প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

শিশুদের মোবাইল ফোন আসক্তি কমাতে হবে

মুহা. শিপলু জামান: সিয়ামের বয়স ছয় বছর ছুঁই ছুঁই, সবে স্কুলজীবন শুরু করল। জীবনের প্রথম স্কুল কিন্তু সিয়ামের মাঝে তেমন কোনো আবেগ, উচ্ছাস বা আনন্দ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। অথচ স্কুল শুরুর প্রথম দিনটি সবার জন্য হয় জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ও আকর্ষণীয় দিন। সিয়ামের বিষয়টি খেয়াল করেছে ওর মা-বাবা, সে কেমন যেন মনমরা ও চুপচাপ থাকে, স্কুলে যাওয়ার সময় মন খারাপ করে, সকালের নাশতা খেতে চায় না। চাকরিজীবী বাবা-মা তাই খুবই উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত। কিন্তু তারা নিশ্চিত ও সচেতন, তাই হাল ছাড়েননি। সমস্যার মূল কারণ খুঁজতে শুরু করলেন। অনেকদিন পর্যবেক্ষণ ও পরিলক্ষণ করে তারা কিছু বিষয় অনুধাবন করেছেন।

প্রথমত, সিয়াম স্কুলকে আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করতে পারেনি। তার কাছে স্কুলকে আনন্দের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করাও হয়নি; বরং চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। স্কুল শুরুর আগে শিশুরা স্বাধীন জীবনযাপন করে, কিন্তু স্কুল শুরু হলে তার দৈনন্দিন জীবন একটা নিয়মের মধ্যে চলে আসে। পাশাপাশি নতুন পরিবেশে বড় হওয়া শিক্ষক ও শিশুদের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়। ছোট বয়সে আসলেই তা কষ্টকর। পরের বিষয়টা প্রথম সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বর্তমান শিশুরা জন্মের কিছুদিন থেকেই তাদের খাওয়া, খেলাধুলা ও বিনোদনের জন্য মোবাইল, ল্যাপটপ বা ট্যাবের স্ক্রিনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বাচ্চারা মোবাইলে ভিডিও, কার্টুন দেখতে দেখতে খুব সহজেই খাবার খাচ্ছে, এতে মাও খুব খুশি। কিন্তু বাচ্চারা বুঝতে পারে না তারা কী খাচ্ছে, কতটুকু খাচ্ছে। খাবারে স্বাদ কেমন, কারণ তাদের পুরো মনোযোগ থাকে মোবাইলের স্ক্রিনে। একইভাবে অতিমাত্রায় মোবাইল-নির্ভরতা বাচ্চাদের সুকুমার বৃত্তি ও মানবীয় গুণাবলি বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। পরিবেশ, প্রকৃতি ও বাহ্যিক জ্ঞান সবদিক থেকেই তারা পিছিয়ে পড়ছে। তারা এখন পাখি বা গাছ দেখলে আলাদা করে নাম বলতে পারে না, জাতীয় দিবসগুলো জানে না, বাংলা মাসের নাম বলতে পারে না। অথচ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রত্যেক অপশনগুলো তাদের নখদর্পণে। এছাড়া অতিরিক্ত মোবাইল এবং কম্পিউটার নিয়ে বসে থাকায় শিশুদের চলাফেরা, খেলাধুলা কম হচ্ছে। ফলে তারা স্থ‚লাকার শরীর ধারণ করছে এবং তাদের চোখে বিভিন্ন রকমের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এমনকি সারাক্ষণ শুয়ে বসে থাকার ফলে এবং খেলাধুলার মতো শারীরিক কসরত না থাকার ফলে তাদের হাঁটাচলা এবং দৌড়ানো সঠিক, ভারসাম্যপূর্ণ এবং শক্ত হচ্ছে না। আর সবচেয়ে মারাত্মক হচ্ছে শিশুরা অন্য শিশু বা মানুষের সঙ্গে সহজে মিশছে না, একা একা থাকার অভ্যাস গড়ে উঠছে তাদের মধ্যে। তৃতীয় সমস্যাটা মা-বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য তৈরি হয়। শিশুরা যেমন অতিমাত্রায় মোবাইল ব্যবহার করছে, তেমনি বড়রাও অত্যধিক পরিমাণে প্রযুক্তিতে আসক্ত হয়ে পড়েছেন। ফলে দেখা যায়, একই ঘরে মা, বাবা ও শিশুরা আলাদা আলাদা স্থানে অবস্থান করে। ফলে পারিবারিক বন্ধনে দৃঢ়তা হারাচ্ছে। বড়দের এ অভ্যাস শিশুরা অনুকরণ করেও অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তিতে আসক্ত হয়ে পড়ে।

