও সেজন্য সব ধরনের ফলপ্রসূ চেষ্টা অব্যাহত রাখা যেতে পারে। করোনাকালের করণীয় কাজগুলো উত্থাপন করা হলোÑক. সব জায়গায় ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিতকরণ; খ. ডিভাইসের সাহায্য পেতে প্রতিষ্ঠান বা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ; গ. সাশ্রয়ী মূল্যে শিক্ষার্থীদের হাতে ডেটা প্যাক দেওয়া, নয়তো শিক্ষার্থীদের জন্য মাসিক উপবৃত্তি চালু করা; ঘ. অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের সময়সীমা কমিয়ে আনা এবং ঙ. অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে সবাইকে উৎসাহিত করা যায় এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা।

উপরি-উক্ত বিষয়গুলোয় নজরদারি থাকলে শিক্ষার্থীদের জন্য ফলপ্রসূ হবে করোনাকালীন শিক্ষাব্যবস্থা।

অনলাইন কার্যক্রম যাতে শিক্ষার্থীদের জন্য চাপ না বাড়ায়, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। যেহেতু আমরা একটা খারাপ সময় পার করছি, সুতরাং আমাদের বিকল্প উপায়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে। করোনা মহামারির শেষ পরিস্থিতি আমাদের অজানা, কিন্তু স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে বা নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়, এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে অনলাইন কার্যক্রম তথা করোনাকালীন শিক্ষাব্যবস্থা চলমান রাখতে হবে।

আমাদের নিজেদের সচেতন হতে হবে এবং অন্যদের সচেতন করে তুলতে হবে।

শিক্ষার আলো যেন সবার ভেতর ছড়িয়ে যায়, আমাদের সেদিকে মনোযোগ রাখতে হবে। কেউ শিখবে আর কেউ সুযোগ পাবে না, এমন শিক্ষাব্যবস্থা কখনোই কাম্য নয়। সুস্থ ও সুন্দর একটি পরিবেশ তৈরি হোক আমাদের নতুন অনলাইন কার্যক্রম তথা করোনাকালীন শিক্ষাব্যবস্থায়।

শিক্ষার্থী, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ ➧

সর্বশেষ..