সম্পাদকীয়

শিল্পঋণে বাড়ুক ক্ষুদ্র ও মাঝারিদের অংশগ্রহণ

গতকালের শেয়ার বিজে প্রকাশিত একটি খবরের শিরোনাম ‘শিল্পে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৮ শতাংশ’। সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত শিল্পঋণ-সংক্রান্ত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনের সূত্র ধরে প্রতিবেদক জানিয়েছেন, দেশে শিল্পঋণ বিতরণ বেড়েছে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর)। খেয়াল করা দরকার, চলতি অর্থবছরের (২০১৬-১৭) প্রথম প্রান্তিকে ১ হাজার ১৭৯ কোটি টাকার শিল্পঋণ বিতরণ করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। সংখ্যাটি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ১৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেড়েছে বেসরকারি ব্যাংকের শিল্পঋণ বিতরণ। বর্ধিত এ শিল্পঋণের চাহিদাকে ‘খানিকটা কৃত্রিম’ বলা যেতো, যদি শুধু স্থানীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকেই বেশিরভাগ শিল্পঋণের জোগান যেতো। দেখা যাচ্ছে, এক্ষেত্রে বিদেশি ঋণ বিতরণ বেড়েছে ২০ শতাংশের মতো। তবে একই সঙ্গে বিশেষায়িত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ ২২ শতাংশ কমলো কেন, তার ব্যাখ্যা স্পষ্ট নয়। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে মোট শিল্পঋণ বিতরণ হয়েছে আনুমানিক ৬২ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকার। উল্লেখ্য, গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে শিল্পঋণ বিতরণ হয়েছিল ৫৩ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকার। এখন কথা হলো, ঋণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্বভাবতই বেড়েছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। এ তিন মাসে নাকি ১৮ শতাংশ বেড়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার কোটির মতো। লক্ষণীয়, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ বৃহৎ শিল্পে। তার পরেই রয়েছে মাঝারি ও ক্ষুদ্রশিল্প। এই তিন ধরনের শিল্পে খেলাপি ঋণের পরিমাণ যথাক্রমে ৯ হাজার ১০০, ৫ হাজার ও ১ হাজার কোটি টাকা।

কথা হলো, শিল্পঋণ বৃদ্ধিতে উদ্বেগের কিছু নেই। বরং শিল্পঋণ বাড়ার অর্থ হচ্ছে অর্থনীতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে বিনিয়োগের চাহিদা। অনেক বিশেষজ্ঞ হয়তো এ যুক্তিও দেখাবেন, ওই শিল্পঋণও কাক্সিক্ষত হারে বৃদ্ধি পায়নি; এটি আরও বাড়া উচিত ছিল। ঋণও খেলাপি হতে পারে নানা কারণে। তবে একশ্রেণির ঋণগ্রহীতা রয়েছেন, যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি থাকেন। খতিয়ে দেখা দরকার, এ ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে কি না। যদি পেয়ে থাকে, তবে তা উদ্ধারে জোর প্রচেষ্টা নিতে হবে। পাশাপাশি বড় ঋণ প্রদানের বেলায় আরও সতর্ক থাকতে হবে ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ বিরূপাক্ষ পাল আমাদের প্রতিনিধির কাছে মন্তব্য করেছেন, ‘ব্যাংকগুলোর তো একটা বড় বিষয় রয়েছে, বড় কিছু শিল্পোদ্যোক্তার পেছন পেছন ঘুরে তারা ঋণ বিতরণ করে। যে খারাপ গ্রহীতা, তাকে যদি সেধে ঋণ দেওয়া যায় ‘তাহলে সে তো সুযোগ পেয়ে যায়।’ এমন পরিস্থিতিতে বড় ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকিং নীতিমালা আরও শক্ত করতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিপুল ব্যাংকঋণ অবলোপন করা হয়েছে এবং হচ্ছে। একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় ঋণ পুনঃতফসিলিকরণেও। এখন সেধে সেধে বড় ঋণ প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সময় এসেছে। আমরা চাইবো এ বিষয়ে শক্ত অবস্থান নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। লক্ষণীয়, মাঝারি ও ক্ষুদ্রশিল্পে খেলাপি ঋণের পরিমাণ তুলনামূলক কম। এর অন্যতম কারণ হয়তো, মাঝারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ দিয়ে সহজেই ঋণ উদ্ধার করতে পারে ব্যাংক। অথচ বিশেষ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্যই বরং শিল্পঋণের শর্ত সহজ হওয়া বাঞ্ছনীয়। অর্থনীতিতে বড় শিল্পোদ্যোক্তাদের অবদান অস্বীকার করবেন না কেউই। তবে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের স্বার্থে তাদের মধ্যকার পেশাদার ও চিহ্নিত খেলাপিদের বিরুদ্ধে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের শিল্পঋণে অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।

 

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..