এসব শিশুর শেষ পরিণতি হচ্ছে, শিশুরা পরিবার-পরিজন থেকে বিছিন্ন হয়ে পড়ছে, একাকী জীবনে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে এবং স্বাভাবিক সুস্থ জীবন থেকে ধীরে ধীরে বিষণœতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

এ অবস্থায় শিশুদের বাবা-মা, শিক্ষক পরিজনসহ সবার অনেক দায়িত্ব রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রথম কাজ হচ্ছে মা-বাবাসহ পরিবারের সবাইকে শিশুদের সময় দিতে হবে। শিশুদের নিয়ে প্রকৃতির কাছে যেতে হবে। প্রাণিক‚ল ও বৃক্ষরাজীর সঙ্গে শিশুদের পরিচয় করে দিতে হবে। দেশ ও বিদেশের নানান রকম গুরুত্বপূর্ণ ও মজাদার তথ্য শিশুদের জানাতে হবে। দেশের সংস্কৃতি ও ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। মাঝে মাঝে বাইরে বেড়াতে নিয়ে শিশুদের মনে আগ্রহ, আশা-আকাক্সক্ষা জাগিয়ে তুলতে হবে। শিক্ষা ও স্কুল আত্মীয়-পরিজনসহ বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ এবং যাওয়া আশা রাখতে হবে, যাতে করে শিশুদের সমাজিকীকরণ যথাযথ হয়। শিশুরা সবার সঙ্গে যাতে সহজে মিশতে পারে, সেদিকে অভিভাবকসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সচেতন হতে হবে। এসব বিষয় নিয়ে তাদের স্বপ্ন দেখাতে হবে এবং নানাভাবে তাদের অনুপ্রাণিত করতে হবে। তবেই শিশুদের মন থেকে স্কুল ও লেখাপড়া নিয়ে অযাচিত ভয় দূর হবে। শিক্ষাকে শিশুদের কাছে আনন্দময় করে তুলতে হবে।

শিশুদের সঙ্গে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে তাদের সঙ্গে শিশুর মতো করে মিশতে হবে ও ব্যবহার করতে হবে আমাদের। মোবাইল কম্পিউটারসহ অন্যান্য যন্ত্রের ওপর শিশুদের সময় ব্যয় ও অভ্যস্ততা কমানোর জন্য শিশুদের বিভিন্ন সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিক কাজে জড়িত করতে হবে। তাছাড়া বাসায় পোষা প্রাণী যেমন কুকুর, বিড়াল, মুরগি খরগোস কিংবা কবুতর পালন করা যায় অথবা বাগান করা যায়, যেখানে শিশুরা সময় অতিবাহিত করবে। বর্তমান প্রজন্মের শিশুরা বইপড়াবিমুখ, তাই তাদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া বাংলাদেশে ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলার চর্চা হয়, আমাদের শিশুদের বহিরাঙন খেলাধুলায় জড়িত করতে হবে, তাতে করে তাদের শরীর ও মন সুস্থ থাকবে। শিশুর বাবা-মা ও পরিজনদেরও মোবাইল আসক্তি কমাতে হবে এটা নিজের ও শিশুর জন্য জরুরি। কারণ শিশুরা অনুকরণপ্রিয়, তারা দেখে শিখে। বড়দের এ আসক্তি কমাতে না পারলে শিশুর সঙ্গে বাবা-মায়ের দূরত্ব বেড়ে যাবে, শিশু বিষণœতায় ভুগবে এবং এর ফলাফল হতে পারে আরও ভয়ংকর, জীবননাশী।

তাই আমাদের উচিত শিশুকে সময় দেয়া, তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা, ভালো কথা বলা। শিশুদের ভালো ভালো কাজ যেমন অসহায়-দরিদ্রদ্যের দান করা, মানুষের উপকার করা, পশুপাখি, গাছপালা, প্রকৃতির প্রতি যত্নবান হওয়া প্রভৃতি শিখাতে হবে, যাতে তারা বড় হয়ে ভালো মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারে। এক্ষেত্রে অভিভাবক, পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ভ‚মিকা গুরুত্বপূর্ণ। তারা শ্রেণিকক্ষে ক্লাস চলাকালে মোবাইল ফোনের আসক্তির কুপ্রভাব এবং শিশুদের করণীয় বিষয়ে শিক্ষা দেবেন। এতে শিশুরা প্রভাবিত হবে আশা করা যায়। পাশাপাশি গণমাধ্যমগুলো শিশু ও অভিভাবকদের এ ক্ষেত্রে সচেতনতা সৃষ্টিতে বিশাল ভ‚মিকা রাখতে পারে। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সব স্তরের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমাদের শিশুকে সঠিক শিক্ষা প্রদান করে ভবিষ্যৎ আলোকিত মানুষ তৈরি করে দেশ গঠনে নেতৃত্ব গড়ে তোলার অঙ্গীকারে কাজ করা আমাদের কর্তব্য এবং সময়ের দাবি।

পিআইডি নিবন্ধ