প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

শিল্প গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের দাম কমানোর পরিকল্পনা

ক্যাপটিভ নিয়ে বিপাকে পিডিবি

ইসমাইল আলী: শিল্পকারখানায় বিদ্যুতের বেশি ব্যবহার হলেও বর্তমানে এ খাতে চাহিদা বাড়ছে না। বরং কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের জন্য বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে (পিডিবি) আবেদন করেছে। নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা (ক্যাপটিভ) চালু হওয়ায় পিডিবি থেকে আর বিদ্যুৎ নিতে আগ্রহী নয় প্রতিষ্ঠানগুলো। এ নিয়ে বিপাকে পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সংস্থাটি। তাই গ্রাহক ধরে রাখতে বাধ্য হয়ে শিল্প খাতে বিদ্যুতের দাম কমাতে যাচ্ছে পিডিবি।

সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব তৈরি করেছে পিডিবি। অনুমোদনের জন্য তা পাঠানো হয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগে। এতে ক্যাপটিভে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে তা পিডিবিকে দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়। এক্ষেত্রে যুক্তি হিসেবে বলা হয়, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যয় অনেক কম। তাই বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হলে পিডিবির কয়েকটি কেন্দ্র পূর্ণমাত্রার চালু করা যাবে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমবে। ফলে শিল্প গ্রাহকদের জন্য আরও কম মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে।

তথ্যমতে, বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ (ক্যাপটিভ পাওয়ার) নিজেরাই উৎপাদন করছেন শিল্পমালিকরা। এছাড়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গাস (এলএনজি) আমদানির পর শিল্প খাতে ক্যাপটিভে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। নতুন আরও ৮০০ শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ক্যাপটিভ বিদ্যুতের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এতে ক্যাপটিভে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ছে আর বসে থাকছে পিডিবির কেন্দ্রগুলো।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসচালিত ক্যাপটিভগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় পড়ে সাড়ে চার টাকার মতো। আর গ্রাহকভেদে শিল্প খাতে সরকার বিদ্যুতের দাম নিচ্ছে পিক-অফ পিকভেদে সাত টাকা ১১ পয়সা থেকে ১০ টাকা ১৯ পয়সা। তাই উৎপাদন ব্যয় অনেক কম হওয়ায় বেসরকারি খাত এখন ক্যাপটিভে আগ্রহ দেখাচ্ছে। এজন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) নিয়মিত আবেদন জমা পড়ছে।

এদিকে গ্যাস সরবরাহ পাওয়ায় এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জে বসুন্ধরা পেপার মিল ও চট্টগ্রামের একেএস নিজস্ব ক্যাপটিভ চালু করেছে এবং পিডিবির বিদ্যুৎ নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। চট্টগ্রামের কয়েকটি রড ইন্ডাস্ট্রিও এ তালিকায় আছে, যদিও শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতের গ্রাহকদের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করে মুনাফা করে পিডিবি। আবাসিক ও অন্যান্য খাতে বিদ্যুৎ বিক্রি করে লোকসান গুনতে হয় বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোকে। তাই বিকল্প পথ না পেয়ে শিল্প খাতে সরবরাহকৃত বিদ্যুতের দাম কমানোর চিন্তাভাবনা চলছে।

বিদ্যুৎ বিভাগে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে দেশে বিদ্যুতের গ্রাহকসংখ্যা দাঁড়ায় তিন কোটি ৩৫ লাখ। এর মধ্যে শিল্পগ্রাহক তিন লাখ আট হাজার বা এক শতাংশেরও কম। তবে এ খাতটি গত অর্থবছর বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ২৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

এদিকে গত অর্থবছর মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ সাত হাজার ৫৩ কোটি ৩০ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এর মধ্যে গ্যাসে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় পড়ে দুই টাকা ৬৭ পয়সা। আর সব ধরনের জ্বালানির মিশ্রণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় ব্যয় ছিল পাঁচ টাকা ৬১ পয়সা। যদিও পাইকারিতে (বাল্ক) বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যয় ছিল প্রতি ইউনিট পাঁচ টাকা ৭৮ পয়সা। অপরদিকে শিল্প গ্রাহকদের গড় বিলিং রেট প্রতি ইউনিট আট টাকা ২৫ পয়সা।

পিডিবির প্রস্তাবে আরও বলা হয়, ২০২০-২১ অর্থবছরে বিদ্যুতের উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এতে আগামী অর্থবছর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়াবে আট হাজার ৪৯২ কোটি ৬০ লাখ ইউনিট। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় পাঁচ হাজার ৮৫০ কোটি ৮০ লাখ ইউনিট। এ বিদ্যুৎ উৎপাদনে দৈনিক গ্যাসের প্রয়োজন হবে ১৩৫ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট। আর সব ধরনের জ্বালানি মিশ্রণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় ব্যয় পড়বে পাঁচ টাকা ৮১ পয়সা এবং বাল্ক সরবরাহ ব্যয় পাঁচ টাকা ৯৯ পয়সা।

এদিকে বর্তমানে ক্যাপটিভে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে দৈনিক প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্য থেকে দৈনিক ১০ কোটি ঘনফুট বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহের প্রস্তাব করে পিডিবি। এতে অতিরিক্ত প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্যাসে উৎপাদন করা সম্ভব হবে বলে দাবি করে সংস্থাটি। ফলে দৈনিক ১৪৫ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে দাঁড়াবে আট হাজার ৮২৪ কোটি ৫০ লাখ ইউনিট। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়াবে ছয় হাজার ১৮২ কোটি ৭০ লাখ ইউনিট।

এক্ষেত্রে আগামী অর্থবছর বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৭৭ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৫ দশমিক ১০ শতাংশ হবে। আর গড় উৎপাদন ব্যয় কমে দাঁড়াবে পাঁচ টাকা ৬৫ পয়সা ও বাল্ক সরবরাহ মূল্য পাঁচ টাকা ৮২ পয়সা। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ১৬ পয়সা ও সরবরাহ ব্যয় ১৭ পয়সা কমবে। সেক্ষেত্রে কম মূল্যে শিল্প খাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

জানতে চাইলে পিডিবির একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গ্যাসস্বল্পতার কারণে দৈনিক প্রায় এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হয় বা আংশিক লোডে চালাতে হয়। যদিও এসব কেন্দ্র নির্মাণে প্রচুর বিনিয়োগ করতে হয়েছে। এখন এসব কেন্দ্র বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। কীভাবে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণ পরিশোধ করা হবে, তা-ই বিবেচ্য বিষয়। এর মধ্যে ক্যাপটিভ স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। আবার ক্যাপটিভে গ্যাসও কম দামে দেওয়া হচ্ছে। এতে শিল্পমালিকরা ক্যাপটিভে যাচ্ছেন। এ সংকট কাটাতে ক্যাপটিভে গ্যাসের দাম বাড়ানো ও সরবরাহ কমানো উচিত।

সর্বশেষ..