ফারিহা জামান : পৃথিবী একসময় ছিল এক বিশাল পরিবার। কেউ কষ্ট পেলে সবাই পাশে দাঁড়াত, কেউ আনন্দ পেলে সবাই মিলে হাসত। তখন মানুষের মুখের হাসিটা ছিল সত্যিকারের হূদয়ের গভীর থেকে আসা। কিন্তু এখন চারপাশে মানুষ আছে, কিন্তু মনে হয় কেউ কারও নয়। আমরা সবাই ব্যস্ত নিজের জীবনে, নিজের স্বপ্নে ও নিজের চিন্তায়। কারও চোখের জল দেখি, কিন্তু থামি না, কারও বিপদ দেখি, কিন্তু হাত বাড়াই না। সহমর্মিতা এখন আর স্বাভাবিক নয়, বরং বিরল গুণে পরিণত হয়েছে। মনে হয় আমরা যত এগোচ্ছি, ততই দূরে সরে যাচ্ছি একে অপরের কাছ থেকে।
আজকের এই ব্যস্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর যুগে মানুষ ক্রমেই নিজের মধ্যে গুটিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার বন্ধু পাওয়া যায়, কিন্তু মন খুলে কথা বলার মানুষ খুব কম। একসময় পরিবার, সমাজ ও বন্ধুত্বের বন্ধন ছিল মানবিকতার প্রধান আশ্রয়। এখন সে জায়গায় জায়গা নিয়েছে প্রতিযোগিতা, হিংসা, আর আত্মকেন্দ্রিকতা। ফলে সমাজে তৈরি হচ্ছে একধরনের নিঃসঙ্গতা ও সহমর্মিতার অভাব।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানুষ আগের তুলনায় মানসিকভাবে বেশি একা বোধ করছে। প্রতিবেশীর দুঃখে কেউ থামে না, রাস্তায় দুর্ঘটনা দেখলেও অনেকেই মোবাইলে ভিডিও তোলে, সাহায্যের হাত বাড়ায় না। কভিড মহামারির সময়ও আমরা দেখেছি, মানুষ মানুষকে ভয় পেতে শিখেছে, দূরে সরে গেছে। এই প্রবণতা আমাদের মানবিক সমাজব্যবস্থার জন্য গভীর সংকেত বহন করে।
সহমর্মিতাহীনতার এই ভয়াবহ অবস্থার পেছনে অনেকগুলো কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। অতি-প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন মানুষ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। আগে যেখানে সামনাসামনি কথা হতো, এখন সেখানে স্ক্রিনের মাধ্যমে যোগাযোগ হয়। আমরা অনলাইনে বেশি সময় কাটাই, কিন্তু বাস্তবে পাশে দাঁড়াতে ভুলে যাই। ফলে সম্পর্কের উষ্ণতা কমে গেছে, মন থেকে মন আর জুড়ছে না।
অর্থ ও প্রতিযোগিতাকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থা মানুষকে ক্রমেই স্বার্থপর করে তুলছে। সবাই নিজের উন্নতি, নিজের সাফল্য ও নিজের সুখ নিয়ে ব্যস্ত। অন্যের কষ্ট বা দুঃখের প্রতি মনোযোগ দেয়ার সময় কারও নেই। সমাজে এখন মূল্যবোধের চেয়ে সফলতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পরিবার ও সামাজিক বন্ধনের দুর্বলতাও একটি বড় কারণ। আগে পরিবারে সবাই একসঙ্গে বসে কথা বলত, গল্প করত, একে অপরের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিত। এখন সবাই নিজের রুমে, নিজের মোবাইল বা ল্যাপটপ নিয়ে ব্যস্ত। ফলে পারিবারিক সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থায় মানবিক মূল্যবোধের অভাবও সমাজকে প্রভাবিত করছে। এখন পড়াশোনার মূল লক্ষ্য হয়ে গেছে শুধু ভালো চাকরি বা অর্থ উপার্জন, মানুষ হওয়া নয়। নৈতিক শিক্ষা ও মানবিকতা শেখানোর জায়গা কমে গেছে। অতি-ব্যস্ত জীবনযাপন ও মানসিক চাপ মানুষকে ভেতর থেকে ক্লান্ত করে তুলছে। আমরা নিজের শান্তি খুঁজতেই এত ব্যস্ত যে, অন্যের ব্যথা অনুভব করার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলছি। এই সব কারণ মিলেই পৃথিবী আজ সহমর্মিতাহীন হয়ে পড়ছে।
সহমর্মিতার অভাব দূর করা সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়। এর জন্য প্রথমেই দরকার মানবিক মূল্যবোধের চর্চা ও শিক্ষা। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে অন্যের কষ্ট বুঝতে, সাহায্য করতে, শ্রদ্ধা করতে এবং ভাগাভাগি করতে। পরিবারের মধ্যেই হতে হবে সহমর্মিতার প্রথম পাঠশালা। বাবা-মা, শিক্ষক ও বড়দের আচরণ থেকেই শিশুরা শিখে কীভাবে অন্যের প্রতি দয়া, মায়া ও সহানুভূতি দেখাতে হয়।
এছাড়া শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়, বরং জীবনবোধের শিক্ষা, যেমন সততা, সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও শ্রদ্ধাবোধ—এই বিষয়গুলোও সমানভাবে শেখানো দরকার। স্কুলে, কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজসেবা ও স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমকে উৎসাহিত করা যেতে পারে, যাতে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মানবিকতা জাগে। সমাজে পারস্পরিক সম্পর্ক পুনর্গঠনও জরুরি। পাড়া-মহল্লায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রক্তদান, দুস্থদের সাহায্য, বা প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো—এ ধরনের কাজ মানুষকে একত্র করে, সহমর্মিতা বাড়ায়। আমরা যদি আমাদের চারপাশে থাকা মানুষের হাসি-কান্নায় একটু সময় দিই, পৃথিবীটা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো প্রত্যেক মানুষের অন্তরে পরিবর্তন আনতে হবে। সহমর্মিতা কোনো বিলাসিতা নয়, এটা মানবতার মূল ভিত্তি। তাই নিজের ভেতরে মানবিকতার আলো জ্বালাতে হবে। যেখানেই অন্যায় বা কষ্ট দেখি, সেখানে নীরব না থেকে পাশে দাঁড়াতে হবে। তখনই হয়তো পৃথিবীটা আবার হবে উষ্ণ, মায়াময়, আর মানুষে মানুষে ভরবে ভালোবাসায়।
সহমর্মিতা কোনো বিলাসবস্তু নয়, এটি মানুষের সবচেয়ে বড় গুণ। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, অর্থ ও আরাম যতই বাড়ুক, সহমর্মিতা ছাড়া সমাজ টেকসই হতে পারে না। কারণ মানুষ তখনই প্রকৃত মানুষ, যখন সে অন্যের কষ্টে কষ্ট পায়, অন্যের চোখের জলে নিজের মন ভিজে যায়। আজ আমরা নিজের সুখে এতটাই ডুবে আছি যে, অন্যের দুঃখে কান পেতে শোনা ভুলে গেছি—এই প্রবণতাই আমাদের সমাজকে ভেতর থেকে শূন্য করে দিচ্ছে। সহমর্মিতার চর্চা সমাজে উষ্ণতা আনে, দূর করে হিংসা, স্বার্থপরতা আর বিভাজন। তাই আমাদের সবার উচিত ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে মানবিকতার উদাহরণ সৃষ্টি করা হয়তো কারও বিপদে পাশে দাঁড়ানো, বা একটি হাসি দিয়ে কাউকে সাহস দেয়া। পৃথিবী বদলায় না এক দিনে, কিন্তু একজন সহমর্মী মানুষই পারে পরিবর্তনের সূচনা করতে।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রিন্ট করুন


Discussion about this post