মত-বিশ্লেষণ

শিশুদের প্রতি আর নয় সহিংসতা

অরুণ কুমার বিশ্বাস: বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এ কথা বলা যায়, আমাদের শিশুরা এখন অনিরাপদ বিভিন্নভাবে, বিশেষ করে মেয়েশিশুদের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে। নিপীড়নের শিকার শিশুদের বয়সেরও কোনো নির্দিষ্টতা নেই। চার-পাঁচ বছরের বাচ্চা থেকে শুরু করে সদ্যসাবালক শিশুরাও নিপীড়িত হচ্ছে নিয়মিত। ঘরে কিংবা বাইরে কোথাও আর আমাদের শিশুরা নিরাপদ নয়। এসব ঘটনা হয়তো আগেও ঘটত, কিন্তু মিডিয়া বা পত্রপত্রিকা তখন তত সরব না থাকায় এসব বিষয় জনসমক্ষে প্রকাশ পেত না। এখন মিডিয়া বেশি তৎপর, সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে ফেসবুক নামক অ্যাপ। ফলে শিশু নির্যাতনের এসব ঘটনা এখন মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে।
উন্নয়নের ভেলায় চেপে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি যত অগ্রসর হচ্ছে, কোনো কোনো সূচকে তা মোটেও সন্তোষজনক নয়। একটি জরিপে দেখা গেছে, গেল ছয় মাসে সর্বমোট ৪০০ শিশু নিপীড়নের শিকার হয়েছে। এই তো সেদিন পুরান ঢাকার ওয়ারীতে নিপীড়নের পর খুন হয় ছয় বছরের শিশু সায়মা। খুনি হারুন তার অচেনা কেউ ছিল না, বরং একই বাসার উপরতলার বাসিন্দা। কেউ ভুলেও ভাবতে পারেনি যে, কিশোর হারুনের মাঝে একজন ভয়ঙ্কর দুর্ধর্ষ খুনি লুকিয়ে আছে!
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে একটা বিষয় উঠে আসে, ধর্ষকের এখন আর কোনো বয়স বা পেশার বিচার নেই। অনেক শিক্ষক এখন শিশু নিপীড়নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয় দ্বারা নিপীড়িত হচ্ছে শিশুরা। এ অবস্থা মোটেই কাম্য নয়।
এখন প্রশ্ন হলো, চলমান এ পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী! বিপদ দেখে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া বা নিজেকে আড়াল রাখাটা কোনো সমাধান নয়। আজ হয়তো আপনার বা আমার মেয়েটির কিছু হয়নি, আগামী দিনে যে কোনো নিপীড়কের হাতে যে সে পড়বে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? কাজেই আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে একসঙ্গে এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে। নিপীড়কের বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত প্রতিরোধ এখন সময়ের দাবি। আমার শিশু সে ছেলে হোক বা মেয়ে, কখনও অপরের জিম্মায় দেওয়া বা কাজের ব্যস্ততায় অরক্ষিত ফেলে রাখা যাবে না কোনোভাবেই। অনেকেই আছেন প্রতিবেশীটিকে না
জেনেশুনেই তার সঙ্গে সম্পর্ক জুড়ে দেন এবং সময়ে-অসময়ে তাদের জিম্মায় নিজের সন্তানকে তুলে দেন। এই কাজটি কোনোভাবেই করা
যাবে না।
শিশুটি যদি মেয়ে হয়, সে ক্ষেত্রে অন্য কোনো পুরুষ বা নিকটাত্মীয়ের থেকে তাকে নিরাপদ দূরত্বে রাখতে হবে। শিশু কারও কাছে স্বস্তিবোধ না করলে শিশুকে তার কাছে বা সঙ্গে যেতে জোর করা যাবে না। নিপীড়ন নানা রকম হয়। কিছু লোক আছে ভদ্রতার মুখোশ পরে থাকে, কিন্তু সময়-সুযোগ পেলেই সে আক্রমণ করে কোমলমতি শিশুটির ওপর। কাজেই শিশুটিকে সব সময় সামলে রাখা উচিত। শিশুকে ছোটবেলা থেকেই গুড টাচ ব্যাড টাচ বিষয়ে শেখাতে হবে। অনেক সময় শিশুরা ছোটখাটো অনেক বিষয় চেপে যেতে চায়। ভালোমন্দ যে কোনো বিষয়ে মা-বাবার সঙ্গে শেয়ার করতে শিশুকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
আবার শিশুটি ছেলে হলেও নির্ভার-নিশ্চিন্ত থাকার উপায় নেই। কারণ সমাজে এখন মনোরোগীর সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। মাদরাসার ছাত্র নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। আবার মুক্তিপণ কিংবা ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে প্রতিশোধের নেশায় শিশুকে নির্যাতন করে খুন করা হচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ফেসবুক বা এ-জাতীয় অ্যাপসভিত্তিক বিষয়ের অবাধ ব্যবহারের কারণে বিপথগামী হচ্ছে আমাদের তরুণরা। নেটিজেন বলতে যে শব্দটি এখন বহুল প্রচারিত,
সেই নেটিজেনদের অনেকেই এখন মানবিক মূল্যবোধ ভুলে ফেসবুকের অপপ্রয়োগ
করছেন। এক্ষেত্রে সরকারি তরফে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন যদিও সরকার তা
করছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ ও সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণ বিভাগ ফেসবুক ও টুইটারসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর
ওপর কঠোর নজর রাখছে, যা একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
কথায় বলে, আইনের ক্ষমতা তার প্রয়োগে নিহিত। আইন মূলত কিছু ‘সেট অব রুলস’, যা কি না মানুষকে ভুল পথ থেকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনে। আইনের পেছনে যে শাস্তির ভয় তা-ই মূলত আমাদের আইন মানতে বাধ্য করে। শিশু
নিপীড়ন রুখতে চাই আইনের কঠোর প্রয়োগ। বরগুনার নয়ন বন্ড ও তার সমগোত্রীয় যারা,
তাদের ক্ষেত্রে আইনের সঠিক ও কঠোর প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। অপরাধের সঠিক কারণ
খুঁজে বের করে উপযুক্ত সাজা দেওয়াই একমাত্র সঠিক পথ।
যারা কোমলমতি শিশুর ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন করছে, কষ্ট দিয়ে মারছে তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোরতম বিচার নিশ্চিত করা হোক। প্রয়োজনে স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে স্বল্পতম সময়ে এসব নরপশুদের সমুচিত শাস্তি নিশ্চিত ও কার্যকর করা হোক। এক্ষেত্রে আইনের কঠোর সাজা প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। শিশু ধর্ষণ ও খুনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে আইনে। শিশু নিপীড়নের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা এখন সময়ের দাবি।
আমরা আমাদের শিশুদের জন্য এ দেশকে বাসযোগ্য করে তুলতে চাই। আর কোনো শিশু যেন নিপীড়িত না হয়, আতঙ্কে না থাকে সরকারের পাশাপাশি নাগরিক হিসেবে আমাদেরও সচেতনতার সঙ্গে সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে। আমাদের শিশুদের সুরক্ষিত রাখতেই হবে।

পিআইডি প্রবন্ধ

সর্বশেষ..