দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

শিক্ষায় প্রযুক্তির ছোঁয়া

শান্তনু শেখর রায়: দেশের সর্বজনীন ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে নিরলস কাজ করছে সরকার। শিক্ষার সম্প্রসারণ, উন্নয়ন ও সবার জন্য মানসম্মত তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বাস্তবায়নে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। এ লক্ষ্যে সরকারের ‘জাতীয় শিক্ষা নীতি, ২০১০’ প্রণীত হয়েছে। শিক্ষা কারিকুলামে কিছু পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের ফলে শিক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে।

শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের প্রথম দিনই রঙিন বই তুলে দেওয়া, উপবৃত্তি কার্যক্রম, মিড-ডে মিল কর্মসূচি, সরকারি বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম প্রহরী নিয়োগ ও স্টুডেন্টস কাউন্সিল গঠনের বিষয়গুলোকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার ফলে ব্যাপকভাবে শিক্ষার মানোন্নয়ন হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও খেলাধুলার প্রতি আকৃষ্ট করতে প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন এবং ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে। শিক্ষকের নতুন পদ সৃষ্টি, উন্নত প্রশিক্ষণ, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম সরকারের এসব উদ্যোগ সর্বমহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।

বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী প্রায় শতভাগ শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি, শিক্ষাক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সমতা, শিক্ষাক্রমে নতুন পাঠ্যবই, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে শুরু করে শিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রেই ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়েছে।

জাতিসংঘ ঘোষিত ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), ২০৩০’-এর ‘লক্ষ্যমাত্রা ৪’-এ টেকসই, গুণগত মানসম্পন্ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য অত্যধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণের লক্ষ্যে শিক্ষায় ডিজিটালাইজেশন ও তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য সরকার কাজ করছে। আর শিক্ষার প্রাথমিক স্তরেই এ ডিজিটালাইজেশনের বিষয়ে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

প্রাথমিক শিক্ষায় মাল্টিমিডিয়া তথা ডিজিটাল ক্লাসরুমের ব্যবহারের সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য রয়েছে। বিশ্বায়নের যুগে উন্নত দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণে শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো এবং পাঠ কার্যক্রমে অন্যান্য শিক্ষা উপকরণের মতো প্রযুক্তিকেও একটি শিক্ষা উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করবে। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য গ্রহণ করা হয়েছে যুগোপযোগী কর্মপদ্ধতি। কম্পিউটার শিক্ষা বা ল্যাবভিত্তিক বদ্ধমূল ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে তথ্যপ্রযুক্তিকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমে কাজে লাগানো হচ্ছে। এ লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ব্যবহার করা বিভিন্ন উপকরণের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, ল্যাপটপ, ইন্টারনেট মডেম ও সাউন্ড সিস্টেমের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। এ শ্রেণিকক্ষকেই বলা হচ্ছে ‘মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম’। প্রাথমিক শিক্ষায় মাল্টিমিডিয়া তথা ডিজিটাল ক্লাসরুমের ব্যবহার এখন সময়ের দাবি।

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা লাভ এবং তা আয়ত্ত ও প্রয়োগ করা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত। জাতিসংঘ গৃহীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) সবার জন্য টেকসই গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষার ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ডিজিটাল ক্লাসরুম ব্যবহার করে সেই কাক্সিক্ষত মান অর্জন করা সম্ভব। শিশুদের শিক্ষার পরিবেশ, পাঠদান পদ্ধতি এবং বিষয়বস্তু আকর্ষণীয় ও আনন্দময় করে তোলা অতি জরুরি। মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে বিকশিত চিন্তাশক্তি, কল্পনাশক্তি ও অনুসন্ধিৎসু মননের অধিকারী হয়ে সব শিক্ষার্থী যাতে প্রতিটি স্তরে মানসম্পন্ন প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জন করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল শিক্ষা কন্টেন্টের ব্যবহার অত্যাবশ্যক। এর মাধ্যমে শিক্ষাকে শিক্ষার্থীর চিন্তা-চেতনা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটিয়ে জীবনঘনিষ্ঠ জ্ঞান বিকাশে সহায়ক হবে।

