দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

শিল্প স্থানান্তর ও বিদেশি বিনিয়োগ খুলবে সম্ভাবনার অযুত দুয়ার

মো. আবদুল জলিল: উৎপাদন আর উৎপাদনশীলতা বিষয় দুটির পার্থক্য সম্পর্কে আমাদের সমাজে এখনও ধারণা পরিষ্কার নয়। আমজনতা উৎপাদন বাড়ানো মানেই উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, এমন ধারণায় বিশ্বাস করেন। এমনকি যারা উৎপাদনশীলতা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজ করেন, তাদের বাইরে অন্যদের মধ্যেও বিষয় দুটির মৌলিক পার্থক্য এখনও তেমন স্বচ্ছ নয়। এর কারণ উৎপাদনশীলতার বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়ন কিংবা প্র্যাকটিস আমাদের দেশে খুব বেশি দিনের নয়। প্রতি বছরের মতো এবারও শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ন্যাশনাল প্রোডাক্টিভিটি অরগানাইজেশনের (এনপিও) উদ্যোগে ২ অক্টোবর দেশব্যাপী জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস উদ্যাপিত হচ্ছে। এ বছর উৎপাদনশীলতা দিবসের প্রতিপাদ্য হলো ‘জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে উৎপাদনশীলতা’। প্রতিপাদ্যটি আমাদের দেশের জন্য সময়োপযোগী হয়েছে।

অর্থনীতিতে সাধারণভাবে উৎপাদনের চারটি উপকরণ বা ফ্যাক্টর, যেমন ভূমি, শ্রমিক, পুঁজি ও সংগঠন বা উদ্যোক্তা সম্পর্কে আমরা কমবেশি সবাই অবহিত। এ চারটি উপকরণ ব্যবহার করে শিল্পকারখানায় পণ্য উৎপাদিত হয়। সেবা খাতেও এই চারটি উপকরণের সংমিশ্রণ থাকে। প্রচলিত অর্থে এই চারটি উপকরণ ব্যবহার করে উৎপাদন বা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায় বলে সাধারণ মানুষ মনে করে, কিন্তু উৎপাদনশীলতার ধারণাটি আরও বিস্তৃত ও গভীর।

সন্দেহ নেই, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সঙ্গে উৎপাদন বৃদ্ধির একটি যোগসূত্র রয়েছে। সাদামাটাভাবে বললে একই পরিমাণ শ্রমিক, কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও সময় ব্যবহার করে কোনো কারখানায় যদি আগের চেয়ে উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, তাহলে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে। কিন্তু উৎপাদনের উপকরণ, যেমন শ্রমিক, কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, সময় প্রভৃতি বৃদ্ধি করে কারখানায় উৎপাদন বাড়ালেই উৎপাদনশীলতা বাড়বে না। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সঙ্গে উৎপাদনের বিভিন্ন উপকরণ বা ফ্যাক্টরের দক্ষ ব্যবহার, কাঁচামাল ও সময়ের অপচয় রোধ, শ্রমিক বা মানবসম্পদের দক্ষতা, কর্মস্পৃহা ও আগ্রহ, ঝুঁকিমুক্ত উৎপাদনবান্ধব পরিবেশ, উন্নত মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি জড়িত। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ফলে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার, রোবটিক টেকনোলজি, ন্যানো টেকনোলজি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সসহ নতুন নতুন প্রযুক্তির প্রয়োগ।

উৎপাদনশীলতা বিষয়টি মূলত ব্যবস্থাপনার ধারণা থেকে উৎসারিত। এজন্যই যেসব প্রতিষ্ঠান পণ্য বা সেবা উৎপাদন করে, সেগুলোর ব্যবস্থাপনায় সম্পৃক্ত কর্মকর্তারা নিজেদের পারফরম্যান্সের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতার সূচক ঊর্ধ্বমুখী রাখতে প্রতিনিয়ত প্রয়াস চালিয়ে থাকেন। প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তার নিজস্ব উৎপাদনশীলতার গতি ঊর্ধ্বমুখী হলে এর প্রভাব অধীনস্থ শ্রমিক-কর্মচারীদের ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিফলিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে জাপানের যে অভাবনীয় উন্নতি ঘটেছে, তা গোটা বিশ্বকে আলোড়িত করেছে; ক্ষেত্রবিশেষে অনেক দেশকে উজ্জীবিত করেছে। জাপানের আদলে বাংলাদেশেও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির উদ্যোগ জোরদার করা হচ্ছে। উৎপাদনশীলতার আন্দোলন বেগবান করার প্রয়াস চলছে। উৎপাদনশীলতার উন্নয়নে জাতীয় প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল প্রোডাক্টিভিটি অরগানাইজেশন (এনপিও) কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে জাপানের কারিগরি সহায়তায় এনপিও ১০ বছর মেয়াদি ন্যাশনাল প্রোডাক্টিভিটি মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করেছে। এনপিও’র প্রচেষ্টায় ১৯৯৫ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের শ্রম উৎপাদনশীলতা তিন দশমিক আট শতাংশ হারে বেড়েছে। এক্ষেত্রে এশিয়ান প্রোডাক্টিভিটি অরগানাইজেশনের (এপিও) সদস্যভুক্ত এশিয়ার ২০টি দেশের গড় প্রবৃদ্ধির হার দুই দশমিক পাঁচ শতাংশ। মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বার্ষিক গড় উৎপাদনশীলতা পাঁচ দশমিক ছয় শতাংশ হারে বাড়ানো হবে। এর মধ্যে কৃষি খাতে গড়ে পাঁচ দশমিক চার শতাংশ, শিল্প খাতে ছয় দশমিক দুই শতাংশ এবং সেবা খাতে ছয় দশমিক দুই শতাংশ হারে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। 

