মত-বিশ্লেষণ

শিক্ষার সর্বস্তরে আলোর দিশা আনবে ইশারা ভাষা

সেলিনা আক্তার: ভাষাকে আশ্রয় করেই বিকশিত হয় সভ্যতা, সমাজ ও সংস্কৃতির সবকিছুই ভাষার আশ্রয়ে লালিত ভাষার দাবি জীবনের দাবি, মনুষ্যত্বের দাবি। রক্তস্নাত বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘ ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসরূপে ঘোষণা করে; যার মূল উদ্দেশ্য পৃথিবীর প্রতিটি দেশের, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ভাষাগোষ্ঠীকে রক্ষা ও তাদের বিকাশ। তাই এ দেশ ভাষার অধিকার আদায়ের দেশ। প্রাচীনকাল থেকেই শ্রবণশক্তিহীন মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহƒত হয়ে আসছে ইশারা। বাক-প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের একটি বড় অংশও এ ভাষাকে তাদের মতপ্রকাশের অন্যতম বাহন হিসেবে বেছে নেয়। ভাষা আদায়ের তীর্থভূমিতে বাসবাসরত প্রায় ৩০ লাখ বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষের মনের ভাব প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম ‘বাংলা ইশারা ভাষা’। শ্রবণ ও বাক-প্রতিবন্ধী মানুষের বৈচিত্র্যময় জীবনের প্রকাশ ঘটে এ ভাষার মাধ্যমে। এছাড়া অটিস্টিক, নিউরোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের অনেকে ইশারা ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে থাকে।

সিরাজ আহমেদ, ফরিদা বেগম ও তাদের মেয়ে বিছানায় বসে গল্প করছেন। কিন্তু টুকটাক আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না। কেননা তারা ইশারা ভাষায় কথা বলছেন। সিরাজ আর তার স্ত্রী ফরিদা বেগম কানে শোনে না এবং কথা বলতে পারে না। তবে ছেলেমেয়েরা কথা বলতে পারে। মা-বাবার সঙ্গে এই দুই-ভাইবোনের সব যোগাযোগ হয় ইশারা ভাষায়।

শ্রবণ ও বাক-প্রতিবন্ধী (বধির) সমাজের বোঝা নয়। এরা সাধারণের মতোই নিজেদের মেধা-দক্ষতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে উন্নত জীবন ও সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। এক কথায় বধির, জনগোষ্ঠী সমাজ ও রাষ্ট্রের মানবসম্পদই বটে। কোনোভাবেই এই প্রতিবন্ধীদের অবহেলা না করে সহায়ক সেবা দিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগানো সম্ভব।

এই শ্রেণির প্রতিবন্ধী নিজেরা কেউ মুখ ফুটে কথা বলতে না পারলেও সমাজের সুস্থ মানুষগুলোর সঙ্গে মনের ভাব প্রকাশ করেন ইশারা ভাষায় এবং প্রতীকী নির্দেশনার মাধ্যমে। ইশারা ভাষা বলতে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিশেষ করে হাত, ঠোঁট, চোখ ইত্যাদি নাড়ানোর মাধ্যমে যোগাযোগ করার পদ্ধতিকে বুঝানো হয়। মুখের ভাষাতে যোগাযোগ করা অসম্ভব হলে এই ভাষা ব্যবহার করা হয়।

উন্নতবিশ্বে প্রশিক্ষণ ও আক্ষরিক শিক্ষার মাধ্যমে মূক ও বধির জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে পরিণত করা হয়েছে। আমাদের দেশে এখনও তারা সামাজিক অনাদর ও অবহেলার গণ্ডির মধ্যে রয়ে গেছে। দেশের এই জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও কার্র্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের প্রত্যেকেরই রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। তাদের মধ্যে অনেক দক্ষ পরিশ্রমী ও প্রখর মেধার অধিকারীও আছে। তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায়ও এগিয়ে রয়েছে। আমাদের মতো দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের প্রায় সবার হাতে হাতে দেখা যায় স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসমূহÑফেসবুক, ইমু, হোয়াটসঅ্যাপের মতো জনপ্রিয় মাধ্যমগুলো তারা ব্যবহার করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা নিজেদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান করে থাকে।

শ্রবণ ও বাক-প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সবাইকে ইশারা ভাষা শিখতে উৎসাহিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে দেশের একটি মোবাইল অপারেটর কোম্পানি। শ্রবণ ও বাক-প্রতিবন্ধীদের জন্য সাইন-লাইন ডিজিটাল কেয়ারে সেবাও প্রদান করবেন শ্রবণ ও বাক-প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। এ উদ্যোগের মাধ্যমে সংস্থাটি নিজেদের ওয়েবসাইট ও সেলফ সার্ভিস ডিজিটাল কেয়ার অ্যাপ এ ইশারা ভাষাভিত্তিক গ্রাহকসেবা চালু করেছে। কোম্পানিটির নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে ইশারা ভাষার ভিডিও টিউটেরিয়াল আপলোড করা হয়েছে। এটি আগ্রহীদের ইশারা ভাষা শিখতে প্রাথমিকভাবে সহায়তা করবে এবং কথা বলতে ও শুনতে না পারা প্রিয়জনদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন মূক ও বধিররা আমাদের মতোই সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন। সবই তারা বুঝে, দেখে, উপলব্ধি করে। কিন্তু তারা শোনে না, মুখ ফুটে কথা বলতে পারে না। সচেতনতার অভাবে এই শ্রেণির মানুষগুলো এখনো নানাভাবে অবহেলিত-বঞ্চিত হয়ে আছে। তাদের সংখ্যা নিতান্তই কম নয়। তাই তাদের জন্য আমাদের প্রত্যেকেরই এগিয়ে আসা উচিত। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ শ্রবণ প্রতিবন্ধী ও ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হচ্ছে বাক-প্রতিবন্ধী। ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব দ্য ডেফের তথ্য মতে, সারাবিশ্বে প্রায় সাত কোটি শ্রবণ ও বাক-প্রতিবন্ধী রয়েছে। আমাদের দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৯৭ জন নিবন্ধিত শ্রবণ-বাক প্রতিবন্ধী লোক রয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ১৮ হাজার ৯০৭ জন বাক-প্রতিবন্ধী ও ৪৭ হাজার ৪৯০ জন শ্রবণ প্রতিবন্ধী আছে।

সরকার অসহায় পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোকে সামনে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর। সরকার প্রতিবন্ধীদের জন্য খুবই আন্তরিক বলেই প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে নানা প্রকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। শ্রবণ ও বাক-প্রতিবন্ধী মানুষের ভাব প্রকাশে ইশারা ভাষার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। সরকার এরই মধ্যে জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী অধিকার সনদ অনুসমর্থন করেছে। এই সনদের সংশ্লিষ্ট ধারায় ইশারা ভাষা শেখায় সহায়তা করা এবং বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর ভাষাগত পরিচয়কে সমুন্নত রাখার কথা বলা হয়েছে। ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’-এর ধারা ২(৭)-এ ভাষা ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে ‘প্রমিত বাংলা ইশারা ভাষা প্রণয়ন ও উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম গ্রহণ, হাসপাতাল, আদালত, থানা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্র ইশারা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং চাহিদার ভিন্নতা বিবেচনা করে বাংলা ইশারা ভাষাকে স্বীকৃতির কথাও বলা হয়েছে।’

শ্রবণ ও বাক-প্রতিবন্ধী মানুষ এ ভাষার মাধ্যমে তাদের মনের ভাব প্রকাশ করে। সরকার বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য বাংলা ইশারা ভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া সরকার বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য সফটওয়্যার বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি মূলত সাইট টু স্পিচ সফটওয়্যার। এর মাধ্যমে কোনো কম্পিউটার বা মোবাইলের ক্যামেরার সামনে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ বা ইশারা ভাষায় কথা বললে সেটি স্পিচ বা কথা হিসেবে অনুবাদ হয়ে বলে দেবে। এটি এমনকি ইউনিকোড টেক্সটেও রূপান্তর হবে। এই সফটওয়্যার নির্দিষ্ট কোনো ডিভাইসের ওপর নির্ভরশীল হবে না। সাধারণ অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল বা সমপর্যায়ের ডিভাইসেই তা কাজ করবে।

ইশারা ভাষা নির্ণয়ে মোশন ইমেজ প্রসেসিং পদ্ধতির সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশেষ করে মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে এই সফটওয়্যারে। একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি তার দৈনন্দিন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাজে যতগুলো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে থাকেন এর প্রায় সবগুলোই এই সফটওয়্যারের আওতাভুক্ত থাকবে। যেমন- চিকিৎসাসেবা গ্রহণ ও রোগের বর্ণনা, পুলিশের কাছে আইনি সহায়তা ও পরিস্থিতি বর্ণনা, ক্লাসরুম, রেস্তোরাঁ ইত্যাদি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে ইশারা ভাষায় সংবাদ উপস্থাপনের উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানান। বর্তমানে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও দেশ টিভি ইশারা ভাষায় খবর উপস্থাপন করছে।

দেশব্যাপী ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্যকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, যা থেকে বছরে প্রায় ৪ লাখ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সরাসরি সেবা পাচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে ৩২টি মোবাইল থেরাপি ভ্যানের মাধ্যমে।

সব প্রতিবন্ধী ব্যক্তির উন্নয়নে বেশকিছু আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩’ এবং ‘নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন ২০১৩’ আইন দুটি অন্যতম। এই আইন দুটির মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার আইন দ্বারা স্বীকৃত হয়েছে। দশম জাতীয় সংসদের শেষ অধিবেশনের শেষ আইন ‘বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন ২০১৮’ পাস করা হয়েছে। এই আইনটির ফলে দেশের বিদ্যমান প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কিংবা দুর্ঘটনার ফলে পঙ্গুত্ব বরণকারী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি পুনর্বাসন প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজেরই অংশ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সব শ্রেণির শ্রবণ ও বাক-প্রতিবন্ধীদের জন্য সেবা ও সহায়ক সামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা গৃহীত হলে রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন হবে না। অর্জিত হবে না টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মূল টার্গেট। এই বাস্তবতাকে বিবেচনা করে বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধিতা ইস্যুটিকে অগ্রাধিকার খাত বিবেচনা করে নির্বাচনী ইশতেহার ২০১৮-এ সব ধরনের প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চলাফেরা, যোগাযোগ, চিকিৎসা সহজ করা এবং তাদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রতি বছর প্রতিবন্ধীদের জন্য চাকরিমেলা আয়োজন করছে। এতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে কর্মচঞ্চলতা ফিরে এসেছে। সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়তে হলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করে সবাই মিলে কাজ করতে হবে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..