পাঠ্যপুস্তকের ধারণাগুলো আরও আকর্ষণীয় ও সহজবোধ্য করতে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের ছবি, ডায়াগ্রাম, অডিও, ভিডিওসহ মাল্টিমিডিয়া উপকরণগুলো সংযোজন করে অ্যানিমেশনের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক, প্রশিক্ষক, এডুকেশন সেক্টর বিশেষজ্ঞ, চাইল্ড সাইকোলজিস্ট, কালার, প্রোগ্রামিং ও এনিমেশন বিশেষজ্ঞদের সরাসরি অংশগ্রহণ ও মতামতের ভিত্তিতে প্রতিটি অধ্যায়ের কাক্সিক্ষত শিখনের আলোকে এই ডিজিটাল শিক্ষা কনটেন্টগুলো প্রস্তুত করা হচ্ছে। কনটেন্টগুলো শ্রেণিকক্ষে ব্যবহারের মাধ্যমে পাঠ্যবিষয়কে সহজ এবং শিখন-শেখানো প্রক্রিয়াকে অংশগ্রহণমূলক, আকর্ষণীয় ও আনন্দদায়ক করে তোলা সম্ভব হয়। ফলে শ্রেণিকক্ষকে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শ্রেণিকক্ষে পরিণত করা যায়।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের জন্য স্বশিক্ষণের ব্যবস্থা করার একটা অন্যতম উপায় ডিজিটাল শিক্ষা কনটেন্টের ব্যবহার। আধুনিক কম্পিউটার প্রযুক্তির সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পরিচিত করানোর জন্য এই প্রক্রিয়ার বিকল্প নেই। এসব ক্ষেত্রে এরই মধ্যে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে কম্পিউটারকে শিক্ষাদানের উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে নানা রকম উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পের উদ্যোগে সাতটি বিদ্যালয়ের ২৩ শিক্ষককে নিয়ে পাইলট আকারে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল। এ পাইলট কর্মসূচির সফল অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে এটুআই প্রকল্পের সহযোগিতায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সারা দেশে ২৫ হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করেছে। এর মধ্যে ২০ হাজার ৫০০ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘শিক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তি’ প্রকল্পের মাধ্যমে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়েছে। এটুআই প্রকল্পের সহযোগিতায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৫৫ হাজারের বেশি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষককে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকরা বিজ্ঞান, গণিত, ভূগোল, ধর্ম, বাংলা, কৃষিশিক্ষাসহ প্রতিটি বিষয়ের ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করছেন ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে ব্যবহার করছেন। বাংলাদেশের সব শিক্ষককে একটি কমন প্ল্যাটফরমে নিয়ে আসার জন্য ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহযোগিতায় এটুআই প্রোগ্রাম শিক্ষক বাতায়ন (ঃবধপযবৎং.মড়া.নফ) তৈরি করেছে।

শিক্ষকরা তাদের তৈরি করা ডিজিটাল কনটেন্ট, ভিডিও ও এনিমেশন এখানে শেয়ার করেন এবং অন্যান্য শিক্ষক তা প্রয়োজনে ডাউনলোড করে নেন। শিক্ষক বাতায়নে মোট ৪৫ হাজার শিক্ষক রয়েছেন, যারা নিয়মিত ডিজিটাল কনটেন্ট আপলোড ও ডাউনলোড করছেন। এখানে ২৫ হাজারের বেশি ব্লগপোস্ট ও ১২ হাজারের বেশি ডিজিটাল কনটেন্ট রয়েছে। শিক্ষক বাতায়নের সদস্যসংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। গ্রাম ও শহরের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যকার বৈষম্য দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে শিক্ষক বাতায়ন।

বর্তমানে করোনাভাইরাসের মহামারিতে আক্রান্ত সারা বিশ্ব। থেমে গেছে মানুষের জীবনযাত্রা। লকডাউন গোটা দেশ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। কিন্তু প্রযুক্তির কল্যাণে লকডাউনের মধ্যেও শিশুর শিক্ষাদান কিন্তু থেমে নেই। ঘরে টিভিসেটের সামনে বসেই শিক্ষার্থীরা পাঠ গ্রহণ করতে পারছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা অনলাইনে নিয়মিত বিষয়ভিত্তিক ক্লাস নিচ্ছেন। উপকৃত হচ্ছে লাখ লাখ ঘরবন্দি শিশু শিক্ষার্থীরা। এটা সম্ভব হচ্ছে প্রযুক্তির কল্যাণেই।

আধুনিক শিক্ষা বিজ্ঞানের প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে সত্যিকার অর্থে শিক্ষার প্রধান শক্তিশালী হাতিয়ার তথ্যপ্রযুক্তি। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান ও গণিতের মতো বিষয়গুলোর প্রতি আগ্রহী হবে। সে লক্ষ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তির মানসম্মত ব্যবহার, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম নিশ্চিতকরণসহ শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা অত্যাবশ্যক। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকার মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও তৃণমূল পর্যায়ে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সরকারের এ মহতী উদ্যোগকে সাফল্যমণ্ডিত করার দায়িত্ব আমাদের সবার।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ ➧

সর্বশেষ..