গোটা বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাবে শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থায় এখন ব্যাপক গুণগত পরিবর্তন এসেছে। শিল্পকারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শ্রম বা এর জায়গায় প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি, মানবীয় দক্ষতা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার প্রভৃতি স্থান করে নিচ্ছে। একসময়কার উদ্যোক্তা বা এন্ট্রাপ্রেনারশিপ কনসেপ্ট এখন ক্রমেই উদ্ভাবক বা সৃজনশীল উদ্ভাবনে রূপান্তর ঘটছে। এগুলোকে মানবীয় পুঁজি, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে সামাজিক পুঁজি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। মানবীয় শ্রম ব্যবহার করে আগে যে পরিমাণ পণ্য বা সেবা উৎপাদিত হতো, আধুনিক প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতির কল্যাণে সেখানে উৎপাদনের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে গেছে। ফলে বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।

বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর বিরাট অংশ তরুণ। এদেশের তরুণ সম্প্রদায় অত্যন্ত পরিশ্রমী, সৃজনশীল ও প্রযুক্তিমনস্ক। এখানে বিনিয়োগের ইতিবাচক পরিবেশ বিরাজ করছে। রয়েছে অভ্যন্তরীণ বিশাল ভোক্তাগোষ্ঠী। করোনার ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনীতির দুরবস্থার মধ্যেও বাংলাদেশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক ধারা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে যেখানে শিল্পোন্নত দেশগুলোয় নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ পাঁচ দশমিক ২৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির এই অর্জন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জিডিপি ও বৈশ্বিক গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি। পাশাপাশি জনগণের মাথাপিছু আয় বেড়ে দুই হাজার ৬৪ ডলারে উন্নীত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য।  বর্তমানে বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিশাল বাজার, বিপুল ক্রেতাগোষ্ঠী, তরুণ ও সৃজনশীল শ্রমশক্তি, বন্দর সুবিধা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে শক্তিশালী কানেক্টিভিটি বিদেশি বিনিয়োগের সহায়ক পরিবেশ তৈরি করেছে। বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মিরাকল। জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনের পথে দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে।

শিল্প খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শিল্প মন্ত্রণালয় ৫০টিরও বেশি দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের আওতায় রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলোর উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মানোন্নয়ন ও পণ্য বৈচিত্র্যকরণের কাজ চলছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানির সুযোগও জোরদার হবে। এছাড়া দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০০টি ইকোনমিক জোন গড়ে তোলা হচ্ছে। এর মাধ্যমে এক কোটি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি অতিরিক্ত ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়ের টার্গেট রয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিসিক শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে ২০৩০ সাল নাগাদ ২০ হাজার একর জমিতে ৫০টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক স্থাপন করা হবে, যেখানে ৫০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে।

শিল্প সম্ভাবনার বিবেচনায় বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধ জনপদ। এদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি ‘অনাবিষ্কৃত রত্ন’ বলে মনে করা হয়। এরই মধ্যে এদেশে জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ ভাঙা ও রিসাইক্লিং, ওষুধ, চামড়া, সিরামিক, প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশল, আইসিটি, টেলিযোগাযোগসহ বেশ কিছু শিল্পের প্রসার ঘটেছে। বৈশ্বিক ও দেশীয় চাহিদা বৃদ্ধির কারণে সফটওয়্যার নির্মাণ থেকে শুরু করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, মহাকাশ গবেষণাসহ উদীয়মান খাতগুলোয় বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ এখন বিশাল সমুদ্রসীমার অধিকারী, যার মধ্যে রয়েছে মৎস্য, সামুদ্রিক খাদ্য, তেল, গ্যাসসহ প্রাকৃতিক সম্পদের বিশাল ভাণ্ডার। সমুদ্রসম্পদকেন্দ্রিক ব্ল– ইকোনোমি বা সুনীল অর্থনীতি সম্প্রসারণের সুযোগ এখন হাতের মুঠোয়।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিশাল বাজার, জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রচুর শ্রমশক্তি এ সম্ভাবনাকে আরও জোরদার করছে। শিল্পকারখানা স্থানান্তরের সুযোগ কাজে লাগাতে সরকার বিনিয়োগনীতি উদার করেছে। এতে আগামী দিনে এদেশের সম্ভাবনাময় শিল্প খাতগুলোয় সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আরও বাড়বে। শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকে অনেক শ্রমঘন শিল্পকারখানা স্থানান্তরিত হবে। সব মিলিয়ে করোনা মহামারি আপাতত বাংলাদেশের জন্য অভিশাপ হলেও এটি শাপেবর হতে চলেছে। এটি সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উšে§াচন করতে যাচ্ছেÑশিল্প স্থানান্তর আর বিদেশি বিনিয়োগের অযুত সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে দেশীয় শিল্পকারখানায় উৎপাদন নয়, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির প্রয়াস বেগবান করা সময়ের অনিবার্য দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..