প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

শিল্প খাতে খেলাপি ৫২৩৭২ কোটি টাকা

রোহান রাজিব: খেলাপি ঋণ ব্যাংক খাতের ক্যানসার। এই ক্যানসারের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী শিল্প খাত। কারণ ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৪৬ দশমিক ১৬ শতাংশ রয়েছে শিল্প খাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিকভাবে ঋণ বিতরণ না করায় তা আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। নানা উদ্যোগের পরও খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে পারছে না নিয়ন্ত্রণ সংস্থা। এতে দেশের ব্যাংকিং খাত দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। বড় শিল্পে ঋণ কেলেঙ্কারিসহ নানা অনিয়মের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ঋণ বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদিও বেশি মুনাফার সুযোগের ফলে বরাবরই বড় শিল্প ঋণে ঝুঁকছে ব্যাংকগুলো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২২ সালের মার্চ শেষে শিল্প ঋণে খেলাপির পরিমাণ ৫২ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা। যা গত ডিসেম্বরে ছিল ৪৯ হাজার ২২৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা বা ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২২ সালের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৩ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে  শিল্প খাতে খেলাপি ছিল ৫২ হাজার ৩৭২ কোটি। হিসাব অনুযায়ী ব্যাংকিং খাতের মোট খেলাপির ৪৬ দশমিক ১৬ শতাংশই শিল্প খাতের অবদান।

শিল্পের তিনটি উপখাতের মধ্যে বৃহৎ শিল্পপতিদের ঋণ বেশি খেলাপি হয়েছে। বৃহৎ শিল্পে খেলাপি ঋণ ২৬ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা থেকে তিন মাসের ব্যবধানে বেড়ে হয়েছে ২৮ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ৫২ শতাংশ। মাঝারি শিল্পগুলোর খেলাপি ঋণ প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১৫ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। তিন মাস আগে ছিল ১৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ক্ষুদ্র শিল্পে খেলাপি ঋণ ৮.১৫ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৮ হাজার ২২৭ কোটি টাকা। যা তিন মাস আগে ছিল ৭ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে এক লাখ ২১ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা, যা ২০২১ সালের একই সময়ে ছিল ৯০ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৩০ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা বা ৩৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

এদিকে শিল্পঋণ বিতরণের বিপরীতে আদায়ের হারের অবস্থাও ভালো। চলতি বছরের মার্চ শেষে আদায় বেড়েছে ২০ দশমিক ১৪ শতাংশ। প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত শিল্প খাতে ঋণ আদায় হয়েছে এক লাখ ১৮ হাজার ৭৭ কোটি টাকা, যা ২০২১ সালের একই সময়ে ছিল ৮৪ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে শিল্প খাতে ঋণ আদায় বেড়েছে ১৭ হাজার ৮২ কোটি টাকা বা ২০ দশমিক ১৪ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেছেন, করোনার ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের অর্থনীতি। এর ফলে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে শিল্প খাত। করোনা শুরুর পর ব্যবসা-বাণিজ্যে চরম খারাপ অবস্থা তৈরি হয়। সে তুলনায় চলতি বছর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তাই বিভিন্ন সেক্টরের মতো শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে। একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো হাওয়াতে আদায়ও বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিতরণ করা শিল্পঋণের মধ্যে ছয় লাখ ৪১ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এই অঙ্ক আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেশি। ২০২১ সালের মার্চে বকেয়া ছিল পাঁচ লাখ ৯৬ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা। শিল্প খাতে বিতরণ করা ঋণের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণের অঙ্ক ৯০ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা, যা ২০২১ সালের একই সময়ে ছিল ৯৮ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা।

প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, এক বছরের ব্যবধানে শিল্প খাতের মেয়াদি ঋণ বিতরণ শূন্য দশমিক ২২ শতাংশ বা ৩৯ কোটি টাকা কমেছে। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত শিল্প খাতে মেয়াদি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ১৭ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা, যা ২০২১ সালের একই সময়ে ছিল ১৭ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা। মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পে মেয়াদি ঋণ বিতরণের অঙ্ক যথাক্রমে ১০.৯৪ ও ৫৬.২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও বৃহৎ শিল্পে ৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। চলতি মূলধন ঋণ বিতরণের পরিমাণ ২০২১ সালের মার্চ প্রান্তিকে ছিল ৭৩ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা। তবে এক বছর পর ৪১ দশমিক ৭৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বৃহৎ, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পে চলতি মূলধন ঋণ বিতরণের অঙ্ক বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ৪৮.৮৩, ২১.৮৭ ও ২.৫০ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত এক লাখ ২১ হাজার ৬৭১ কোটি ১৫ লাখ টাকার শিল্পঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে বৃহৎ, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পে যথাক্রমে ৩৭.৯১, ১৯.৮৪ ও ১৩.৩২ শতাংশ বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে।