সুশিক্ষা

শিক্ষার ফেরিওয়ালা শাহীন মিয়া

জার্মানির হ্যামিলন শহরের বাঁশিওয়ালা প্রথমে ইঁদুর এবং পরবর্তী সময়ে পারিশ্রমিক না পেয়ে শহরের সব শিশুকে অজানার উদ্দেশে নিয়ে যান তার জাদুকরি বাঁশির সুরে। বাঁশির জাদুকরি সুরে ইঁদুরের মতো শিশুরাও তার পিছু নিয়েছিল। সে এক ভিন্ন গল্পের ভিন্ন চিত্র। তবে এর সঙ্গে যেন মিল রয়েছে বাংলাদেশের শেরপুরের সৈনিক শাহীন মিয়ার। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত শাহীন মিয়ার পিছু নিয়েছে অসংখ্য দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থী। তবে তারা হ্যামিলনের সেই অন্ধ গুহার দিকে নয়, তারা অনিশ্চিত জীবন থেকে আলোর পথে চলেছে।
দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা যখন দারিদ্র্যের কশাঘাতে পিষ্ট হয়ে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে অনিশ্চিত জীবনে চলে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই শাহীন তার অদৃশ্য বাঁশির সুরে তাদের আলোর পথে আনতে সক্ষম হন। একসময় স্কুলপড়ুয়া শারমিন, নমিতা ও নাসিমারা তার চেষ্টায় বাল্যবিয়ের অভিশাপ থেকে রক্ষা পেয়ে বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় ও শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছেন।
ছেলেদের অনেকে অভাবের সংসারের হাল ধরতে পড়ালেখা বাদ দিয়ে দিনমজুর, কাঠমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, চা-বিক্রেতা, গার্মেন্ট শ্রমিকের কাজ বেছে নিলেও বর্তমানে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব টেক্সটাইলস, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা করছেন।
অদম্য এসব শিক্ষার্থীর গল্প এক বা দুই বছরের নয়, প্রায় এক যুগের। শাহীনের কল্যাণে শেরপুরের তিন শতাধিক দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থী শত অভাবকে পায়ে দলে ফিরে এসেছে শিক্ষাজীবনে। আলোর পথের যাত্রী হয়েছে। গত এক যুগে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৬ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। পঞ্চম থেকে একাদশ শ্রেণিতে ৩৫০ শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছেন।
তাদের কারও ঘর নেই, চাল নেই, চুলো নেই। তবে শাহীনের সহযোগিতা, অক্লান্ত পরিশ্রম ও সঠিক পরামর্শে তারা পেয়েছেন আলোর ঠিকানা। শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার গড়জরিপা ইউনিয়নের ঘোড়জান গ্রামের এক মধ্যবিত্ত কৃষকের সন্তান শাহীন মিয়া। ২০০১ সালে যোগ দেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে। সততা, শৃঙ্খলা ও আদর্শের উৎকৃষ্ট উদাহরণ তিনি। কর্মস্থল থেকে ছুটিতে বাড়িতে এসে খুঁজে বেড়ান ঝরেপড়া শিশুদের। প্রথমে তার নিজ গ্রাম ও আশপাশের গ্রামে দেখেন মাধ্যমিকের সিঁড়ি পাড় না হতেই ঝরে পড়ে অনেকে। তখন তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে পরামর্শ করে স্কুলগামী করেন ঝরে পড়া শিশুদের। শিক্ষা উপকরণ তুলে দেন তাদের হাতে। প্রথমত একক প্রচেষ্টায় নিজ এলাকায় কাজ করেন। পর্যায়ক্রমে এ কার্যক্রম ছড়িয়ে দেন গ্রাম থেকে ইউনিয়নে। পরে এর বিস্তৃতি ঘটে জেলার সবখানে। জেলার সীমান্তবর্তী নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতি ও শ্রীবরদী উপজেলার অর্ধশত স্কুলের শত শত শিক্ষার্থীর কাছে শাহীন তাই আলোর দূত হিসেবে পরিচিত। এলাকার কেউ কেউ তাকে ‘শিক্ষার ফেরিওয়ালা’ বলে সম্বোধন করেন।
শাহীন কখনও পায়ে হেঁটে, আবার কখনও বাইসাইকেলে চড়ে ছুটে যান জেলার বিভিন্ন উপজেলায়, বিশেষ করে প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলের দুর্গম গ্রাম ও স্কুলগুলোয়। তখন ওইসব স্কুলের শিক্ষার্থীরা ছুটে আসে তার সান্নিধ্য পেতে। তাদের জন্য একটি শিক্ষা উন্নয়ন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখেন শাহীন।
২০০৮ সালে তার এ মহতী কর্মকাণ্ডের সাংগঠনিক রূপ দিতে প্রতিষ্ঠিত করেন ‘দরিদ্র ও অসহায় শিক্ষার্থী উন্নয়ন সংস্থা’ (The Development Organization for the Helpless and Poor Students), সংক্ষেপে  Wcm (DOHPS)। ২০১১ সালে জেলা সমাজসেবা অধিদফতরের নিবন্ধন পান। শিক্ষা ও সমাজ উন্নয়নে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৫ সালে রাষ্ট্রপতির ‘বিশিষ্ট সেবা পদক’ বিএসপি’তে এ ভূষিত হন। তিনি বর্তমানে ২০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে অস্থায়ী বদলিতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরে (বিএনসিসি) কর্মরত।
শাহীন বলেন, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের নানা চাহিদা পূরণ ও দরিদ্র অসহায় শিক্ষার্থীদের মাঝে নিয়মিত শিক্ষা উপকরণ বিতরণে অনেক অর্থের প্রয়োজন। প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ মাঝেমধ্যে কেউ কেউ এককালীন ও নিয়মিত সহায়তা করে
‘ডপস’-এর সেবাকে সমৃদ্ধ করে যাচ্ছেন। তবে কাজের পরিধি সামলাতে প্রয়োজন আরও অর্থের। সমাজের হৃদয়বান ব্যক্তিরা এগিয়ে এলেই আরও সহজ হবে এ পথচলা।

রফিক মজিদ

সর্বশেষ..